বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাংলাদেশ। তবে শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরির ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। এশিয়া ও প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক শ্রমিকদের মাসিক ন্যূনতম মজুরি অনেক কম। কোনো কোনো দেশে একজন পোশাক শ্রমিকের ন্যূনতম মাসিক বেতন বাংলাদেশের তুলনায় দ্বিগুনেরও বেশি। ২০২৬ সালের বিভিন্ন দেশের মজুরি ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের তথ্য বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে।
ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন রুবেল হোসেন। ছয় সদস্যের পরিবারের খরচ জোগাতে গিয়ে প্রতিনিয়ত হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। চরচাকে তিনি বলেন, “কয়েক বছর আগে আমার বেতন বেড়ে ১৬ হাজার টাকা হয়েছিল। গ্রেড একটু উপরে হওয়ায় ন্যূনতম বেতনের একটু বেশি পাই। ওভারটাইম করলে কোনো কোনো মাসে পাই ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু এই টাকা দিয়েও সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে।”
রুবেল হোসেন বলেন, “এখন জিনিসপত্রের যে দাম, তাতে ছয়জনের সংসার চালানো কঠিন। সংসারের খরচ মেটাতে গিয়ে অনেক প্রয়োজনীয় খরচও বাদ দিতে হচ্ছে। আমি বলছি না যে, বেতন অনেক কম। বেতন যা আছে, সেটাই থাকুক। কিন্তু সরকার যদি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কমিয়ে দেয়, তাহলে আমাদের জন্য কিছুটা স্বস্তি হবে। আগে যখন জিনিসপত্রের দাম কম ছিল, তখন এই বেতনেই সংসার চালাতে সমস্যা হতো না।”
বাংলাদেশে বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ডলারের হিসাবে তা প্রায় ১০২ ডলার। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নতুন মজুরি কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর থেকে এই হার বহাল রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পোশাকশিল্পবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান হার্টজম্যান গ্লোবাল ইন্টেলিজেন্সের (এইচজিআই) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কম্বোডিয়ায় পোশাক শ্রমিকদের ২০২৬ সালের মাসিক ন্যূনতম মূল বেতন ২১০ ডলার। অর্থাৎ, বাংলাদেশের একজন পোশাক শ্রমিকের তুলনায় কম্বোডিয়ার শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন প্রায় দ্বিগুন।
শ্রীলঙ্কা ও মিয়ানমারে পোশাক শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক বেতন ৯৭ ডলার, পাকিস্তানে ১৪৩ ডলার, ভারতে ১৩২ থেকে ১৯২ ডলার, ভিয়েতনামে ১৪৮ থেকে ২১২ ডলার এবং ইন্দোনেশিয়ায় ১৩৮ থেকে ৩৪০ ডলার। লাওসে এই বেতন ১১৬ ডলার।
চীনের ক্ষেত্রে মজুরি অঞ্চলভেদে আলাদা। দেশটির ন্যূনতম মাসিক মজুরি ২৫০ থেকে ৩৫৩ ডলার। তুরস্কেও বাংলাদেশের তুলনায় ন্যূনতম মজুরি অনেক বেশি। দেশটির ন্যূনতম মাসিক মজুরি প্রায় ৬৫৫ ডলার।
এ প্রসঙ্গে জাতীয় গার্মেন্টস শ্রমিক ফেডারেশনের সভাপতি আমিরুল হক আমিন চরচাকে বলেন, “অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের শ্রমিকদের বেতন অনেক কম। এই বেতনে আমাদের জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই সরকারের কাছে আমাদের দাবি নূন্যতম মজুরি যেন ২৬০ ডলার বা প্রায় ৩২ হাজার টাকার কাছকাছি করা হয়। এটা হলে শ্রমিকরা ভালোভাবে বাঁচতে পারবে। আমি আশা করি, সরকার শ্রমিকদের জন্য ভালো কিছু করবে।”
বিজিএমইএর সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও এইচকেসি অ্যাপারেলসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাকিবুল আলম চৌধুরী চরচাকে বলেন, “আমাদের এখানে মূল সমস্যাটা হলো, পণ্যের বৈচিত্র্য নাই। আমরা দীর্ঘদিন একটা কাজ করতে করতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। তাই আমরা সবাই বেসিক পোশাকই বানাই। এই পোশাকের দাম কম। তাই আমাদের আয়ই হয় কম। আর আয় যেহেতু কম হয়, সেহেতু আমরা চাইলে শ্রমিকদের অনেক বেশি বেতন দিতে পারি না। কারণ, বেতন বাড়লে সেটা প্রডাকশন খরচে ঢুকে যাবে। তখন প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পিছিয়ে পড়ব। আশা করি, সরকার সব পক্ষের কথা বিবেচনায় নিয়ে মজুরি নির্ধারণ করবে।”
তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক এবং বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও মহিউদ্দিন রুবেল চরচাকে বলেন, “বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় কম, বিষয়টিকে আমি সেভাবে দেখছি না। শুধু বিভিন্ন দেশের শ্রমিকদের মজুরি তুলনা করলেই প্রকৃত চিত্র পাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ও কাজের দক্ষতাও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি।”
