Image description

আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আগের মতোই পিছিয়ে বাংলাদেশ। ২২ সূচকের মধ্যে দুর্নীতি ও শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষাসহ ১৫টি খারাপ অবস্থায় (রেড জোন)। বাকি সাতটির অবস্থান ভালো (গ্রিন)। এর মধ্যে গত বছরের তুলনায় শুধু ‘সরকারের কার্যকারিতা’য় উন্নতি হয়েছে। এসব তথ্য উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশনের (এমসিসি) মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। এটি গত শুক্রবার সংস্থাটির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়।

এমসিসির মূল্যায়নে কয়েক বছর ধরেই বেশ নাজুক অবস্থায় বাংলাদেশ। এক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা বেশ এগিয়ে। একমাত্র আফগানিস্তান রয়েছে পেছনে। এসব সূচকের উন্নতির ভিত্তিতে কোনো দেশকে ‘মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ডে’ যুক্ত করে যুক্তরাষ্ট্র। সেই সুযোগ থেকে এ বছরও বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। তবে অবস্থান পরিবর্তনে কোনো তৎপরতাই নেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি)। বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, ফান্ড থেকে অনুদান পাওয়াটা মুখ্য বিষয় নয়, এর সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তির বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

সংস্থাটির ২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্কোরকার্ডে রেড জোনে থাকা সূচকগুলো হচ্ছে— দুর্নীতি প্রতিরোধ, সরকারের দায়বদ্ধতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকারিতা, বাণিজ্য নীতিমালা, ঋণপ্রাপ্তির সুবিধা, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ, সম্পদ ও জমির অধিকার এবং অর্থনীতিতে নারী ও পুরুষের সমতা। এ ছাড়া রয়েছে বিজনেস স্টার্টআপ, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয়, মানবসম্পদ উন্নয়ন, প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, শিশু স্বাস্থ্য সুরক্ষা, আইনের শাসন এবং তথ্য পাওয়ার স্বাধীনতা।

অন্যদিকে গ্রিন জোনে থাকা সূচকগুলো হচ্ছে— মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থানের সুযোগ, বাজারের প্রতিযোগিতা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ নিয়ন্ত্রণ, মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীদের সমাপ্তির হার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সরকারের কার্যকারিতা।

ইআরডির সাবেক সিনিয়র সচিব কাজী শফিকুল আযম আগামীর সময়কে বলেছেন, এমসিসি যেসব সূচকের ভিত্তিকে মূল্যায়ন করে সেগুলোর অধিকাংশই একটি দেশের সুশাসনের সঙ্গে যুক্ত। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ যদি সুশাসনে অগ্রগতি লাভ করে তাহলে মূল্যায়নের অনেক ভালো ফল আসতে পারে। এখানে সরকারকে বিশেষ নজর দিতে হবে। তবে এ বিষয়টির সঙ্গে শুধু অনুদান পাওয়া বা না পাওয়াই নয়, এই স্কোরের সঙ্গে দেশের ভাবমূর্তিও নির্ভর করছে। এ মূল্যায়নের সঙ্গে রাজনীতিও যুক্ত রয়েছে। স্কোর উন্নতিতে ইআরডি খুব বেশি কিছু করে না। বলতে গেলে করারও থাকে না। এর উন্নতির জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উদ্যোগ নিতে পারে— যোগ করলেন তিনি।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্কোরে পিছিয়ে থাকার ফলে এবারও মিলছে না যুক্তরাষ্ট্রের মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ডের (এমসিএফ) মোটা অঙ্কের অনুদান সহায়তা। স্কোরকার্ডের উন্নতির ভিত্তিতে কোনো দেশকে এ ফান্ডে যুক্ত করা হয়। ইআরডির পক্ষ থেকে গত কয়েক বছর চেষ্টার পর এখন হাল ছেড়ে দিয়ে হাত গুটিয়ে রয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার আগামীর সময়কে বলেছেন, এই সূচকগুলোর উন্নতি ঘটানোই বর্তমান সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ। একটি নতুন সরকার গঠন হওয়ায় হয়তো গতবারের লাল তালিকায় থাকা সরকারের কার্যকারিতা সূচক এবার সবুজ তালিকায় উঠে এসেছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সরকারের কার্যকারিতা কতটুকু হয়, সেটি দেখার বিষয়। সরকারের উচিত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যক্রম পদক্ষেপ নিয়ে এই স্কোরের উন্নতি ঘটানো।

কোন বছর কেমন অবস্থা

এমসিসির গত কয়েক বছরের প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২২টি সূচকের মধ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্কোরে সামান্য উন্নতি হয়েছে। এবার ১৫টি সূচক রেড জোনে থাকলেও, ২০২৫-২৬-এর প্রতিবেদনে এটি ছিল ১৬টি, ২০২৪-২৫ প্রতিবেদনে ২০টি সূচকের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা হয়েছিল। সেখানে রেড জোনে ছিল ১৭টি। ২০২৩-২৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের ১৭টি সূচক ছিল রেড জোনে।

প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে তুলনামূলক চিত্র

প্রতিবেশী সব দেশের পেছনেই রয়েছে বাংলাদেশের স্কোর। শুধু আফগানিস্তানের চেয়ে কিছুটা এগিয়ে। এক্ষেত্রে ভারত ২২টি সূচকের মধ্যে ৮টি রয়েছে রেড জোনে। এ ছাড়া নেপাল ২টি, ভুটান ৪টি, শ্রীলঙ্কার ১২টি এবং পাকিস্তানের ১৩টি সূচক আছে রেড জোনে। বাংলাদেশের পেছনে থাকা আফগানিস্তানের রেড জোনে রয়েছে ১৮টি সূচক।

এমসিসি কী এবং কেন এই মূল্যায়ন

সাবেক সচিব আরাস্তু খান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ড গঠন করে। এটি পরিচালনার জন্য ২০০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসিসি)। এ ফান্ড গঠনের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া। এমসিএফের আওতায় স্টেট ডিপার্টমেন্ট দুটি কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচিত দেশগুলোকে সহায়তা করে থাকে। এর একটি হচ্ছে থ্রেসহোল্ড কান্ট্রি বা প্রান্তিক দেশ। এ কর্মসূচির আওতায় সাধারণত ১০ কোটি থেকে ৪০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত অনুদান দেওয়া হয়ে থাকে। অন্যটি হচ্ছে, কমপ্যাক্ট অর্থাৎ বড় অঙ্কের সহায়তা। এর আওতায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার থেকে বিভিন্ন অঙ্কের অনুদান দেওয়া হয়ে থাকে। এই ফান্ডের সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে যুক্ত করতে প্রতি বছর বৈঠক করে মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ করপোরেশন (এমসিসি)। কোনো দেশকে মূল্যায়নের জন্য প্রথমদিকে ১৭টি সূচক থাকলেও সর্বশেষ ২০১২ সালে ২০টি করা হয়। এখন ২০২৬ সালে এসে দুটি সূচক বাড়িয়ে ২২টি করা হয়েছে।

সুযোগ এসেছিল একবার

ইআরডি সূত্র জানাচ্ছে, ২০১২ সালে প্রথমবারের মতো মিলেনিয়াম চ্যালেঞ্জ ফান্ডে বাংলাদেশের যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন হিলারি ক্লিনটন। তিনি বাংলাদেশ সফরে এলে ওই ফান্ডে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে তাকে অনুরোধ করা হয়েছিল। পরে স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে এ-সংক্রান্ত এক বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন সরকারের প্রতিনিধিরা।
সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতি বছর বাংলাদেশের পার্টনারশিপ ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হবে; কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রক্রিয়াটি আর এগোয়নি।