সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের এক বছরও পার হয়নি। এরই মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা কেন? এই প্রশ্ন তুলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছেন ডেইলি স্টারের সম্পাদক ও প্রকাশক মাহফুজ আনাম। তার মতে, অতীত অভিজ্ঞতা বারবার প্রমাণ করেছে, কেবল একটি প্রকৃত স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব। তবে তার এই অবস্থান ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেক নেটিজেনের প্রশ্ন, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে কি মাহফুজ আনামের এই বক্তব্যের কোনো সম্পর্ক রয়েছে?
আজ শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) ডেইলি স্টারের ছাপা সংস্করণে ‘অনলি অ্যান ইনডিপেনডেন্ট কেয়ারটেকার গভর্নমেন্ট ক্যান ইনশিওর ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশনস’ শিরোনামে প্রকাশিত এক কলামে এসব কথা লিখেছেন মাহফুজ আনাম। এর উপশিরোনাম ‘উইদাউট ক্রেডিবল ইলেকশনস, উই উইল নেভার অ্যাটেইন পলিটিক্যাল স্ট্যাবিলিটি’। কলামটির মূল বক্তব্য, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অপরিহার্য। আর সে জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে শুধু সংবিধানে ফিরিয়ে আনলেই হবে না, এর স্বাধীনতা ও কার্যকর ক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে।
কলামের শুরুতেই প্রবীণ সাংবাদিক মাহফুজ আনাম ব্যাখ্যা করেছেন, সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের এক বছরের মধ্যে পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা অস্বাভাবিক মনে হলেও সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলার কারণে বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তার মতে, দেশের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ ও অবিশ্বাস তৈরি হয়। অন্যদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফল পরাজিত দলগুলো সমালোচনা করলেও শেষ পর্যন্ত তারা সরকার গঠনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং সংসদীয় কার্যক্রমে অংশ নিয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার কৃতিত্ব নিয়ে আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেছেন মাহফুজ আনাম। জামায়াত নিজেদের এই ব্যবস্থার মূল প্রবক্তা বলে দাবি করে। তবে তার বিবরণ অনুযায়ী, ১৯৯৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগ এ দাবিতে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলে। একের পর এক হরতাল, সংসদ বর্জন এবং শেষ পর্যন্ত বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের পদত্যাগের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি হয়। তৎকালীন বিএনপি সরকার বিরোধীদের দাবি উপেক্ষা করে ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজন করে। আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো সেই নির্বাচন বর্জন করে। পরে বিএনপি সরকার সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা চালু করে এবং একই বছরের জুনে নতুন নির্বাচন দেয়। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়।
১৯৯১ সালের নির্বাচনও রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন মাহফুজ আনাম। এরপর ১৯৯৬ সালের জুন, ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়। এসব নির্বাচনে পরাজিত দলগুলো বিভিন্ন অভিযোগ তুললেও ফলাফল মেনে নেয়। তবে এই ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
২০০১ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের আপত্তি এবং বিএনপি সরকারের আমলে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিদের অবসরের বয়স বাড়ানোর বিষয়টিও কলামে তুলে ধরেছেন তিনি। তার ভাষ্য, এর ফলে প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার সম্ভাব্য ব্যক্তি পরিবর্তিত হয়ে বিচারপতি কে এম হাসানের নাম সামনে আসে। আওয়ামী লীগের সন্দেহ ছিল, বিএনপি নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা করার উদ্দেশ্যে এই পরিবর্তন এনেছে। পরবর্তী রাজনৈতিক সংঘাতের একপর্যায়ে জরুরি অবস্থা জারি হয়। পরে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়। ৯০ দিনের পরিবর্তে ওই সরকার দুই বছর দায়িত্ব পালন করে।
মাহফুজ আনামের মতে, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ফেরার পর ২০১১ সালে শেখ হাসিনা সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করেন। এ সিদ্ধান্তের পেছনে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে নিজের কলামে মত দিয়েছেন তিনি। তার বক্তব্য, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল থাকলে আওয়ামী লীগকে পরবর্তী নির্বাচনে পরাজয়ের সম্ভাবনাও মেনে নিতে হতো। তিনি আরও লিখেছেন, সংবিধান সংস্কারবিষয়ক সংসদীয় কমিটির সুপারিশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের প্রস্তাব ছিল না। তার দাবি, শেখ হাসিনার সিদ্ধান্তেই শেষ পর্যন্ত এই ব্যবস্থা বাতিলের পথ তৈরি হয়।
কলামে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে সমালোচনা করে মাহফুজ আনাম লিখেছেন, ভোটাধিকার থেকে মানুষকে বঞ্চিত করার ক্ষোভ উন্নয়ন প্রকল্প দিয়ে দূর করা সম্ভব—শেখ হাসিনা এমন ধারণা করেছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান সেই ধারণার ভুল প্রমাণ করেছে বলে তিনি মনে করেন। তার ব্যাখ্যায়, ওই তিন নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন এবং ভোটাধিকার বঞ্চিত হওয়ার অভিজ্ঞতা শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পেছনের গুরুত্বপূর্ণ কারণগুলোর মধ্যে ছিল।
এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রসঙ্গে বিএনপির অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মাহফুজ আনাম। তার মতে, জুলাই জাতীয় সনদে বিএনপি এই ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে। কিন্তু কেবল রাজনৈতিক সম্মতি যথেষ্ট নয়। নতুন ব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার কতটা নিরপেক্ষ, ক্ষমতাসম্পন্ন এবং কাঠামোগতভাবে স্বাধীন হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষমতাসীন দলকে এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় সম্মত হতে হবে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে না। এমনকি পরবর্তী নির্বাচনে পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনাও তাদের মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে।
কলামের শেষাংশে জুলাই জাতীয় সনদের ১৬ নম্বর দফার উল্লেখ করেছেন মাহফুজ আনাম। সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ২১টি উপদফায় বিভিন্ন পরিস্থিতি মোকাবিলার পদ্ধতি তুলে ধরা হয়েছে। তার মতে, যেসব দল এ বিষয়ে ভিন্নমত জানিয়েছে, নির্বাচনে তাদের ইশতেহার জনগণের সমর্থন পেলে সেই অনুযায়ী পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছে। ফলে এখন ক্ষমতাসীন বিএনপির সামনে বড় পরীক্ষা হলো, নিজেদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি স্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় তারা কতটা আন্তরিক।
তবে মাহফুজ আনামের কলাম প্রকাশের দিন ও শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষিত সময় কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিন্ন মাত্রার আলোচনা দেখা যাচ্ছে। অনেক নেটিজেন বিষয় দুটিকে পাশাপাশি রেখে প্রশ্ন তুলছেন, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগে কি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার দাবি সামনে আনা হলো? তাদের আলোচনায় শেখ হাসিনার ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ঘোষণাটি গুরুত্ব পাচ্ছে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে গত ২২ সেপ্টেম্বর দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার অঙ্গীকারের কথা জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, কীভাবে দেশে ফিরবেন, সেই পরিকল্পনার বিস্তারিত পরে ঠিক করবেন। এর আগে ২ সেপ্টেম্বর ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বিএনপি সরকারের প্রতি আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের আহ্বান জানান। তার বক্তব্য ছিল, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিয়ে জনগণকে নিজেদের প্রতিনিধি বেছে নেওয়ার অধিকার দিতে হবে। ১৫ অক্টোবর প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারেও তিনি দেশে ফেরার বিষয়টি এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
এসব বক্তব্যের কারণে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা ও পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে ডিসেম্বরের মধ্যে তার দেশে ফেরার ঘোষণার পর রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচনসংক্রান্ত বক্তব্যগুলোও আলোচনায় আসছে। ফলে মাহফুজ আনামের কলাম প্রকাশের সময়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাংশের মধ্যে দুই ঘটনার যোগসূত্র খোঁজার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
তবে মাহফুজ আনামের কলামের বক্তব্যে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার প্রসঙ্গ নেই। তিনি কেন এখনই পরবর্তী নির্বাচন নিয়ে আলোচনা প্রয়োজন, তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চলমান প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। তার আলোচনার মূল বিষয় দেশের নির্বাচনী ইতিহাস, রাজনৈতিক দলগুলোর অতীত ভূমিকা এবং ভবিষ্যতে একটি স্বাধীন নির্বাচনকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার কাঠামো। শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে নিজের অবস্থানের কোনো সম্পর্কের কথাও তিনি কলামে উল্লেখ করেননি।
মাহফুজ আনামের মতে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সফল করতে হলে ক্ষমতাসীন দলকে রাজনৈতিকভাবে পরিপক্বতার পরিচয় দিতে হবে। পরবর্তী নির্বাচনে নিজেদের পরাজিত হওয়ার সম্ভাবনাও মেনে নেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। তিনি মনে করেন, এমন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা গেলে সরকারগুলো দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জনগণের কাছে বেশি জবাবদিহির মধ্যে থাকবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্য এটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
কলামের উপসংহারে মাহফুজ আনাম লিখেছেন, স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করার নিশ্চয়তা নেই। এটি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির অপরিপক্বতার পরিচয় দেয়। তার মতে, ১৯৯১ সালের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার এমন একটি কাঠামো তৈরি করতে হবে, যা কোনো ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবমুক্ত থাকবে। এর মধ্য দিয়েই জনগণের আস্থা অর্জন এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
সুতরাং, শেখ হাসিনার ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা এবং মাহফুজ আনামের ৩০ অক্টোবরের কলাম—দুটি বিষয় একই সময়ে আলোচনায় এলেও কলামের যুক্তি ও ব্যাখ্যা মূলত দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারকে কেন্দ্র করে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেটিজেনদের একাংশের আলোচনায় যে যোগসূত্র তৈরি হয়েছে, সেটি তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ; মাহফুজ আনামের লেখায় এমন কোনো যোগসূত্রের উল্লেখ নেই।