Image description
 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) হলে রাজনীতি নিষিদ্ধে জোরালো দাবি উঠলেও ছাত্রদল তাদের হল কমিটিগুলো বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ছাত্রশিবিরের গুপ্ত রাজনীতি (সাংগঠনিক পরিচয় গোপন রেখে তৎপরতা) বন্ধের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে তারা। গতকাল বৃহস্পতিবার ছাত্রদলের ১৩ সদস্যের প্রতিনিধি দল উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে। পরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় হল কমিটি বহাল রাখার ঘোষণা দেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব।

অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির রূপরেখা প্রণয়নে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ কমিটি প্রচলিত ছাত্র রাজনীতি কীভাবে গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়ে সুপারিশ করবে।

 
 

গতকাল উপাচার্যের সঙ্গে বৈঠকের পর ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব সাংবাদিকদের জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হল ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় এবং ডাকসুকেন্দ্রিক ছাত্র রাজনীতির রূপরেখা নির্ধারণের লক্ষ্যে উপাচার্যের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কারা সাইবার বুলিং করছে, গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে ক্যাম্পাসে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছে এবং অপসংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে– তা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তদন্ত করবে বলে আশ্বস্ত করেছে। প্রশাসন হলগুলোতে গুপ্ত ছাত্র রাজনীতির প্রতি অনীহা দেখিয়েছে। এমন চর্চা বন্ধে প্রশসন কাজ করবে বলে জানিয়েছে। আমরা তাদের আশ্বস্ত করেছি, সচেতন ছাত্র সংগঠন হিসেবে সবসময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে আছি।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের হল কমিটি ঘোষণার পর বিক্ষোভ ও হলের রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণার পর ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ‘গুপ্ত রাজনীতি’র অভিযোগ আলোচনায় আসে। ক্যাম্পাসে থাকা ছাত্রলীগের চিহ্নিত নেতাকর্মীদের আইনের আওতায় এনে বিচারের বিষয়ে উপাচার্যের সঙ্গে কথা হয়েছে বলে জানান রাকিব। তিনি বলেন, আগামী শনিবারের মধ্যেই হয়তো ক্যাম্পাসে গুপ্ত ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ, হলে ছাত্র রাজনীতির প্রকৃতি ও ঢাবি ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন থেকে আমরা তথ্য পাব।

এ সময় ছাত্রশিবিরের সমালোচনা করে ছাত্রদল সভাপতি বলেন, ছাত্রলীগ যেভাবে হলগুলো দখল করেছিল ছাত্রশিবিরও গুপ্ত রাজনীতির মাধ্যমে হলগুলো সেভাবে দখল করে নিচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সংসদ গ্রুপে ছাত্রদলকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক মন্তব্য করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করেছি। তাঁর ভাষ্য, ছাত্রদল সামাজিক মাধ্যমে মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হচ্ছে।

গত ৯ আগস্ট ছাত্রদল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হল শাখার নতুন আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। ওই দিন মধ্যরাতে হলে রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীদের একটি অংশ। বিভিন্ন হল থেকে কয়েকশ ছাত্রছাত্রী বাইরে বেরিয়ে আসেন। রাত ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা রাজু ভাস্কর্যের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ শেষে উপাচার্যের বাসভবনের সামনে অবস্থান নেন। রাত ২টার দিকে উপাচার্য অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ খান ও প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ সেখানে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তাদের সঙ্গে বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীদের প্রায় এক ঘণ্টা আলাপ-আলোচনা হয়। তখন উপাচার্য বলেন, ‘হল পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে ২০২৪ সালের ১৭ জুলাই হল প্রভোস্টের নেওয়া সিদ্ধান্ত বহাল থাকবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘হল পর্যায়ে ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত থাকবে।’ উপাচার্যের এ বক্তব্যে শিক্ষার্থীরা ‘না, না’ বলে আপত্তি জানান এবং হলগুলোতে সম্পূর্ণভাবে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি করেন। বিক্ষোভের মুখে রাত ৩টার দিকে প্রক্টর সাইফুদ্দীন আহমেদ হলগুলোতে ‘প্রকাশ্য ও গুপ্ত রাজনীতি’ নিষিদ্ধ করার ঘোষণা দেন। শিক্ষার্থীরা প্রক্টরের আশ্বাসে উল্লাস প্রকাশ করে হলে ফিরে যান। প্রক্টরের ওই ঘোষণার আধা ঘণ্টা পর স্যার এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট অফিস থেকে প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, ‘বিভিন্ন রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কমিটিভুক্তরা পদত্যাগ ও মুচলেকা প্রদান সাপেক্ষে হলে অবস্থান করতে পারবেন। অন্যথায়, তাদের হল থেকে বহিষ্কার করা হবে।’

বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত বছরের ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল ছাত্রলীগ। ওই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ১৭ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো থেকে শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধের মুখে বিতাড়িত হয় ছাত্রলীগ। সেই সময় শিক্ষার্থীরা প্রতিটি হলের প্রাধ্যক্ষদের কাছ থেকে আবাসিক হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকবে– এমন বিজ্ঞপ্তিতে স্বাক্ষর নেন। মূলত সেই বিজ্ঞপ্তির আলোকে শিক্ষার্থীরা আবাসিক হলে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকা সত্ত্বেও ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করায় ক্ষোভ জানান।

বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিক্রিয়া
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে গঠিত গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের ঢাবি শাখার আহ্বায়ক আব্দুল কাদের বলেন, আমরা স্পষ্ট করে জানিয়েছি, হল ও একাডেমিক এলাকায় ছাত্র সংগঠনের কাঠামো বা কার্যক্রম চাই না। সেটা প্রকাশ্য এবং গুপ্ত রাজনীতি– দুটার ক্ষেত্রেই। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল, হলে কোনো রাজনীতি থাকবে না। এর মাধ্যমে সেই আধিপত্য-দখলদারিত্ব ফিরে আসুক– এটা শিক্ষার্থীরা চায় না।

তবে ছাত্র ইউনিয়ন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি মেঘমল্লার বসু সমকালকে বলেন, ‘ছাত্রদলের বিষয়টা তারাই ভালো বুঝবে। তাদের কমিটির তালিকা প্রকাশ্যে রাখা উচিত। আমার মনে হয়, হল কমিটি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত ঠিক আছে।’ 

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের দপ্তর সম্পাদক সাজ্জাদ হোসাইন বলেন, ‘আমরা হলে কোনো কমিটি দিচ্ছি না। হলে কমিটি দেওয়ার কোনো চিন্তাভাবনা ছাত্র শিবিরের নেই। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, হলে রাজনীতি চালু হলে পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসবে। শিক্ষার্থীদের মতামতকে সম্মান করে আমরা কোনো কমিটি দেব না।’

ছাত্র রাজনীতির রূপরেখা প্রণয়নে কমিটি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি চর্চার লক্ষ্যে প্রচলিত ছাত্র রাজনীতির গঠনমূলক ভূমিকা নিয়ে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। ১১ আগস্ট এসএমটি সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ কমিটি গঠন করা হয়। বৃহস্পতিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন-৩ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। 

কমিটির সদস্যরা হলেন– কলা অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ সিদ্দিকুর রহমান খান, সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ ড. আব্দুল্লাহ-আল-মামুন, মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মো. নাজমুল হোসাইন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আলেয়া বেগম এবং আইন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ নাজমুজ্জামান ভূঁইয়া।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কমিটি দ্রুত ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠন, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করে একটি সমন্বিত রূপরেখার সুপারিশ করবে। প্রয়োজনে তারা তিনজনকে কো-অপ্ট করতে পারবে।