মৃত্যুর পর থেকে আলোচনায় রয়েছেন মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার অন্যতম সাক্ষী ও বাদী মানিক পশারী। তাকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে মৃত্যুর পর তার গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি তোলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীারা। অভিযোগ রয়েছে তার দাফনেও বাধা দেওয়ার। দেশব্যাপী আলোচিত এই ঘটনার পর প্রশ্ন উঠেছে মানিক পশারীর মুক্তিযুদ্ধে ভূূমিকা নিয়ে।
জামায়াত নেতাকর্মীদের দাবি, মানিক পশারী প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কারস্বরূপ তাকে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাটাগরিতে যুক্ত করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। তাই তার দাফনে নয়, বরং তাকে গার্ড অব অনার দেওয়ার বিষয়ে দলটির নেতাকর্মীদের আপত্তি ছিলো। যদিও পরবর্তীতে পুলিশি নিরাপত্তায় পিরোজপুর পুলিশ লাইন্সে তাকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয় এবং রাত ২টায় পুলিশ পাহারায় মানিক পশারীর লাশ দাফন করা হয়।
মুক্তিযুদ্ধে মানিক পশারীর ভূমিকা
গত ২৯ অক্টোবর পিরোজপুরে মানিক পশারীর ঘটনায় মানববন্ধন করে প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ সংসদ পিরোজপুর সদর উপজেলা কমান্ড। মানববন্ধন শেষে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক আহমেদ শহিদুল হক মানিক পশারীর ভূমিকা সম্পর্কে সাংবাদিকদের বলেন, “তৎকালীন সুন্দরবন এলাকার ভেতর দিয়ে নৌকা চালিয়ে শরণার্থী এবং প্রশিক্ষণ নিতে ইচ্ছুক মুক্তিযোদ্ধাদের ভারতে নিয়ে যাওয়ার কাজে যুক্ত ছিলেন মানিক পশারী। আমার বড় ভাই শহীদ ফজলুল হক খোকন প্রথম তাকে এবং তার চাচা রেয়াজ উদ্দিন পশারীকে এই কাজে নিয়োগ করেন। আমার ভাই শহীদ হওয়ার পর মেজর জিয়াউদ্দিন, যিনি সুন্দরবনে অবস্থানকালে সাব-সেক্টর কমান্ডার ছিলেন, তিনিও রেয়াজ উদ্দিন পশারী ও মানিক পশারীকে তার অধীনে কাজ করার জন্য অনুরোধ করেন। এভাবেই তিনি মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছেন মানিক পশারী।”
আহমেদ শহিদুল হক আরও বলেন, “১৯৮০ সালে প্রথম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা তৈরির সময় আমি পিরোজপুর জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের তৎকালীন মহকুমা ইউনিটের দায়িত্বে ছিলাম। তখন মানিক পশারীকে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে সহযোগিতা করি। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার ক্যাটাগরি তুলে দিয়ে সবাইকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই হিসেবেই তিনি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা হন।”
আওয়ামী লীগের পুরস্কার বলছেন দুই মুক্তিযোদ্ধা
মানিক পশারীর মৃত্যুর পরে সাংবাদিকদের দেওয়া একটি বক্তব্যে পিরোজপুরের বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন বলেন, “মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিপক্ষে সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়েছে। সাঈদী সাহেব কখনো রাজাকার ছিলেন না। ১৯৭১ সালে মানুষ তাকে চিনতো না। তিনি পিরোজপুরেও ছিলেন না। সাঈদী সাহেব একজন ভালো বয়ানকারী, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ইসলামী বক্তা ছিলেন।”
তিনি বলেন, “যেহেতু মানিক পশারী সরকারি গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, সে কারণে পুলিশ প্রশাসন তাকে গার্ড অব অনার দিতে বাধ্য হয়েছে। সাঈদী সাহেবের বিপক্ষে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে তৎকালীন সরকার পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানিয়েছে। সাঈদীর অনুসারীরা বাধা দিয়েছিল। আমরাও জানি, তিনি একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা।”
