Image description

যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচন আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল—অর্থ, বড় বড় কোম্পানির প্রভাব আর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর শক্তি যতই বেশি হোক না কেন, জনগণের পরিবর্তনের ইচ্ছাকে সবসময় দাবিয়ে রাখা যায় না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি আদর্শের পথে চলে এবং সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের সুখ-দুঃখের সঙ্গে মিশে থাকে, তবে প্রভাবশালী ধনকুবেরদের অহংকার ভাঙা সম্ভব। মার্কিন সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্স হলেন এর এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

বার্নি স্যান্ডার্স নিজেকে ধর্মীয় অর্থে কঠোর ইহুদি হিসেবে নয়, বরং ধর্মনিরপেক্ষ ও সাংস্কৃতিক ইহুদি হিসেবে পরিচয় দেন। অথচ ফিলিস্তিনিদের অধিকার, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং মানুষের সম্মান রক্ষায় তিনি যেভাবে সোচ্চার হয়েছেন, তা অনেক তথাকথিত উদার পশ্চিমা রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ে অনেক বেশি জোরালো ও নীতিবান।

ইসরায়েলি সরকারের নীতির সমালোচনা করার সময় তিনি কখনো নিজের ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে আনেননি। তার কাছে মানবাধিকার কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা দেশের একচ্ছত্র সম্পত্তি নয়। সবার জন্য সমান ন্যায়বিচার ও সম্মান নিশ্চিত হওয়াই তার লক্ষ্য।

বার্নি স্যান্ডার্সের রাজনীতির মূল কথাই হলো আদর্শের প্রতি অবিচল থাকা। তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি সবসময় সামাজিক ন্যায়বিচার, সবার জন্য সমান সুযোগ, শ্রমিকদের অধিকার, সুলভ স্বাস্থ্যসেবা এবং করপোরেট পুঁজিপতিদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে লড়াই করে গেছেন।

২০১৬ সালে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রেসিডেন্ট পদের মনোনয়ন লড়াইয়ে তিনি হিলারি ক্লিনটনের কাছে হেরে যান। সেই সময় দলের ভেতরের পক্ষপাতিত্ব আর ক্ষমতার মারপ্যাঁচ নিয়ে অনেক বিতর্ক হয়েছিল।

অনেকেই ভেবেছিলেন, ওই নির্বাচনে হেরে যাওয়ার মধ্য দিয়ে স্যান্ডার্সের রাজনৈতিক জীবনের অধ্যায় শেষ হয়ে গেল। কিন্তু বাস্তবে ঘটল ঠিক উল্টো।

বার্নি স্যান্ডার্স নিজে প্রেসিডেন্ট হতে পারেননি ঠিকই, কিন্তু তার আদর্শ ও আন্দোলন হারিয়ে যায়নি। বরং গত এক দশকে তার চিন্তাধারা যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ ও পরিবর্তনকামী অসংখ্য রাজনৈতিক কর্মীকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

অ্যালেক্সান্ড্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ-এর মতো তরুণ প্রগতিশীল নেতাদের উত্থান এবং বিভিন্ন নির্বাচনে তাদের জয়ই প্রমাণ করে, রাজনীতিতে এক বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। এই নতুন প্রজন্মের নেতারা বড় বড় কোম্পানির কাছ থেকে ডোনেশন নেওয়ার পুরনো পথ ছেড়ে সাধারণ মানুষের ছোট ছোট অনুদান, স্বেচ্ছাসেবক আর তৃণমূলের অংশগ্রহণের ওপর ভরসা করছেন।

তারা বুঝতে পেরেছেন রাজনীতি কেবল নির্বাচনে জেতা বা ক্ষমতার ভাগ নেওয়ার খেলা নয়। এর আসল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা, বৈষম্য কমানো এবং দেশের সম্পদ সবার মাঝে সমানভাবে ছড়িয়ে দেওয়া।

 

আজ ৮৫ বছর বয়সে এসে বার্নি স্যান্ডার্স তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের অর্জন নিয়ে গর্ব করতে পারেন। তিনি হয়তো নিজে দেশের সর্বোচ্চ পদে পৌঁছাতে পারেননি, কিন্তু এমন একদল তরুণকে তৈরি করে গেছেন যারা তার আদর্শকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

একজন রাজনীতিকের সবচেয়ে বড় সাফল্য কেবল দেশের সর্বোচ্চ চেয়ারে বসা নয়; বরং এমন একটি আদর্শ রেখে যাওয়া যা তার নিজের জীবন পেরিয়েও আগামী প্রজন্মকে পথ দেখায়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা

এবার একটু আমাদের দেশের অর্থাৎ বাংলাদেশের দিকে তাকানো যাক। বাংলাদেশ এখন এক গভীর রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে চলা দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনীতির নামে পরিবারের আধিপত্য, টাকা পাচার এবং দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ার কারণে আমাদের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ আজ অন্ধকারের মুখে।

