Image description

রানওয়ে থেকে হ্যাঙ্গার গেট, অ্যাপ্রন থেকে ইমিগ্রেশন এবং ইমিগ্রেশন থেকে কাস্টমসের গ্রিন চ্যানেল; বিমানবন্দরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে রাখা হয়েছে সিসিটিভি ও এআই ক্যামেরার নজরদারি। চোরাচালান ঠেকাতে রয়েছে অত্যাধুনিক স্ক্যানার ও গোল্ড ডিটেকশন মেশিন। যাত্রীদের ওপর নজরদারি করছেন বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা। এত আয়োজনের পরও হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করে দেশে আসছে স্বর্ণের চালান।

সবশেষ গত ২৮ অক্টোবরও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চীনের দুই যাত্রীর কাছ থেকে ১২ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করেছে ঢাকা কাস্টমস হাউসের প্রিভেনটিভ টিম। সেদিন বিকাল সোয়া ৫টার দিকে তাদের শরীরে লুকানো অবস্থায় পেস্ট আকারের স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ২৪ কোটি টাকা। এর আগে গত ৪ অক্টোবরও হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের রানওয়েতে দুই বিমানকর্মীর জুতার ভেতর থেকে ৮০টি স্বর্ণবার উদ্ধার করেছে শল্ক গোয়েন্দারা। যেগুলোর ওজন ৯ দশমিক ৩৪ কেজি। বাজারমূল্য আনুমানিক ১৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

চোরাচালানের ঘটনায় বাহক হিসেবে যাত্রীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরে কর্মরত এক শ্রেণির অসাধু কর্মীরও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ গ্রেফতারও হচ্ছেন। তবে বাহক ধরা পড়লেও স্বর্ণের মূল কারবারিরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে চোরাচালানের পুরো নেটওয়ার্ক সম্পর্কে জানতে পারছেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরা। প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির এত আয়োজনের মধ্যেও কীভাবে চোরাকারবারিরা স্বর্ণের চালান আনছেন, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন গোয়েন্দারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শাহজালাল বিমানবন্দরে ৬০ কেজির বেশি স্বর্ণ জব্দ হয়েছে। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে জব্দ হয়েছিল প্রায় ৮৭ কেজি। ২০২৪ সালে এই পরিমাণ ছিল ২৬ কেজি।

শুল্ক গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পরিচালক কাজী আল মাসুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের নজরদারি কমেনি। আমাদের নজরদারির ফলে কিন্তু বড় বড় চালান ধরতে সমর্থ হয়েছি।’

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেখেন এখানে বাহক হিসেবে যেমন যাত্রীকে ব্যবহার করা হচ্ছে, তেমনি বিমানবন্দরে কর্মরত এক শ্রেণির অসাধু কর্মীদেরও ব্যবহার করা হচ্ছে। এরই মধ্যে বিমানের কয়েকজন গ্রেফতারও হলেন। হয়তো এ রকমভাবে পার করতে পেরেছে তার কারণে হতে পারে। তবে আমাদের পর্যবেক্ষণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, সকল সংস্থার তীক্ষ্ণ নজরদারির কারণে বিগত সময়ের তুলনায় স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।’

বিমানবন্দরের এয়ারসাইডে প্রযুক্তির জাল

গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, ফ্লাইট থেকে একজন যাত্রী নামার পর বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত তিনি প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারির আওতায় থাকেন। পুরো এলাকায় রয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। পাশাপাশি বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে বের হওয়ার আগপর্যন্ত কয়েকটি স্থানে রয়েছে এআই ক্যামেরা, যার সাহায্যে মুখ শনাক্ত করা হয়। অর্থাৎ, আগে কখনও স্বর্ণ বা চোরাচালানের পণ্যসহ কেউ ধরা পড়ে থাকলে তিনি বিমানবন্দরের অ্যারাইভাল এলাকায় আসামাত্র সংশ্লিষ্টদের কাছে সংকেত যায়।

এ ছাড়া রয়েছে অত্যাধুনিক স্ক্যানার ও গোল্ড ডিটেকশন মেশিন। এতসব প্রযুক্তি ও নজরদারির পরও কিছুদিন পরপরই স্বর্ণ জব্দের ঘটনা ঘটছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, ‘চোরাকারবারিরা জানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা বেশি। তারপরও কেন তারা স্বর্ণ নিয়ে আসছেন, এটা উদ্বেগের। তারা বিমানবন্দরের কর্মীদের ব্যবহার করারও চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারাও তো ধরা পড়ছে। এমনও হতে পারে, তারা এত নজরদারির পরও পাচার করতে সক্ষম হচ্ছেন।’

এক প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘আসলে বাহক তো ধরা পড়ছে। এরা এমন কাটআউট সিস্টেম ব্যবহার করে যে তার নিকট গোল্ড দিয়েছে তাকেও ঠিকমতো চেনে না। আর সেই পুরোনো পদ্ধতি, কোনো একটি কোড তাকে দেওয়া হয়েছে। বিমানবন্দরের বাইরে সেই কোড ব্যবহার করে স্বর্ণ হস্তান্তর করে। তাকে যখন ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, সে কিছু বলতে পারছে না। শুধু কোড জানে, আর কিছুই জানে না। এ কারণে মূল কারবারিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে। মূল কারবারি ধরতে পারলে পুরো সিন্ডিকেট ধরা যেতো।’

যাত্রীদের ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি

প্রযুক্তির নজরদারির পাশাপাশি যাত্রীদের ওপরও তীক্ষ্ণ নজর রাখা হয়। এই নজরদারি চালান গোয়েন্দা সংস্থার অন্তত অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা। বিশেষ করে দুটি গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তাদের পাশাপাশি কাস্টমস, কাস্টমস ইন্টেলিজেন্স, অ্যাভসেকসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিরা এ কাজ করেন।

জানা যায়, বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, ওমান, সিঙ্গাপুর এবং মালয়েশিয়া থেকে আসা যাত্রীদের ওপর সবচেয়ে বেশি নজরদারি করা হচ্ছে।

তিন বছরে স্বর্ণ জব্দের পরিমাণ


কাস্টমস প্রিভেন্টিভ টিমের রাজস্ব কর্মকর্তা ফারুক আব্দুল্লাহ জানান, ২০২৪ সালে শাহজালাল বিমানবন্দরে ২৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার হয়। ২০২৫ সালে উদ্ধার হয় প্রায় ৮৭ কেজি। আর চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৬০ কেজি।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিই। সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর আমরা ২১ কেজি স্বর্ণ বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দিয়েছি।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দীর্ঘদিন ধরেই স্বর্ণ চোরাচালানের একটি প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। এর মধ্যে রয়েছে ফলের ক্যারেট, যাত্রীর দেহ, লাগেজ বা বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের আড়ালে স্বর্ণ লুকানো। এ ছাড়া ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ল্যাপটপের ব্যাটারি, ট্রলির হাতল, এমনকি জুতা বা শার্টের কলারেও স্বর্ণ পাচারের নজির পাওয়া গেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও কাস্টমসের নজর এড়াতে চোরাকারবারিরা প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে।

তদন্তকারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই স্বর্ণ চোরাচালানের মূল উৎস হিসেবে কাজ করছে। এ ছাড়া সৌদি আরব, ওমান, কুয়েত ও কাতার থেকেও চোরাচালানের চালান আসছে।

গত ৩ অক্টোবর এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) পৃথক তিনটি অভিযানে সাতজনকে প্রায় ৭৮১ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ আটক করে। এর পরদিন, ৪ অক্টোবর বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কর্মীকে প্রায় ৯ কেজি ওজনের ৮০টি স্বর্ণের বারসহ গ্রেফতার করা হয়। কখনও যাত্রীকে, আবার কখনও বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্মীদের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। চক্রগুলো বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে বাংলাদেশে থাকা সহযোগীদের মাধ্যমে চালান গ্রহণ ও বিতরণ করে থাকে। সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাতেও বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

এর আগেও শাহজালাল বিমানবন্দরে স্বর্ণের বড় বড় চালান ধরা পড়েছে। গত ২ জুলাই একটি উড়োজাহাজের কার্গো হোল্ড থেকে ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণ এবং ১৯ জুলাই ফলের চালানের আড়ালে ১৬ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া গত ২৮ মার্চ দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট প্যানেল থেকে ১৭ কেজি ৯০১ গ্রাম স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। এসব ঘটনা বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে তদন্ত চলছে।

বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুল ইসলাম বলেন, ‘স্বর্ণ জব্দের ঘটনায় থানায় মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলো আমরা তদন্ত করি। আসামিদের রিমান্ডে এনেও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আমরা জানার চেষ্টা করি স্বর্ণের মালিক ও গন্তব্য। কিন্তু আমরা আশানুরূপ ফলাফল খুব একটা পাইনি। তবে দু-একটি ঘটনায় আমরা ভালো ফলাফল পেয়েছি। কার্গোতে স্বর্ণ উদ্ধারের ঘটনায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকেও গ্রেফতার করা হয়েছে।’

ঢাকা কাস্টমস হাউজের কমিশনার রইছ উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের সর্বত্র নজরদারি রয়েছে। চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে আমাদের আগের চেয়ে নজরদারি বাড়ানো রয়েছে। বিমানবন্দরে গোয়েন্দা নজরদারি ও তল্লাশি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। দেশি ও বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোকেও কঠোর নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে।’

এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের পুলিশ সুপার (অপারেশন্স) মোহাম্মদ নাজির আহমেদ খান বলেন, ‘বিমানবন্দর এলাকায় চুরিসহ অন্যান্য অপরাধ দমনে এয়ারপোর্ট এপিবিএন সর্বদা তৎপর এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছে। যেকোনো ধরনের অপতৎপরতা প্রতিরোধে এয়ারপোর্ট এপিবিএন বদ্ধপরিকর। বিমানবন্দরকে ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ, জনহয়রানিমূলক কর্মকাণ্ড, চুরি ও চোরাচালান প্রতিরোধে আমাদের অভিযান ও কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’

বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বাহক আটক করলেই হবে না, ভেঙে দিতে হবে পুরো চোরাচালান নেটওয়ার্ক। তাদের মতে, কার্গো, গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং ও নিরাপত্তা শাখায় সমন্বিত নজরদারি এবং আধুনিক স্ক্যানিং ব্যবস্থার পাশাপাশি কর্মকর্তাদের নিয়মিত বদলি ও রোটেশন জরুরি।