গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, সংবিধান সংশোধনসহ নানা ক্ষেত্রে ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী। এরমধ্যে বিরোধী দল লংমার্চ করে সরকারি দলকে নিয়ে নানা হুঁশিয়ারি দিয়ে যাচ্ছে। বলছে, গণভোটের রায় না মানলে সরকারের ক্ষমতায় থাকার অধিকার নেই।
এই বৈপরীত্যের মধ্যেও এক জায়গায় একই সুর দেখা গেছে সরকারি ও বিরোধী দলের নেতাদের বক্তব্যে। তারা বলছেন, সম্প্রতি পোশাক শ্রমিকদের চলমান আন্দোলনে রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ইন্ধন।
ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে কয়েকদিন আগে রাস্তায় নামেন পোশাক শ্রমিকরা। শুরুতে বিক্ষোভ সড়ক অবরোধে সীমাবদ্ধ থাকলেও ধীরে ধীরে তা ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। শ্রমিকরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছে। পুড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গাড়ি। এরমধ্যে তাদের বেতন বৃদ্ধির জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হলেও থামেনি বিক্ষোভ।
আজ সোমবার রাজধানীর মিরপুর, সাভার, আশুলিয়া, গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকা এবং নারায়ণগঞ্জে শ্রমিকরা রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করেছেন। কোথাও কোথাও পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষে জড়িয়েছেন শ্রমিকরা। গাজীপুরের ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে শ্রমিকদের অবস্থানের কারণে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ও শিল্প পুলিশের পাশাপাশি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সদস্যদেরও মোতায়েন করা হয়েছে।
মিরপুরে পুড়িয়ে দেওয়া হয় পুলিশের গাড়ি। ছবি: আগামীর সময়এ অবস্থায় ক্ষমতাসীন বিএনপি এবং বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী শ্রমিকদের অসহিষ্ণুতা ও মারমুখী হয়ে উঠার পেছনে আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্রের কথা বলছে। এ বিষয়ে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আভাস মিলেছে সরকারের পক্ষ থেকে। বিরোধী দলও এমনটিই চাইছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দাবি করেছেন, আন্দোলনের আড়ালে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের ঢাকা বার ইউনিটের আলোচনা সভায় বিএনপির শীর্ষ এ নেতা বলেছেন, সম্প্রতি যানবাহনে আগুন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সিংহভাগই পরাজিত স্বৈরাচারী শক্তির দোসর।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও দাবি করেছেন, শ্রমিক আন্দোলনের পেছনে রয়েছে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের ইন্ধন। এ বিষয়ে তার কাছে তথ্য থাকার কথাও বলেছেন তিনি।
আজ সচিবালয়ে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএর নেতাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে মন্ত্রী বললেন, এখানে কিছু শিল্প মালিক জড়িত আছেন, কিছু শ্রমিক সংগঠনের বানারে যারা শ্রমিকদের কল্যাণ চায় কি না, তাদের কিছু লোকজন অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে, সহিংসতা সৃৃষ্টি করেছে।
‘যেসব শিল্প মালিকদের রাজনৈতিক পরিচয় ছিল, যারা নিষিদ্ধ সংগঠনের হয়তো কোনো কোনো সময় কেউ এমপি বা কেউ মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী ছিল, সেসমস্ত শিল্প মালিকরা তারা এ সমস্ত অস্থিরতার পেছনে কাজ করছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে এবং সেটার প্রমাণও আছে,’ বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
এ ধরনের অপচেষ্টা কঠোরভাবে দমনে আইন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রী।
পুলিশকে লক্ষ্য করে শ্রমিকরা ঢিল ছুঁড়ছেন। ছবি: আগামীর সময়বিরোধী দল জামায়াত ইসলামীও মনে করছে, শ্রমিকদের বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্র নস্যাতে দলটি সরকারকে কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে।
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান আজ নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া পোস্টে লিখেছেন, পোশাকশিল্পে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অগ্নিসংযোগের মতো উদ্বেগজনক ঘটনা ঘটছে। কোনো মালিক কিংবা শ্রমিকই শিল্পপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন না। তিনি বিশ্বাস করেন, কোনো শ্রমিকই এ ধরনের কাজে জড়িত হবেন না।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ষড়যন্ত্রকারী ও ধান্দাবাজরা পরিস্থিতি উসকে দিয়ে পোশাকশিল্পকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে বলে মনে হয়। এ ব্যাপারে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
এদিকে মিরপুরে সংঘর্ষ ও ভাঙচুরের ঘটনায় চারটি মামলা করেছে পুলিশ। এসব মামলায় অজ্ঞাতপরিচয় সাড়ে ১০ হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। সংঘর্ষে জড়িত থাকার অভিযোগে এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২৯ জনকে।
এ বিষয়ে ডিবির মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান বললেন, আটকদের মধ্যে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা আছে।
পুলিশের এই কর্মকর্তার অভিযোগ, মিরপুরের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লার ভাগনে আলিফ মোল্লা শতাধিক ব্যক্তিকে সংগঠিত করে শ্রমিক আন্দোলনে পাঠিয়েছিলেন। তারাই পুলিশের গাড়িতে আগুন দিয়েছেন ও ভাঙচুর চালিয়েছেন।