আমাদের দেশের রাজনীতিতে আদর্শের চেয়ে ব্যক্তি বা নেতাই সব। মানুষের কল্যাণের চেয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার লড়াইয়েই সবাই ব্যস্ত। দলগুলোর মুখে গণতন্ত্রের কথা বুলির মতো শোনা গেলেও তাদের নিজেদের ভেতর গণতন্ত্রের চর্চা প্রায় নেই বললেই চলে।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের রাজনীতিতে নীতি ছেড়ে সুবিধামতো সমঝোতা করাকে বলা হয় ‘চতুর রাজনীতি’, আর ক্ষমতার সামনে মাথা নত না করাকে বলা হয় ‘বোকা বা অপরিপক্ব স্বভাব’। এই দুঃসময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বার্নি স্যান্ডার্সের মতো একজন নেতার বড্ড অভাব।

এর মানে এই নয় যে, আমাদের হুবহু স্যান্ডার্সের মতো কাউকে লাগবে। আমাদের এমন একজন নেতা দরকার যিনি আমাদের দেশের ইতিহাস, সমাজ ও অর্থনীতিকে বুঝবেন এবং সাধারণ মানুষের কষ্ট অনুধাবন করবেন।

এমন একজন নেতা চাই যিনি কৃষক, শ্রমিক, ছোট ব্যবসায়ী, বেকার তরুণ, ছাত্র, নারী এবং পিছিয়ে থাকা মানুষের অধিকারকে সবার ওপরে স্থান দেবেন। যিনি রাজনীতিকে নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ভারী করার, বিদেশে টাকা পাচার করার বা ধনী বন্ধুদের বাঁচানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবেন না।

 

 

সর্বোপরি, নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের চেয়ে যিনি দেশের ভবিষ্যৎকে বেশি মূল্য দেবেন।

ক্ষমতার অপব্যবহার ও নৈতিক দেউলিয়াত্ব

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের একটা বড় শিক্ষা দিয়েছে—সরকার বদলালেই রাজনীতির চরিত্র বদলে যায় না।

২০২৪ সালের আগস্টের পটপরিবর্তনের পেছনে দেশি-বিদেশি কোনো শক্তি বা তথাকথিত ‘ডিপ স্টেট’ জড়িত ছিল কি না, তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক আছে। এসব বিষয়ের একটি নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া দরকার।

তবে এর পাশাপাশি এটাও দেখা জরুরি যে, আগস্টের ঘটনার পর যারা দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন, তারা কেমন আচরণ করেছেন।

যারা সুশাসন, গণতন্ত্র ও সংস্কারের সুন্দর সুন্দর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন কিংবা নিজেদের আখের গুছিয়েছেন, তাদের কোনো ছাড় দেওয়া চলে না।

এই অনির্বাচিত সরকারের আমলে চলা অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি, লুটপাট এবং নতুন কোনো সুবিধাবাদী গোষ্ঠীর জন্ম নেওয়ার বিষয়গুলোর সঠিক তদন্ত হওয়া উচিত। ক্ষমতা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। আবার সরকারি কোনো পদও নিজের আখের গোছানোর লাইসেন্স নয়।

 

যারা জনগণের বিশ্বাস নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে নিজেদের আয়ের পথ বানিয়েছেন, তাদের একদিন ইতিহাস ও জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। সাধারণ মানুষের নামে ক্ষমতা দখল করে শেষ পর্যন্ত সেই মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার চেয়ে বড় পাপ আর কী হতে পারে?

তথাকথিত সমাজতন্ত্রীদের ব্যর্থতা

আমাদের দেশের সমাজতান্ত্রিক বা বামপন্থী দলগুলোর ভূমিকা নিয়েও একটু কথা বলা দরকার। বহু বছর ধরে তাদের অনেক নেতাই শ্রমিকদের অধিকার, সমাজতন্ত্র ও পুঁজিবাদ বিরোধিতা নিয়ে বড় বড় কথা বলে আসছেন। অথচ তাদের মুখের আদর্শ আর বাস্তবের কাজের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত দেখা গেছে।

তাদের কেউ কেউ একসময় যাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শপথ নিয়েছিলেন, ক্ষমতার মোহে পরে তাদের সঙ্গেই হাত মিলিয়েছেন। আবার বিভিন্ন সময়ে কিছু বাম নেতার সাথে বিদেশি দাতাসংস্থা বা প্রভাবশালী মহলের যোগাযোগের কথা নিয়েও নানা প্রশ্ন উঠেছে।

অবশ্য এর মানে এই নয় যে বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে সৎ ও নীতিবান মানুষের অভাব ছিল। দেশের জন্য অনেক ভালো মানুষ সত্যিই ত্যাগ স্বীকার করেছেন এবং তাদের সেই অবদানকে সম্মান জানাতেই হবে।

কিন্তু তারপরও কিছু বড় প্রশ্ন থেকেই যায়। যারা নিজেদের শ্রমিক-কৃষকের বন্ধু বলে দাবি করেন, সাধারণ মানুষের মধ্যে তারা কেন শক্ত ভিত্তি তৈরি করতে পারলেন না? জাতীয় নির্বাচনে তাদের প্রার্থীরা মোটে কয়েক হাজার ভোটও পান না কেন? তাদের কথা কেন সাধারণ মানুষের মন জয় করতে পারে না?