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “মনে করুন, একজন শ্রমিক ঘণ্টায় ১০০ টাকার সমপরিমাণ উৎপাদন করল। আর আরেকজন শ্রমিক একই সময়ে ২০০ টাকার সমপরিমাণ উৎপাদন করল। তাহলে দুজনের মজুরি সমান হওয়া কি যৌক্তিক? যে শ্রমিক বেশি উৎপাদন করবেন, তার মাধ্যমে মালিকও বেশি আয় করতে পারবেন। ফলে ওই শ্রমিককে তুলনামূলক বেশি মজুরি ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া মালিকের জন্যও সহজ হবে। এতে শ্রমিক ও মালিক উভয়ই লাভবান হবেন।”
মহিউদ্দিন রুবেলের মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে কাজ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। তাই ভিয়েতনাম বা অন্য কোনো প্রতিযোগী দেশের শ্রমিকের মজুরির সঙ্গে বাংলাদেশের শ্রমিকের মজুরির সরাসরি তুলনা করা ঠিক হবে না।
এদিকে নতুন করে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণে মজুরি বোর্ড গঠনকে কীভাবে দেখছেন, জানতে চাইলে মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “বোর্ডে মালিক, শ্রমিক ও সরকারপক্ষের প্রতিনিধিরা রয়েছেন। আশা করি, বোর্ডের সিদ্ধান্ত মালিক ও শ্রমিক উভয়পক্ষের জন্য কল্যাণকর হবে।”
পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থা কেমন?
শ্রমিকদের মজুরিতে পিছিয়ে থাকলেও তৈরি পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ এখনো বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। তবে রপ্তানি প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রতিযোগীরা এগিয়ে যাচ্ছে।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশ তিন হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। আগের বছর রপ্তানির পরিমাণ ছিল তিন হাজার ৮৪৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ২০২৫ সালে তিন হাজার ৭৫১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। দেশটির রপ্তানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১০ দশমিক ৫৩ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে ভিয়েতনামের রপ্তানি ব্যবধান কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৩১ কোটি ডলারে।
একই সময়ে চীন এক লাখ পাঁচ হাজার ৭১১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে। ভারতের রপ্তানি এক হাজার ৭২৬ কোটি ডলার, কম্বোডিয়ার এক হাজার ১৫৬ কোটি ডলার, পাকিস্তানের ৯৯১ কোটি ডলার এবং ইন্দোনেশিয়ার ৯২৩ কোটি ডলার।
প্রবৃদ্ধির হিসাবে কম্বোডিয়া ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ, পাকিস্তান ৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ এবং ভারত ৫ দশমিক ৪৭ শতাংশ এগিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল এক শতাংশেরও কম।
অর্থাৎ, কম মজুরির সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষ করে ভিয়েতনামের সঙ্গে ব্যবধান কমে আসা বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য নতুন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
কম মজুরির কোনো সুবিধা পাচ্ছে বাংলাদেশ?
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পোশাকশিল্পে শ্রমিকদের মজুরি উৎপাদন ব্যয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তুলনামূলক কম মজুরির কারণে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে আকর্ষণীয় উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। তবে শুধু কম মজুরি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদনশীলতা, জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তির ব্যবহার, অবকাঠামো, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং উৎপাদন ব্যয়ও রপ্তানি প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, “দেশের পোশাক খাত বর্তমানে নানামুখী সংকটে রয়েছে। এগুলো যদি আমরা কাটিয়ে উঠতে পারি তাহলে বেতন বাড়ালেও তেমন সমস্যা হবে না। বিশেষ করে, বিদ্যুৎ-জ্বালানির সংকট আছে। আমরা আশা করি, সরকার এই সংকট কাটিয়ে উঠবে। তাছাড়া বাংলাদেশ যেসব পোশাক রপ্তানি করে সেগুলো বেসিক পোশাক। আমাদের পণ্যে বৈচিত্র্য এনে মিডিয়াম বা অ্যাডভান্স পোশাকে যেতে হবে।”
খাত সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, বাংলাদেশের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়াটাই এখন বড় উদ্বেগের বিষয়। চীন ও ভিয়েতনাম গত বছর আন্তর্জাতিক বাজারে আগ্রাসী বিপণন করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির পরিবর্তনের পর তারা দ্রুত বাজার ধরার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশ সেই প্রচেষ্টার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি। ক্রেতারা একবার বাংলাদেশ থেকে অর্ডার কমিয়ে অন্য দেশে সরিয়ে নিলে সেই অর্ডার আবার ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে। তাই বাজারে হারানো অবস্থান পুনরুদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।