Image description
 

দেশের পাঁচটি কয়লা ক্ষেত্রে ফিজিবিলিটি স্টাডির (সম্ভাব্যতা যাচাই) নামে রাষ্ট্রের ৫শ’ কোটি টাকা গচ্ছা গেছে। খাতা-কলমে দেশি-বিদেশি একাধিক প্রতিষ্ঠান ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ পেলেও মূলত কাজ সম্পন্ন করেছে ভারতীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। কাজ শেষে বাংলাদেশের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় অন্তঃসারশূন্য প্রতিবেদন। যা থেকে এক পয়সারও উপকার হয়নি। কয়লা ক্ষেত্রগুলোর ফিজিবিলিটি স্টাডির প্রতিবেদন বিশ্লেষণ এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা যায়।

জ্বালানি খাত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের দুর্নীতির প্রধান উৎস ছিল জ্বালানি খাত। আর এই কারণেই মন্ত্রণালয়টির দায়িত্ব নিজের কাছে রাখতেন পতিত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্যাশিয়ার হিসেবে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করতেন তার জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী। আর দেশের ভেতরের সব অপকর্ম সামলাতেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু। কর্মকর্তা-কর্মচারী আর ঠিকাদার নামধারীদের সমন্বয়ে তিনটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করত এই খাত। এর মধ্যে একটি সিন্ডিকেট ছিল বিপিসিতে, একটি পেট্রোবাংলায় আর অন্যটি বিদ্যুৎ বিভাগে। বিদ্যুতের পর সবচেয়ে বেশি হরিলুট হয় পেট্রোবাংলার অধীনস্থ কোম্পনিগুলোতে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, বর্তমানে দেশে ৫টি কয়লাক্ষেত্র রয়েছে। এগুলো দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া ও ফুলবাড়ি, রংপুরের খালাশপীর, জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জের দীঘিপাড়ায় অবস্থিত। পতিত আওয়ামী লীগ সরকার এসব খনি থেকে কয়লা তোলার নামে শত শত কোটি টাকা লুটপাট করে। তবে বড়পুকুরিয়া ছাড়া আর কোনো খনি থেকেই কয়লা উত্তোলন করা সম্ভব হয়নি।

খাত সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১৪ সালে ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থনে একতরফা নির্বাচনে ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার পর, জ্বালানি খাত নিয়ে শুরু হয় লুটপাটের আয়োজন।

প্রকল্পের নামে লুটপাটের পাশাপাশি খনিজ সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্য-উপাত্ত ভারতের হাতে তুলে দিতে তৎপর হয় আওয়ামী সরকার। এরই অংশ হিসেবে কয়লাক্ষেত্রগুলোতে ফিজিবিলিটি স্টাডির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এগুলোর পেছনে খরচ করা হয়েছে আনুমানিক ৫শ’ কোটি টাকা।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬২ সালে আবিষ্কার হওয়া জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রটি দেশের সবচেয়ে বড় ও গভীরতম ক্ষেত্র। যার মজুত ১০৫৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মাইনিং অ্যাসোসিয়েটস প্রাইভেট লিমিটেডকে এর ফিজিবিলিটি স্টাডির দায়িত্ব দেওয়া হয়। ১১ বর্গকিলোমিটার এলাকায় তিনটি কূপও খনন করে তারা। কাজের সুবিধার কথা বলে এ খনির বিস্তারিত তথ্য পেট্রোবাংলার কাছ থেকে হাতিয়ে নেয় প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিন কর্মযজ্ঞ চালালেও সরকারের কাছে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে তা ছিল মনগড়া। কাজের সঙ্গে যার কোনো মিল পাওয়া যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, ফিজিবিলিটি স্টাডির নামে শুধু তথ্য হাতিয়ে নেওয়াই ছিল ভারতীয় প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য।

দেশের একমাত্র সচল কয়লাখনি দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া। এটি আবিষ্কার হয় ১৯৮৫ সালে। এখানে কয়লার মজুত রয়েছে ৩৮৯ মিলিয়ন মেট্রিক টন। বড়পুকুরিয়ার বর্ধিতাংশের ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ পায় মার্কিন প্রতিষ্ঠান জন্টিবয়েড। সহযোগী ছিল দেশীয় মজুমদার এন্টারপ্রাইজ। বাস্তবে থার্ড পার্টি হিসেবে কাজটি করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মহেশ্বরী মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড। তারা সমীক্ষার নামে চলমান কয়লাখনির পাশাপাশি বর্ধিতাংশের গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত ভারত নিয়ে যায়। বাংলাদেশকে গছিয়ে দেয় ত্রুটিপূর্ণ রিপোর্ট। যার ফলে বর্ধিতাংশে কোনো মাইনিং কাজ করা যাচ্ছে না।

 

রংপুরের খালাশপীর কয়লাক্ষেত্রটি আবিষ্কার হয় ১৯৮৯ সালে। এখানে কয়লার মজুত ৬৮৫ মিলিয়ন মেট্রিক টন। যার ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি করে হোসাফ ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি দেশি কোম্পানি। কিন্তু সমীক্ষার রিপোর্ট এতটাই নিম্নমানের যে শেষ পর্যন্ত সরকার তা নেয়নি। পরে বিদেশি কোম্পানি আইএমসি গ্রুপ কনসোর্টিয়াম লিমিটেডের মাধ্যমে পুনর্মূল্যায়ন করে রিপোর্টটি মনগড়া ও কপি-পেস্ট বলে প্রমাণিত হয়।

