উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে রাজধানী ঢাকায় ছুটে আসছে মানুষ। কেউ আসছেন চাকরির সন্ধানে, কেউ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে, কেউ উচ্চশিক্ষা কিংবা উন্নত চিকিৎসার আশায়। জীবিকার তাগিদে ঢাকামুখী মানুষের এই স্রোত প্রতিনিয়ত বড় করছে রাজধানীর জনসংখ্যা। অথচ সেই অনুপাতে বাড়ছে না সড়ক, গণপরিবহন, আবাসন, পয়োনিষ্কাশন কিংবা নাগরিক সুবিধা। ফলে সীমিত জায়গায় বিপুলসংখ্যক মানুষের বসবাস ও চলাচলে ঢাকা পরিণত হয়েছে এক দুর্বিষহ নগরীতে। এ পরিস্থিতিতে আজ পালিত হচ্ছে বিশ্ব নগর দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘নগর পুনরুজ্জীবন : সবার জন্য পর্যাপ্ত আবাসন’।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকার দুই সিটির ৩০৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ লোকের বাস। যে হিসাবে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ মানুষের বসবাস। আরেক জরিপ বলছে, বৃহত্তর ঢাকা এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ মানুষ যাতায়াত করেন। বিশ্বের বাসযোগ্য শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই হতাশাজনক। ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের ২০২৬ সালের গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স অনুযায়ী, ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম।
দেশের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র রাজধানী। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয়, ব্যাংক, বিমা, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের করপোরেট অফিস, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার বড় অংশ ঢাকায় কেন্দ্রীভূত। ফলে দেশের অন্য শহরগুলোতে কর্মসংস্থান ও নাগরিক সুবিধার পর্যাপ্ত বিকল্প তৈরি না হওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়েই ঢাকামুখী হচ্ছে। প্রতিদিন কর্মজীবী মানুষের যাতায়াতে অচল হয়ে পড়ছে সড়ক। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, জলাবদ্ধতা, ফুটপাত দখল, আবাসন সংকট এবং জীবনযাত্রার ব্যয়-সব মিলিয়ে নগরবাসীর জীবনমান ক্রমেই নিম্নমুখী হচ্ছে।
এ ব্যাপারে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক এবং নগর পরিকল্পনাবিদ ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে হলে কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। দেশের অধিকাংশ বড় প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় ঢাকায়। সরকারি দপ্তর, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের বড় অংশ রাজধানীকেন্দ্রিক। এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও। চাকরি, ব্যবসা কিংবা উচ্চতর পেশাগত সুযোগের জন্য মানুষকে রাজধানীতে আসতে হয়। ঢাকার বাইরে পর্যাপ্ত মানসম্মত চাকরি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে মানুষের এই নির্ভরতা কমানো সম্ভব হতো। তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার ফুটপাত-রাস্তায় হকার নিত্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকার বাইরে কাজের সুযোগ না থাকায় আয়ের আশায় ঢাকার রাস্তা-ফুটপাতে বসছে। তাদের শুধু উচ্ছেদ করলে হবে না, পুনর্বাসনেও জোর দিতে হবে। নয়তো এ সমস্যার সমাধান হবে না।’
আয়তনের তুলনায় জনসংখ্যার চাপ বহুগুণ : বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ। এর মধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ৫৯ লাখ ৭৯ হাজার ৫৩৭ এবং দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে ৪২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৫ জন মানুষ বসবাস করেন। দুই সিটি করপোরেশনের আয়তন প্রায় ৩০৬ বর্গকিলোমিটার। সে হিসাবে প্রতি বর্গকিলোমিটারে গড়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৫০০ মানুষের বসবাস।
জনসংখ্যার এই চাপের বিপরীতে নগর পরিকল্পনা, সড়ক, গণপরিবহন, খেলার মাঠ, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানের ঘাটতি প্রকট। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপের তথ্য উদ্ধৃত করে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঢাকার মাত্র ০.৯ শতাংশ উন্মুক্ত স্থান রয়েছে। অথচ নগরবাসীর সুস্থ জীবনযাপনের জন্য পর্যাপ্ত পার্ক, খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত জায়গা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিদিন ৩ কোটি ৮৭ লাখ মানুষের যাতায়াত : ঢাকার জন্য প্রণীত হালনাগাদ কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা এবং ২০২৩ সালের হাউসহোল্ড ইন্টারভিউ সার্ভের তথ্য অনুযায়ী, বৃহত্তর ঢাকা এলাকায় প্রতিদিন প্রায় ৩ কোটি ৮৭ লাখ যাতায়াত করেন। রাজধানীর যানজট এখন নগরবাসীর জীবনের অন্যতম বড় অভিশাপ। কর্মস্থলে পৌঁছাতে কিংবা বাসায় ফিরতে প্রতিদিন কয়েক ঘণ্টা রাস্তায় কাটাতে হচ্ছে মানুষকে। এতে শুধু ব্যক্তিগত সময় নষ্ট হচ্ছে না, উৎপাদনশীলতা কমছে, বাড়ছে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ এবং অর্থনৈতিক ক্ষতি।
ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় দেখা যায়, যানজটের কারণে বছরে প্রায় ১১ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে এবং প্রতিদিন প্রায় ৫০ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে।
ফুটপাত দখল, পথচারীর ভোগান্তি : ঢাকার ফুটপাত এখনো অনেক জায়গায় পথচারীদের জন্য নয়, হকারদের ব্যবসার জায়গা হয়ে উঠেছে। মতিঝিল, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মিরপুর, মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের বড় অংশ দখল করে বসানো হয়েছে দোকানপাট। কোথাও ফুটপাত ছাড়িয়ে সড়কের একাংশেও বসছে অস্থায়ী বাজার। ফলে পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল সড়কে নেমে চলাচল করতে হচ্ছে। এতে যানজটের পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ছে।
এখানে নগর ব্যবস্থাপনার একটি বড় দুর্বলতা স্পষ্ট। একদিকে হকারদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, অন্যদিকে তাঁদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান বা নির্ধারিত ব্যবসার জায়গা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে উচ্ছেদের পর আবারও ফুটপাত দখল হচ্ছে। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে হলে শুধু উচ্ছেদ নয়, হকারদের পুনর্বাসন ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রয়োজন।
দূষণের শহর ঢাকা, স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নগরবাসী : ঢাকার জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে যানবাহন, নির্মাণকাজ, শিল্পকারখানা ও বর্জ্যরে চাপ। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর। বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ, অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং জলাবদ্ধতা নগরবাসীর স্বাভাবিক জীবনযাপনকে কঠিন করে তুলেছে। ২০২৬ সালের মার্চে প্রকাশিত আইকিউএয়ারের ওয়ার্ল্ড এয়ার কোয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৫ অনুযায়ী, রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে বায়ুদূষণে ঢাকা ছিল বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে।
আবাসন সংকট, বাড়ছে বসবাসের ব্যয় : রাজধানীতে মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সে অনুযায়ী পরিকল্পিত ও সাশ্রয়ী আবাসনের ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হচ্ছে বাসাভাড়ায়। বস্তি ও নিম্নমানের আবাসনে অনেক পরিবারের সদস্যদের একাধিক মানুষকে একই কক্ষে থাকতে হয়। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস, বিশুদ্ধ পানি, স্বাস্থ্যসম্মত শৌচাগার ও নিরাপদ পরিবেশের অভাব রয়েছে অনেক জায়গায়।