পিরোজপুরের আরেক মুক্তিযোদ্ধা মির্জা জহিরুল হক বলেন, “এই মানিক পশারী, সে সাঈদীর বিপক্ষে সাক্ষী দেওয়ার পরে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানো হয়। পরবর্তী সময় আর কোনো যাচাই-বাছাই না হওয়ার কারণে, স্বৈরাচার সরকার আওয়ামী লীগের সময় সে মুক্তিযোদ্ধার গেজেটভুক্ত হয়েছে। এদিকে সরকার যেহেতু তার একটা গেজেটে নাম আছে, এইজন্য সরকার সরকারের কাজ করেছে; কিন্তু আমাদের মুক্তিযোদ্ধা সংসদ বা সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা যারা, তারা এইটাকে মেনে নিতে পারেনি। সে যে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা, আমরা অবগত নই; আমরা এইটুকুই জানি যে, তিনি সাক্ষীর পরেই মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন।”
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক আহমেদ শহিদুল হক বলেন, “যে কেউ যদি দাবি করেন, মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা নন, তাহলে তার গেজেট প্রণয়নকারী জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও তথ্যপ্রমাণসহ আবেদন করে গেজেট বাতিলের দাবি জানাতে পারেন। এভাবে ফেসবুকে ও পত্রিকায় বিষয়টি ভাইরাল করার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তা অগ্রহণযোগ্য।”
মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা দাবি করে দুই মুক্তিযোদ্ধার দেওয়া বক্তব্যের প্রসঙ্গে আহমেদ শহিদুল হক বলেন, “আব্দুস সালাম বাতেন একজন মুক্তিযোদ্ধা। কিন্তু মির্জা জহিরুল হক গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা নন; তার ভাই মুক্তিযোদ্ধা। মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম বাতেন একজন রাজনৈতিক নেতা। তিনি কী কারণে রাজনৈতিকভাবে এমন বক্তব্য দিচ্ছেন, তা আমরা তার কাছে জানতে চাইব।”
স্থানীয় জামায়াত-বিএনপি যা বলছেন
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক গাজী কামরুজ্জামান শুভ্র মানিক বলেন, “দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার কারণে মানিক পশারীকে মুক্তিযোদ্ধা তৈরি করা হয়েছে এবং সাক্ষ্য দেওয়ার অনেক পরে তিনি গেজেটভুক্ত হয়েছেন। তবে আমি মুক্তিযুদ্ধের তর্কে যাব না, যুদ্ধের পরে আমার জন্ম। আমি বলতে চাই, একজন মুসলমান মরে গেলে তার দাফন-কাফন হতে হবে। এ ব্যাপারে আমরা কাউকে বাধা দিতে পারি না।”
পিরোজপুর-১ আসনের এমপি ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে মাসুদ সাঈদী ২৪ অক্টোবর ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে লিখেছেন, “কুখ্যাত মানিক পশারীর জানাজা বা দাফন নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য বা বাঁধা ছিল না, নেইও। আপত্তি ছিল একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে 'গার্ড অব অনার' প্রদান নিয়ে। যদিও প্রশাসন মিথ্যাচার ও জালিয়াতির মাধ্যমে প্রাপ্ত একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাকে গোপনে গার্ড অব অনার প্রদান করেছে। অবশ্যই ঘটনাটি এদেশের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের অপমান ও মহান স্বাধীনতার অবমাননা এবং দেশের আইনি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি চরম এক উপহাস বলে মনে করছি। যে ব্যক্তি স্বয়ং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জেরায় স্বীকার করেছেন তিনি মুক্তিযোদ্ধা নন— সেইরকম প্রতারক ব্যক্তিকে একজন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া এবং বছরের পর বছর সরকারি ভাতা ভোগ করতে দেওয়া কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।”