 

দিনাজপুরের দীঘিপাড়ার ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ দেওয়া হয় জার্মানির দুই কোম্পানি মিবরাগ কনসালটিং ইন্টারন্যানাল জিএমবিএইচ ও ফুপরো জার্মানি ল্যান্ড জিএমবিএইচ এবং অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি আরপিএম গ্লোবালকে। প্রতিষ্ঠানগুলো এ কাজের জন্য দক্ষ নয়। তাদের সঙ্গে ছিল দেশীয় প্রতিষ্ঠান ভেনাস। জার্মান ও অস্ট্রেলিয়ান কোম্পানি কাজ পেলেও মূলত সাব কন্ট্রাক্টে কাজটা শেষ করে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান মহেশ্বরী মাইনিং কোম্পানি লিমিটেড। এরপর যে প্রতিবেদন দেওয়া হয় সেটি ছিল কপি-পেস্ট করা। বিতর্কিত এই রিপোর্টের কারণে সম্ভাবনাময় খনিটিতে মাইনিং কাজ শুরু করা যায়নি এখনো। অথচ তথ্য-উপাত্ত চলে গেছে ভারতে।

 

এ ছাড়া ১৯৯৭ সালে আবিষ্কৃত দিনাজপুরের ফুলবাড়ি কয়লাখনিতে মজুত কয়লার পরিমাণ ৩৮৭ মিলিয়ন মেট্রিক টন। এখানকার ফিজিবিলিটি স্টাডির কাজ দেওয়া হয় এশিয়া এনার্জিকে। কিন্তু গণঅসন্তোষের কারণে তা শেষ করা যায়নি।

 

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ফিজিবিলিটি স্টাডির যেসব রিপোর্ট পাওয়া গেছে, তা দিয়ে খনি উন্নয়ন সম্ভব নয়।

 

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পেট্রোবাংলার একজন সাবেক পরিচালক জানান, সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের নামে তথ্য-উপাত্ত পাচারের কাজ নির্বিঘ্ন করতে আওয়ামী লীগ সরকার আস্থা রেখেছিল পেট্রোবাংলার তখনকার জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী ডিএম জোবায়েদ হোসেন ও সাইফুল ইসলামের ওপর। এই দুই কর্মকর্তাই পেট্রোবাংলায় সাবেক প্রতিমন্ত্রী বিপু সিন্ডিকেটের হয়ে কাজ করতেন। এদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে সাইফুলকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির এমডি আর জোবায়েদকে সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি দিয়ে মধ্যপাড়া গ্রানাইড মাইনিং কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক বানানো হয়। সম্প্রতি এসব অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগে অন্তর্বর্তী সরকার সাইফুল ইসলামকে ওএসডি করলেও জোবায়েদ হোসেন এখনো বহাল রয়েছেন।

 

অভিযোগ রয়েছে, পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে ওই দুই কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানেই নামে-বেনামে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে স্পর্শকাতর খাতটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চলে গেছে ভারতে।

 

অভিযোগের বিষয়ে সাইফুল ইসলামের বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

তবে ডিএম জোবায়েদ হোসেন জানান, তিনি একটি কয়লা ক্ষেত্রের ফিজিবিলিটি স্টাডি প্রকল্পে ৮ মাস পিডির (প্রকল্প পরিচালক) দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এ ছাড়া অন্য কোনো প্রকল্পের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি যে জামালগঞ্জ কয়লাক্ষেত্রের পিডি ছিলেন সেখানকার রিপোর্ট মোটামুটি সন্তোষজনক ছিল কারণ পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানে কয়লা পাওয়া না গেলেও গ্যাসের নাগাল পাওয়া গেছে।

 

কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শামসুল আলম জানান, অপ্রয়োজনীয় ফিজিবিলিটি স্টাডির নামে কয়েকশ’ কোটি টাকা লুটের আয়োজন করে দিয়েছিল পতিত সরকার। কারণ লুটপাট প্রকল্পের সবচেয়ে ভালো উৎস এই ফিজিবিলিটি স্ট্যাডি প্রকল্প। কারণ এখানে দৃশ্যমান কোনো কিছু দেখাতে হয় না। ইংরেজিতে লেখা যে রিপোর্ট জমা দিতে হয় তার বেশিরভাগই কপি-পেস্ট করা হয়। পেট্রোবাংলার অধীনস্থ কোম্পানিগুলোতে এই সুযোগ সবচেয়ে বেশি।

 

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব সাইফুল ইসলাম জানান, ফিজিবিলিটি স্টাডিগুলো থেকে এখন পর্যন্ত কোনো সুফল পাওয়া যায়নি। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের সুযোগ আপাতত নেই। তাই রিপোর্টগুলো তৃতীয়পক্ষ দিয়ে মূল্যায়নও করার প্রয়োজন হয়নি এখনো।