দীর্ঘ ছয় বছর পর এলপিজি গ্যাসের আমদানিকারক, বিপণনকারী, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়িয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। তবে এতেও বাজারে কোনো শৃঙ্খলা ফেরেনি। প্রতিটি সিলিন্ডারে এখনো সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০০ টাকা বা তারও বেশি অতিরিক্ত গুণতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে।
সরকার নির্ধারিত দামে যদি গ্যাস বিক্রিই নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই গণশুনানি বা দাম ঘোষণার অর্থ কী–তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সাধারণ ক্রেতা ও ভোক্তা অধিকার সংস্থাগুলো। প্রতিষ্ঠানগুলোকে যেখানে জবাবদিহির মধ্যে আনা যাচ্ছে না, সেখানে বিইআরসি কেন নতুন করে দামের ঘোষণা দেয়, সেই প্রশ্নও তুলছেন তারা।
বরাবরের মতোই নতুন দর ঘোষণার পর চুপ হয়ে আছে বিইআরসি। গত দুই মাসে কড়া হুঁশিয়ারি দেওয়া সরকারও এখন নীরব। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গত মাসে খুচরা বিক্রেতাদের দোকানে দোকানে যে অভিযান চালানো হয়েছিল, সেটিও এখন পুরোপুরি বন্ধ।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ টাইমসকে জানান, তিনটি অপারেটর কোম্পানি বেশি দামে গ্যাস বিক্রি করছে বলে তাদের কাছে খবর রয়েছে। তবে এই কোম্পানিগুলো নিজেরা গ্যাস আমদানি করে না; দেশের ভেতরের অন্য কোম্পানির কাছ থেকে গ্যাস কিনে তারা বিক্রি করে। তাদেরকে কারণ দর্শাতে ডাকা হয়েছে বলে জানান তিনি।
বাজারে ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ইতিমধ্যে কোম্পানিভেদে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছিল। এই পরিস্থিতির মধ্যেই বিইআরসি সিলিন্ডারপ্রতি ২২৩ টাকা দাম বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করে ২ হাজার ২৬ টাকা।
পুরো পরিস্থিতি নিয়ে মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ও সংবাদকর্মী রিয়াদুল করিম ফেসবুকে কটাক্ষ করে লিখেন, ‘গত দেড় মাস ধরে বাজারে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এখন বিইআরসি নতুন দাম ঠিক করল ২ হাজার ৬০ টাকা। কিন্তু সাংবাদিকরা সংবাদ ছড়িয়েছেন এলপিজির দাম নাকি বেড়েছে!’
সেই পোস্টে রসিকতা করে মগবাজারের আরেক সংবাদকর্মী হাফিজ মোল্লা মন্তব্য করেন, ‘তাহলে তো বাস্তবে দাম কমে গেছে!’
মোহাম্মদপুরের বসিলার ফাতেমা এন্টারপ্রাইজের মালিক আবদুস সালেক হাওলাদার জানান, তিনি বর্তমানে বসুন্ধরা ও বেক্সিমকোর সিলিন্ডার ২ হাজার ৫০০ টাকা, ইউনি সিলিন্ডার ২ হাজার ৩০০ টাকা এবং আইগ্যাস সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি করছেন।
অথচ এই দাম বাড়ানোর আগে প্রতিটি সিলিন্ডারের দাম প্রায় ২০০ টাকা কম ছিল।
সরকার নির্ধারিত দাম ২ হাজার ৬০ টাকা হওয়া সত্ত্বেও কেন বেশি দামে বিক্রি করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা তো সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস পাই না। আমাদেরই বেশি দামে কিনতে হয়। সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করতে হলে আমাদের কেনা খরচ পড়া উচিত ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা। অথচ আমরাই কিনছি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়।’
বাজারে গ্যাসের সরবরাহ সংকটের কথাও জানান এই বিক্রেতা। তিনি বলেন, ‘কোম্পানিগুলো পর্যাপ্ত গ্যাস দিচ্ছে না। বেক্সিমকো কিংবা বসুন্ধরা–কাউকেই ঠিকমতো পাওয়া যাচ্ছে না।’
আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলে সাধারণত এলপিজির দাম ঠিক করার সময় গণশুনানি করে না বিইআরসি। তবে ডিলারদের কমিশন বৃদ্ধিসহ ৭ দফা দাবিতে গত ১৫ ও ১৬ অক্টোবর সারাদেশে ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি।