মানিক পশারীকে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা ও ডিও লেটার জালিয়াতির অভিযোগ তুলে মাসুদ সাঈদী লেখেন, “সবচেয়ে বড় জালিয়াতি হলো যখন মানিক পশারীকে ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী প্রশ্ন করেন যে, 'আপনি মুক্তিযোদ্ধা কিনা?' তখন সে স্পষ্ট করেই বলেছিল, “আমি সরাসরি মুক্তিযুদ্ধ করি নাই, তবে সহযোগিতা করেছি। আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছি। এই জন্য বর্তমান এমপি একেএমএ আওয়াল সাহেব আমার নামে একটি ডিও লেটার দিয়েছে আমার নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য। আমি পিরোজপুরে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করার পরে না আগে আমার ঐ ডিও লেটার দিয়েছে তা আমার স্মরণ নাই।”
এখানে মানিক পশারী অকপটে স্বীকার করেছে যে সে কোনো মুক্তিযোদ্ধা নয়। তবে এই মামলায় সাক্ষী হিসেবে আসার আগে তৎকালীন আওয়ামী দোসর কুখ্যাত এমপি আউয়াল তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর জন্য একটি ডিও (Demiofficial) লেটার দিয়েছিল। অর্থাৎ, স্রেফ মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে তাকে মুক্তিযোদ্ধা বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছিল।”
প্রসঙ্গত, ১৯৩৯ সালে জন্মগ্রহণ করা মানিক পশারী গত ২৪ অক্টোবর ৮৭ বছর বয়সে মৃত্যু বরণ করেন। সে হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল ৩২ বছর। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ পিরোজপুর জেলা শাখার আহ্বায়ক আহমেদ শহিদুল হকের বক্তব্য অনুযায়ী ১৯৮০ সালে মানিক পশারী প্রথম সহযোগী মুক্তিযোদ্ধা ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত হন। কিন্তু ২০২৩ সালের ১৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে (গেজেট নম্বর ২৯৩২) তাকে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাটাগরিতে যুক্ত করা হয়। অর্থাৎ মানিক পশারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পান মাত্র ৩ বছর আগে ৮৪ বছর বয়সে। মানিক পশারী পিরোজপুর সদর থানার চিছলিয়া গ্রামের সেজাউদ্দীন পশারীর ছেলে।
যা বলছেন পরিবারের সদস্যরা
মানিক পশারীর মৃত্যুর পর তার ছোট ভাই চাঁন মিয়া পশারীর একটি পুরোনো সাক্ষাৎকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, ‘অর্থের প্রলোভনে তার বড় ভাই সাঈদীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করেছিলেন এবং মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়েছিলেন।’
গত ২৬ অক্টোবর চাঁন মিয়া পশারী গণমাধ্যমকে দেওয়া বক্তব্যে জানান, “তখন (যুদ্ধের সময়) তার ভাই ম্যাট্রিক পাস করেছিলেন। তারা নিজেরা ছোট ছিলেন এবং জঙ্গলে গিয়ে পালিয়ে থাকতেন।”
চাঁন মিয়া বলেন, “মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় তার নাম তার ভাই মানিক পশারী দেননি। এর কারণ হিসেবে তিনি সাঈদী সাহেবের পক্ষে কথা বলার বিষয়টি উল্লেখ করেন। তার অভিযোগ, সাঈদীর প্রশংসা করতেন বলেই তার নাম মুক্তিবাহিনীর তালিকায় রাখা হয়নি।
সাঈদীর প্রসঙ্গে চাঁন মিয়া বলেন, “দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী রাজাকার ছিলেন না। সে সময় সাঈদী অনেক ছোট ছিলেন। রাজাকার ছিলেন রামেস মোল্লা, মোসলেম মাওলানা ও সেকেন্দার শিকদারের মতো ব্যক্তিরা।”
মানিক পশারীর বোন হাসিনা বেগম পরিবারের সদস্যদের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ এবং সাঈদীর বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে বলেন, “আমরা সবাই আওয়ামী লীগ, সবাই মুক্তিযোদ্ধা। তবে সাঈদী যুদ্ধাপরাধী ছিলেন কি না সে বিষয়ে আমি কিছু জানি না, আমার ভাই জানে।”
মানিক পশারীর আরেক বোন হেনা পশারী দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে ‘আল্লাহর ওলি’ বলে উল্লেখ করেছেন। তবে তার ভাই কেন সাঈদীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, সে বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানান তিনি। হেনা পশারী বলেন, ঘটনার সময় তিনি খুলনায় শ্বশুরবাড়িতে ছিলেন। পরে এ বিষয়ে ভাইয়ের সঙ্গে তাদের কোনো যোগাযোগ হয়নি। এমনকি বিষয়টি নিয়ে ভাইয়ের কাছে কিছু জানতেও চাননি তারা।