বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন আছে যেগুলো কেবল একটি ঘটনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং পরবর্তী বহু বছরের রাজনীতি, রাষ্ট্রক্ষমতার বিন্যাস ও রাজনৈতিক বয়ানকে প্রভাবিত করেছে। ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর তেমনই একটি দিন। অভ্যুত্থান, পালটাঅভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড আর ক্ষমতার টানাপোড়েনে বিপর্যস্ত একটি রাষ্ট্রে সেদিন ঘটে যায় আরেকটি বড় পরিবর্তন। বন্দিদশা থেকে মুক্ত হন তৎকালীন সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। বদলে যায় ক্ষমতার সমীকরণ, খুলে যায় রাষ্ট্রক্ষমতায় নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়ের পথ।
কিন্তু ৭ নভেম্বর কি কেবল একজন সেনাপ্রধানকে মুক্ত করার ঘটনা ছিল? নাকি এর মধ্য দিয়ে প্রকাশ পেয়েছিল সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা এবং রাষ্ট্রের গতিপথ পরিবর্তনের তাগিদ? পাঁচ দশক পরও দিনটি নিয়ে রাজনৈতিক দল, ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের মধ্যে রয়েছে ভিন্ন ব্যাখ্যা। কারও কাছে এটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস, কারও কাছে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস। আবার ইতিহাসের আরেক পাঠে এটি সামরিক ক্ষমতার পালাবদলের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।
অভ্যুত্থান-পালটা অভ্যুত্থানে উত্তাল ১৯৭৫
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে দেশে যে রাজনৈতিক ও সামরিক অস্থিরতার সূচনা হয়, তার ধারাবাহিকতায় ৩ নভেম্বর ঘটে আরেকটি সামরিক অভ্যুত্থান। ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি অংশ তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে তার বাসভবনে অন্তরীণ করে। সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলা হলেও এই পদক্ষেপের ফলে বাহিনীর বিভিন্নস্তরে অসন্তোষ ও ক্ষোভ তৈরি হয়। একই সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গনেও দেখা দেয় নতুন অনিশ্চয়তা।
এই প্রেক্ষাপটেই ৬ নভেম্বর মধ্যরাত পেরিয়ে ৭ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে সংঘটিত হয় সিপাহী বিদ্রোহ। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সদস্যরা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করেন। তবে এই অভ্যুত্থানের পেছনে কারা মূল ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা নিয়ে রয়েছে ভিন্নমত ও ব্যাখ্যা।
জিয়াকে মুক্ত করার নেপথ্যে যারা
তৎকালীন তরুণ সেনা কর্মকর্তা ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীর বিক্রমের মতে, ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মূল কারণ ছিল সেনাবাহিনীর চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধার। তার ভাষ্য, ‘খালেদ মোশাররফের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বাসভবনে অন্তরীণ করা। এতে সেনাসদস্যদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।’
হাফিজ উদ্দিন আহমেদ জানান, এ সময় কর্নেল আবু তাহেরের নেতৃত্বাধীন বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা সক্রিয় হয়ে ওঠে। সংগঠনটি ৫ নভেম্বর একটি লিফলেট ছড়িয়ে দেয়। এতে খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সেনাবাহিনীতে অফিসারদের পরিবর্তে সিপাহিদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব নির্বাচনের দাবিসহ ১২ দফা দাবি সামনে আনা হয়।
তার বর্ণনা অনুযায়ী, ৬ নভেম্বর রাতে বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, টু ফিল্ড রেজিমেন্ট এবং প্রথম বেঙ্গল ল্যান্সারের সদস্যরা অভ্যুত্থানে অংশ নেন। তবে জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে টু ফিল্ড রেজিমেন্টের আর্টিলারি সৈনিকদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। তারা জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করে নিজেদের ইউনিটে নিয়ে যান। পরে তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন।
চেইন অব কমান্ড পুনরুদ্ধারই ছিল লক্ষ্য
হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে ৭ নভেম্বরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে। সেটি হলো, জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার পর কর্নেল তাহের তাকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। শহিদ মিনারে গিয়ে জাতীয়তাবাদী ও বিপ্লবী সৈনিকদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের আমন্ত্রণ জানানো হলেও সেনাপ্রধান হিসেবে জিয়াউর রহমান তাতে সম্মতি দেননি। তিনি নিজেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চেয়েছিলেন বলে জানান হাফিজ উদ্দিন।
তার মতে, এই অবস্থান থেকেই কর্নেল তাহেরের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের দূরত্ব তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার নামে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। গ্রেফতার করা হয় কর্নেল তাহেরসহ সংশ্লিষ্টদের। হাফিজ উদ্দিনের মূল্যায়ন, জিয়াউর রহমান কঠোর অবস্থান না নিলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে পারত।
৭ নভেম্বর ছিল জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন
অন্যদিকে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমেদ ৭ নভেম্বরকে দেখছেন ভিন্ন এক দৃষ্টিকোণ থেকে। তার মতে, এটি ছিল বিপ্লবী অভ্যুত্থান এবং জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। সেনাবাহিনীর সর্বস্তরের সদস্য এবং সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনের মধ্য দিয়ে সেদিন ক্ষমতার পালাবদল ঘটে।
মহিউদ্দিন আহমেদের বিশ্লেষণে, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান এবং ৩ নভেম্বরের পালটাঅভ্যুত্থান কোনোটিই সেনাবাহিনীর বৃহত্তর অংশ ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারেনি। বিশেষ করে ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পর মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল, দেশ আবার ১৫ আগস্টের আগের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ফিরে যেতে পারে। ফলে ওই অভ্যুত্থানকারীরা সেনাবাহিনী কিংবা সাধারণ মানুষের ব্যাপক সমর্থন পাননি।
কিন্তু ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানে সেনাবাহিনীর র্যাঙ্ক অ্যান্ড ফাইলের বড় অংশ সমর্থন জানায় বলে মনে করেন তিনি। তার ভাষায়, ‘রাষ্ট্রক্ষমতাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই ছিল এমন একটি অভ্যুত্থান, যেখানে সর্বস্তরের মানুষের সমর্থনের প্রতিফলন দেখা গিয়েছিল।’
কর্নেল তাহেরের ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমত
জনপরিসরে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত রয়েছে, তাহেরের উদ্যোগেই জিয়াউর রহমান মুক্ত হয়েছিলেন। তবে হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন দাবি। তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানকে মুক্ত করার ক্ষেত্রে টু ফিল্ড রেজিমেন্টের আর্টিলারি সৈনিকদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য।’
অন্যদিকে মহিউদ্দিন আহমেদ মনে করেন, ‘কর্নেল তাহেরকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়।’ তার মতে, অভ্যুত্থানের মূল রাজনৈতিক শক্তি ছিল জাসদ। দলটির নেতারা অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা করেছিলেন এবং তাহেরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যক্তিগত সমীকরণ ও তাড়াহুড়ার কারণে সেই পরিকল্পনা সফল হয়নি।
মহিউদ্দিন আহমেদের ব্যাখ্যায়, জাসদের পরিকল্পনা ছিল ৯ নভেম্বর থেকে হরতাল-অবরোধের মাধ্যমে আন্দোলন গড়ে তোলার। কিন্তু তার আগেই ৬ নভেম্বর রাতে অভ্যুত্থান ঘটানোর চেষ্টা করা হয়। ফলে সেটি কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক পরিণতি পায়নি।
মুক্তির পরও থামেনি রক্তপাত