এরপর ১৪ অক্টোবর সচিবালয়ে ব্যবসায়ী, বিইআরসি ও সরকারি কর্মকর্তাদের এক বৈঠকে ব্যবসায়ীদের দাবি পর্যালোচনার জন্য ২৯ অক্টোবর গণশুনানির সিদ্ধান্ত হয়।
সেই শুনানিতে আমদানিকারক, ডিলার ও পরিবেশকরা নিজেদের কমিশন বাড়ানোর পক্ষে নানা যুক্তি দেখান। অন্যদিকে ভোক্তার স্বার্থ রক্ষা সংস্থা ক্যাব (কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ তুলে ধরে।
তবে অতিরিক্ত দাম নেওয়ার অপরাধে কাউকে শাস্তি না দিয়েই গত ২ নভেম্বর নতুন দামের ঘোষণা দেয় বিইআরসি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, আমদানিকারক ও বোতলজাতকারী কোম্পানির খরচ ধরা হয় ৮০ টাকা ৮৮ পয়সা, ডিস্ট্রিবিউটরদের খরচ বাড়ানো হয় ৩৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানো হয় ২৫ টাকা।
এর পাশাপাশি বিশ্ববাজারে দাম বাড়া এবং ডলারের চড়া মূল্যের কারণে কাঁচামাল আমদানির খরচ বেড়ে যাওয়ায় নতুন দামে আরও ৮২ টাকা ১২ পয়সা যোগ করা হয়।
কিন্তু অতীতেও বারবার দাম সমন্বয় করা সত্ত্বেও বিক্রেতাদের নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি করাতে পারেনি বিইআরসি। এবার কমিশন ও ফি বাড়িয়েও একই পুরোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল।
ক্যাবের সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন টাইমসকে বলেন, ‘বিইআরসি এই বিষয়ে কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। সংস্থাটি এখন কেবল দাম বাড়ানোর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। নির্ধারিত দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে কিনা তা দেখার ব্যাপারে তারা যতটা উদাসীন, দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে তারা ততটাই উৎসাহী।’
গণশুনানিতে কোম্পানি বা বিক্রেতা সংস্থাকে জবাবদিহির আওতায় না আনার সমালোচনা করে তিনি আরও বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা দাম বাড়ানোর আবেদন নিয়ে এলেই বিইআরসি সাথে সাথে তা মেনে নেয়। তাই তাদের ভূমিকা কোনোভাবেই জনবান্ধব বা ভোক্তাবান্ধব হতে পারে না।’
ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন করা এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল–দাবি পূরণ হওয়ার পরও কেন বাজারে বেশি দামে গ্যাস বিক্রি হচ্ছে।
উত্তরে তিনি টাইমসকে জানান, তিনি বিষয়টি নিয়ে বিইআরসির কাছে গিয়েছিলেন। বিইআরসি থেকে তাকে জানানো হয়েছে, বাজারের সব কোম্পানি গ্যাস আমদানি করতে পারে না। কিছু কোম্পানি অন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে সিলিন্ডারে ভরে বিক্রি করছে, যা বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি করছে।
নাসির উদ্দিন মনে করেন, শুধু ডিলারদের সিলিন্ডার কেনা বন্ধ করে দিলে এই সংকট মিটবে না। যার কাছে খালি সিলিন্ডার আছে, সে ব্যবসা সচল রাখতে স্বাভাবিকভাবেই গ্যাস রিফিল করে বিক্রি করতে চাইবে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তবে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার কোনো আইনি ভিত্তি নেই–এ কথা মনে করিয়ে দিয়ে কমিশনের পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আইন অনুযায়ী অতিরিক্ত দাম নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার আমাদের রয়েছে এবং আমরা সেই চেষ্টাই করছি।’
তিনটি কোম্পানিকে তলব করা হয়েছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘গ্যাস বিভাগের দায়িত্বে থাকা সদস্য ওদের সাথে কথা বলবেন।’ তবে কোন তিনটি কোম্পানিকে তলব করা হয়েছে, তাদের নাম বিইআরসি চেয়ারম্যান স্পষ্ট বলতে পারেননি।
তিনি আরও বলেন, ‘গত সেপ্টেম্বর মাসে আমরা কোম্পানিগুলোর বিক্রির তথ্য নিয়েছি। কোম্পানিগুলো যাতে প্রতিদিনের বিক্রির হিসেব জমা দিতে পারে, সে জন্য একটি নতুন সফটওয়্যার তৈরির কাজ চলছে।’