Image description

ভারত থেকে কম খরচে খাদ্যশস্য, পশুখাদ্যের কাঁচামাল, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী আমদানির সুযোগ রয়েছে বাংলাদেশের। কিন্তু বাংলাদেশ রেলওয়ের সক্ষমতার ঘাটতি, পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতা এবং পরিচালনাগত দুর্বলতার কারণে সেই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

বাংলাদেশে আসা ভারতীয় মালবাহী ট্রেনের ওয়াগন খালাস করে ফেরত পাঠাতে ১০ দিনেরও বেশি সময় লাগছে। এতে ভারতের বিভিন্ন স্টেশনে পণ্যবোঝাই ট্রেন আটকে থাকছে। ব্যাহত হচ্ছে পণ্য সরবরাহ। বাড়ছে আমদানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ঝুঁকি।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, পাথর, গম, ভুট্টা ও মাছ, পোলট্রি ও দুগ্ধশিল্পের পশুখাদ্য তৈরির কাঁচামালবাহী একাধিক ট্রেন বাংলাদেশে প্রবেশ ও পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব পণ্য সময়মতো দেশে আনা না গেলে আমদানিকারকদের ব্যাবসায়িক পরিকল্পনা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ ও নির্মাণ খাতে সরবরাহের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি ও পাথর ব্যবসায়ী আবদুল ওয়াহেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, রেলওয়ের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনার কারণে পাথর ব্যবসা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আমদানীকৃত পাথর পরিবহনের জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াগন বা রেক সময়মতো পাওয়া যাচ্ছে না।

ফলে পাথর যথাসময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি বলেন, ওয়াগনসংকটের কারণে অনেক সময় বাড়তি খরচে সড়কপথে পাথর আনতে হচ্ছে। সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা লোকসানের মুখে পড়ছেন। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে স্থানীয় অর্থনীতি, নির্মাণ ও আবাসন খাতে।

রেলসংশ্লিষ্টদের মতে, সংকটের অন্যতম প্রধান কারণ বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ও লোকোমাস্টারের স্বল্পতা।

এর পাশাপাশি পণ্য ওঠানো-নামানোর লাইনের অপর্যাপ্ত দৈর্ঘ্য, হাতে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা, স্টেশন ইয়ার্ডের পুরনো সিগন্যালিং এবং বিভিন্ন বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।

খাদ্যশস্য আমদানিতেও অনিশ্চয়তা : বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় ভারত থেকে গম আমদানির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। সম্প্রতি প্রতি টন ৩১০ থেকে ৩২২ মার্কিন ডলার দরে ভারত থেকে দুই লাখ টন গম আমদানি করেছে বাংলাদেশ। কিন্তু পণ্য গ্রহণ ও খালাসে বিলম্ব হলে পরবর্তী ধাপেও জট তৈরি হয়। দর্শনায় কর্মরত এক স্টেশন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে কালের কণ্ঠকে

বলেন, গমবোঝাই একটি ট্রেন ভারতীয় অংশের সংশ্লিষ্ট স্টেশনে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একটি ওয়াগন দীর্ঘ সময় আটকে থাকলে নতুন পণ্য পরিবহনে সেটি ব্যবহার করা সম্ভব হয় না। ফলে রেলপথের সামগ্রিক পরিবহন সক্ষমতা সংকুচিত হয়।

সার্বিক সংকট প্রসঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিবহন ও পরিচালন বিভাগের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, পর্যাপ্ত ব্রডগেজ লোকোমোটিভ ও অভিজ্ঞ লোকোমাস্টারের ঘাটতি, পুরনো সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং স্টেশন ইয়ার্ডে পণ্য ওঠানো-নামানোর লুপ লাইনের সীমিত দৈর্ঘ্যের কারণে কাঙ্ক্ষিত গতিতে খালাস করা যাচ্ছে না। এ অবস্থার নিরসনে ভারতীয় রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে দর্শনা, বেনাপোল ও রহনপুর পয়েন্টে অতিরিক্ত ইঞ্জিন বরাদ্দ এবং ইয়ার্ডের সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