৭ নভেম্বরের পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহও ছিল রক্তাক্ত। সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ সংঘাত থামেনি। নিহত হন বেশ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা। হাফিজ উদ্দিন আহমেদের বক্তব্য অনুযায়ী, ‘৭ নভেম্বর রাতেই ১৩ জন সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকাণ্ডের পর জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কঠোর পদক্ষেপ নেন। গ্রেফতার হন কর্নেল তাহের ও সংশ্লিষ্ট নেতারা।’ পরবর্তী সময়ে তাহেরের বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।
এখানেই ৭ নভেম্বরের ইতিহাসের একটি বড় বৈপরীত্য সামনে আসে। যে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে জিয়াউর রহমান বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয়েছিলেন, সেই অভ্যুত্থানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি অংশের সঙ্গেই পরবর্তী সময়ে তার সংঘাত তৈরি হয়। সিপাহী বিদ্রোহের মাধ্যমে মুক্তি পাওয়া সেনাপ্রধান শেষ পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে প্রচলিত শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে যান। ফলে ৭ নভেম্বরের সূচনালগ্নের বিপ্লবী আকাঙ্ক্ষা এবং পরবর্তী রাষ্ট্রক্ষমতার বাস্তবতার মধ্যে তৈরি হয় দূরত্ব।
ক্ষমতার কেন্দ্রে জিয়াউর রহমান
৭ নভেম্বরের পর জিয়াউর রহমান ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসেন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন, নির্বাচন এবং নতুন রাজনৈতিক ধারার বিকাশ তাঁর শাসনামলের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে ওঠে। তবে একই সঙ্গে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশ নিয়েও রয়েছে নানা ঐতিহাসিক বিতর্ক।
মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, ৭ নভেম্বরের পর ক্ষমতার পালাবদলের মধ্য দিয়ে বহুদলীয় ব্যবস্থায় ফেরার পথ তৈরি হয়। তবে তাঁর বিশ্লেষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তাও রয়েছে একনায়কতন্ত্র সামরিক পোশাকে হোক কিংবা বেসামরিক পোশাকে, তার প্রকৃতি নির্ভর করে ক্ষমতার ব্যবহার ও শাসনব্যবস্থার ওপর।
বিএনপি ও জাসদের বয়ানে দুই ভিন্ন ৭ নভেম্বর
আজও ৭ নভেম্বরকে ঘিরে বিএনপি ও জাসদের রাজনৈতিক বয়ান আলাদা। বিএনপির কাছে এটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। দলটির রাজনৈতিক ইতিহাসে দিনটি জিয়াউর রহমানের মুক্তি, জাতীয় ঐক্য এবং স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক। অন্যদিকে জাসদের কাছে এটি সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থান দিবস, যার সঙ্গে যুক্ত ছিল সেনাবাহিনীর ভেতরে বৈষম্য ও শ্রেণিভিত্তিক কাঠামো ভাঙার আকাঙ্ক্ষা।
একই ঘটনার এমন ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণ কী? মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের অবস্থান ও ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা থেকে ৭ নভেম্বরকে ব্যাখ্যা করে। ফলে একই দিন এক পক্ষের কাছে বিপ্লব ও সংহতির প্রতীক, অন্য পক্ষের কাছে সিপাহী-জনতার অভ্যুত্থানের স্মারক।
পাঁচ দশক পরও অমীমাংসিত ইতিহাস
বিশ্লেষকরা বলছেন, পাঁচ দশক পর ৭ নভেম্বরকে মূল্যায়ন করতে গেলে তাই একপক্ষের রাজনৈতিক বয়ানে আটকে থাকার সুযোগ নেই। এই দিনের সঙ্গে যেমন জিয়াউর রহমানের উত্থান জড়িয়ে আছে, তেমনি জড়িয়ে আছে কর্নেল তাহের, জাসদের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সাধারণ মানুষের প্রত্যাশার ইতিহাস। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অভ্যুত্থান-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের বাস্তবতাও।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সবমিলিয়ে ৭ নভেম্বর কেবল একটি সামরিক অভ্যুত্থানের দিন নয়; এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক সন্ধিক্ষণ। সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে যেমন ছিল শৃঙ্খলা ও কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা, তেমনি ছিল বৈষম্যহীন সেনাবাহিনী এবং রাষ্ট্রের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের স্বপ্ন।
কিন্তু সেই স্বপ্নের কতটা বাস্তবায়িত হয়েছিল, আর কতটা হারিয়ে গিয়েছিল ক্ষমতার নতুন সমীকরণে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই ৭ নভেম্বরের ইতিহাসকে বারবার ফিরে দেখতে হয়।