এর সহজ উত্তর হলো—মুখে বড় বড় বুলি আওড়ানো আর নিজের জীবনে সেই আদর্শ মেনে চলা এক কথা নয়।

 

আর ঠিক এখানেই বার্নি স্যান্ডার্সের সঙ্গে আমাদের দেশের তথাকথিত সমাজতন্ত্রীদের আসল ফারাকটা ধরা পড়ে। স্যান্ডার্স ক্ষমতা বা সুবিধার লোভে কখনো নিজের আদর্শ বিক্রি করেননি। তিনি নির্বাচনে হেরেছেন, কিন্তু নিজের লক্ষ্য থেকে এক ইঞ্চিও নড়েননি।

আজকের বাংলাদেশে আমাদের ঠিক এই ধরনের নৈতিক সাহস ও নীতিবান নেতৃত্ব ভীষণভাবে দরকার।

নতুন প্রজন্ম কি পরিবর্তন আনতে পারবে? তবে একটা কথা সত্যি, একা একজন ভাল নেতা পুরো দেশের ভাগ্য বদলাতে পারেন না। এর জন্য দরকার একটি সচেতন জাতি, শক্তিশালী গণতন্ত্র, স্বাধীন আদালত, নিরপেক্ষ গণমাধ্যম এবং এমন এক পরিবেশ যেখানে ভিন্ন মতকে অপরাধ বা শত্রুতা হিসেবে দেখা হয় না।

আমাদের এমন একটি আন্দোলন দরকার যা মানুষকে ধর্ম, জাতি বা দলের পরিচয়ে ভাগ না করে সবার সমান অধিকারে বিশ্বাস করবে।

এমন নেতৃত্ব দরকার যারা সমালোচনা গায়ে মাখবেন না, নিজের ভুল স্বীকার করতে পারবেন এবং জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে ভয় পাবেন না। সবচেয়ে বড় কথা, নতুন প্রজন্মের মনে এই বিশ্বাসটা ফিরিয়ে আনতে হবে, রাজনীতি মানেই দুর্নীতি বা ধোঁকাবাজি নয়।

রাজনীতি হতে পারে মানুষের সেবা করার, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার এবং একটি সুন্দর দেশ গড়ার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। বার্নি স্যান্ডার্স ঠিক এই শিক্ষাই দিয়েছেন।

তার জীবন থেকে সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো—একজন নেতার সফলতা তিনি কতদিন ক্ষমতায় টিকে আছেন তা দিয়ে মাপা যায় না। বরং তিনি কত মানুষের ভাবনা বদলাতে পেরেছেন এবং আগামী প্রজন্মের জন্য কেমন দেশ রেখে গেছেন, সেটাই আসল কথা।

তাই বাংলাদেশের এখন নিজের একজন বার্নি স্যান্ডার্স দরকার। দরকার এমন একজন নেতা যিনি ক্ষমতার লোভে নয়, মানুষের টানে রাজনীতি করবেন; যিনি ক্ষমতার পূজারী না হয়ে নীতির পূজারী হবেন; এবং যিনি ধনীদের স্বার্থের চেয়ে সাধারণ মানুষের অধিকারকে বড় করে দেখবেন।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—আমাদের দেশের রাজনীতিতে কি এমন মানুষ কেউ আছেন? আর আজ যদি না-ও থাকেন, তবে আমাদের তরুণ প্রজন্ম কি এমন নেতৃত্ব তৈরি করতে পারবে?

 

হয়তো আমাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল একজন স্যান্ডার্সকে খুঁজে পাওয়া নয়; বরং এমন একটি গণতান্ত্রিক ও সুস্থ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে তার মতো নেতার জন্ম হতে পারে এবং তারা সফল হতে পারেন। কারণ, শুধু এক নেতার বদলে অন্য নেতা বসালেই দেশের আসল পরিবর্তন আসে না। পরিবর্তন আনতে হলে মানসিকতা বদলাতে হবে, নেতাদের নৈতিক চরিত্র ঠিক করতে হবে এবং দেশের মানুষের কল্যাণে সত্যিকারের কাজ করতে হবে।

আগামীদিনে আমরা কতটা বদলে যেতে চাই, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ। আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ এবং রাজনীতিবিদদের এবার এই অপরিপক্ব ও দুর্নীতিগ্রস্ত নেতৃত্ব অন্ধভাবে অনুসরণ করা বন্ধ করতে হবে। নিজেদের স্বার্থপরতা আর রাজনীতির ভেতরের গলদগুলো দূর করতে হবে।

সবশেষে, দেশের স্বার্থে এবং নিজেদের ভবিষ্যতের কথা ভেবেই বাংলাদেশের পরিশ্রমী মানুষকে তাদের নিজেদের মধ্য থেকেই একজন বার্নি স্যান্ডার্সকে খুঁজে বের করতে হবে।

লেখক: