Image description

গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক প্রশ্নফাঁস ও অনিয়মের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়। এই নজিরবিহীন প্রশ্নফাঁস এবং নিয়োগ দুর্নীতির প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ মিছিল, প্রতিবাদ সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচির মতো কঠোর পদক্ষেপ নেন চাকরিপ্রার্থীরা। রাজপথে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হকসহ দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি ওঠে। প্রশ্নফাঁসের ঘটনা উদঘাটন ও দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করার জন্য তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও এই কমিটি প্রতিবেদন দেওয়ার আগেই তড়িঘড়ি নতুন করে পরীক্ষার আয়োজন করা হয়।

তাও যে কমিটি পরীক্ষা ফাঁসের জন্য দায়ী তাদের অধীনেই নতুন পরীক্ষা নেওয়া হয়, যা নিয়ে ব্যাপক সমলোচনা চলছিল। এমনকি ১৬ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই নতুন পরীক্ষা নিয়েও ভয়াবহ রকমের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। পরের দিন ফলাফল ঘোষণায় দেখা গেছে, নিয়োগ পরীক্ষায় অনুপস্থিত ছিলেন এবং কেউ কেউ সাদা ওএমআর সিট জমা দিয়ে এসেছেন এরাও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন। এ নিয়ে ব্যাপক তোলপাড় চলছে সংশ্লিষ্ট মহলে।

অভিযোগ উঠেছে- প্রশ্নফাঁস নয়, এবার অন্য প্রক্রিয়ায় ঘুষের প্রার্থীদের পাস করিয়ে আনা হয়েছে। আর তারমধ্যেই ঘটেছে, প্রশ্নফাঁস তদন্ত কমিটির প্রধান যিনি, অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলমকে সচিব পদে পদোন্নতির ঘটনা। প্রশ্নফাঁসের মতো গুরুতর অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার পুরস্কার বা ঘুষ হিসেবে তিনি এই পদোন্নতি পেয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলে কানাঘুষা চলছে।

তদন্ত কমিটির নীরবতা ও ধামাচাপা দেওয়ার পাঁয়তারা
গত ১০ অক্টোবর প্রশ্নফাঁসের ঘটনার পরপরই জন অসন্তোষ ও সামাজিক ক্ষোভ প্রশমিত করতে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে প্রধান করে গঠন করা হয় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি। কমিটিকে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তবে নির্ধারিত সময়সীমা পার হয়ে দীর্ঘ দিন অতিবাহিত হলেও তদন্ত কমিটি এখনো কোনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি।

বিশ্বস্ত সূত্র ও সংশ্লিষ্টদের দাবি, তদন্তের নেপথ্য কারণ অত্যন্ত গভীর। সঠিকভাবে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত পরিচালনা করা হলে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসবে এবং প্রশাসনের ভেতরে ও বাইরে থাকা শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ চিহ্নিত হয়ে যাবেন। ফলে প্রকৃত আসামিদের রক্ষা করতে এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দিতেই তদন্ত প্রক্রিয়ায় চরম শ্লথগতি ও টালবাহানার আশ্রয় নেওয়া হচ্ছে।

আইওয়াশ গ্রেপ্তার ও প্রকৃত দোষীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে
তদন্ত ধামাচাপা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা দেখানোর উদ্দেশ্যে একটি ‘আইওয়াশ’ অভিযানের নাটক সাজানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বেশ কিছু ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হলেও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গ্রেপ্তারকৃতদের সাথে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, মুদ্রণ বা বিতরণের কোনো ন্যূনতম যোগসাজশ নেই। এমনকি তারা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের কর্মী বা কোনো প্রক্রিয়ার সাথে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যুক্ত নন। ফলে মূল প্রশ্নফাঁসকারী চক্র ও প্রশাসনের প্রভাবশালী রড-বোতামরা অধরাই থেকে যাচ্ছেন।

তদন্ত প্রধানকে ‘ঘুষ/পুরস্কার’: সচিব পদে বিতর্কিত পদোন্নতি
ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গত ১৮ অক্টোবর সামনে আসে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানকে পদোন্নতি দিয়ে একই মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব পদে উন্নীত করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলমকে সরিয়ে দিয়ে মাহফুজুল আলম খানকে সেই পদে বসানো হয়।

প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্র এবং সচেতন মহল বিষয়টিকে অত্যন্ত বিস্ময়কর ও সন্দেহজনক হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, গুরুতর প্রশ্নফাঁসের তদন্ত ঝুলিয়ে রেখে তদন্ত প্রধানকে এভাবে দ্রুত পদোন্নতি দেওয়া কোনো সাধারণ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়; বরং তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দেওয়ার বিনিময় হিসেবে বা ‘পুরস্কার/ঘুষ’ হিসেবে এই পদোন্নতি প্রদান করা হয়েছে। এর মাধ্যমে যুব উন্নয়নের প্রশ্নফাঁস তদন্তের কফিনে শেষ পেরেকটি মারা হলো এবং ভবিষ্যতে কোনো নিরপেক্ষ প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখার আশা ক্ষীণ হয়ে গেছে।

আমলাতান্ত্রিক ব্যাকগ্রাউন্ড ও রাজনৈতিক আনুকূল্য
পদোন্নতিপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মাহফুজুল আলম খানের অতীত ব্যাকগ্রাউন্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। তিনি বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তা, যার মেধা তালিকায় অবস্থান ব্যাচের শেষ দিকে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মেয়াদে তিনি নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেছেন এবং কট্টর আওয়ামী অনুগত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি পান। আওয়ামী আমলে তিনি চীনে বাংলাদেশ দূতাবাসে গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রেষণে নিয়োগ পান।

তার স্ত্রী দিল আফরোজাও বিসিএস ১৮তম ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। তিনিও পূর্ববর্তী সরকারের আমলে বিশেষ সুবিধাভোগী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। মাহফুজুল আলম খান চীনে পদায়নে থাকাকালে তার স্ত্রী দিল আফরোজাও লিয়েনের সুযোগ ভোগ করে চীনে অবস্থান করেন। দিল আফরোজা বর্তমানে প্রশাসনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদ, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

হতাশা ও ক্ষোভ চাকরিপ্রার্থীদের
তদন্ত কমিটির প্রধানকে পদোন্নতি প্রদান এবং প্রশ্নফাঁসের প্রকৃত দোষীদের আড়াল করার এই প্রচেষ্টায় চরম হতাশ ও ক্ষুব্ধ দেশের বেকার যুবক ও চাকরিপ্রার্থীরা। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, নামকাওয়াস্তে একটি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হলেও সেখানে মূল অপরাধীদের বাদ দিয়ে চুনোপুঁটিদের বলির পাঁঠা বানানো হবে, যার ফলে যুব উন্নয়নের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির মূল শেকড় উপড়ানো কখনই সম্ভব হবে না। তাছাড়া, এভাবে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে পূর্ব নির্ধারিত ব্যক্তিদের পাস করিয়ে আনার ঘটনা দেশের লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থীর সঙ্গে প্রতারণা ছাড়া কিছুই নয়, বলছেন সংশ্লিষ্টরা। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ১১তম গ্রেডের ২৪২ টি পদের এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রায় শত কোটি টাকার নিয়োগ বাণিজ্য হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শীর্ষকাগজের অন্য এক প্রতিবেদনে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

শীর্ষনিউজ