আমদানিকারকদের লোকসানের অভিযোগ : ভারত থেকে কৃষিপণ্য আমদানিকারক আরআরপি অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী রফিক উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ভারত থেকে কৃষিপণ্য আমদানি করতে গিয়ে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ে পণ্য না পাওয়া, সরবরাহে বিলম্ব এবং পণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যাচ্ছে।

রফিক উদ্দিনের মতে, ভারত থেকে পণ্য আমদানির পর বাংলাদেশ অংশেও পরিবহন জটিলতা ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি বাড়াচ্ছে।

পশুখাদ্যের কাঁচামাল সরবরাহেও চাপ : ভারত থেকে রেপসিড এক্সট্র্যাকশন ও সয়াবিন এক্সট্র্যাকশনজাত পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। এসব পণ্য মাছ, পোলট্রি ও দুগ্ধশিল্পের পশুখাদ্য তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ ধরনের কাঁচামালবাহী একাধিক ট্রেনও বাংলাদেশে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এসব কাঁচামাল আমদানিতে বিঘ্ন ঘটলে খামার ও সংশ্লিষ্ট শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব ডিম, মাংস, দুধ ও মাছের বাজারদরেও পড়বে।

রেলপথে পরিবহন ব্যয় সড়কের অর্ধেকেরও কম : পণ্য পরিবহনে রেলপথের বড় সুবিধা কম ব্যয়। একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, সড়কপথে প্রতি টন পণ্য এক কিলোমিটার পরিবহনে ব্যয় হয় তিন টাকা ৪ পয়সা। রেলপথে একই পরিমাণ পণ্য পরিবহনে ব্যয় এক টাকা ৪৯ পয়সা। অর্থাৎ রেলপথে পরিবহন ব্যয় সড়কের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।

বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, আন্ত সীমান্ত রেল যোগাযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থলবন্দর ও সমন্বিত চেকপোস্টে সড়কপথের দীর্ঘ অপেক্ষা এড়ানো সম্ভব। এতে জ্বালানি সাশ্রয়ের পাশাপাশি পণ্য পরিবহনের সময় কমবে। একই সঙ্গে সড়কপথের ওপর চাপ ও পরিবহনজনিত কার্বন নিঃসরণ কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।

দুটি রুট চালুর অপেক্ষায় ব্যবসায়ীরা : বর্তমানে বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে ও রহনপুর-সিঙ্গাবাদ রেলপথে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে। এর বাইরে চিলাহাটি-হলদিবাড়ি ও বিরল-রাধিকাপুর রেলপথ দিয়েও পণ্য আমদানিতে আগ্রহী বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। তবে বাংলাদেশ রেলওয়ে এখনো এ দুটি রুটে পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সাল পর্যন্ত রুট দুটি পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলের জন্য কার্যকর ছিল।

এ ছাড়া ঢাকার আশপাশের কয়েকটি স্টেশনকে স্যাটেলাইট ফ্রেইট টার্মিনাল হিসেবে চালু করার প্রস্তাব দিয়েছেন কয়েকজন আমদানিকারক। তাঁদের মতে, এসব টার্মিনাল চালু হলে রাজধানী ও আশপাশের শিল্পাঞ্চলে পণ্য সরবরাহ সহজ হবে।

বাড়তে পারে রেলওয়ের আয় : কভিড-১৯ মহামারির সময় সড়কপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় আন্ত সীমান্ত রেল যোগাযোগের গুরুত্ব আরো স্পষ্ট হয়। সে সময় অনেক স্থল শুল্ককেন্দ্রে পণ্য পরিবহন বাধাগ্রস্ত হলেও পেট্রাপোল-বেনাপোল রেলপথ দিয়ে বাংলাদেশে তরল মেডিক্যাল অক্সিজেন সরবরাহ করা হয়েছিল। ওই সময় খাদ্যশস্য, জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যও রেলপথে এসেছে। তবে ২০২৪ সাল থেকে ট্রেন চলাচল কমতে শুরু করে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যমান সমস্যাগুলো দূর করে দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। এতে বাংলাদেশের জন্য সুফল হতে পারে কম খরচে খাদ্যশস্য, পশুখাদ্যের কাঁচামাল, জ্বালানি ও নির্মাণসামগ্রী আমদানি। একই সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের আয় বাড়ানোর সুযোগও তৈরি হবে।