১০ বছর বয়সে কোলেস্টেরল পরীক্ষা করালে হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের শনাক্ত করা যেতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. অশোক শেঠ। ফোর্টিস এসকর্টস হার্ট ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান শেঠ বৃহস্পতিবার ইন্ডিয়া টুডে হেলথ ওয়েলথ সামিটে এ কথা বলেন।
বিমারিয়োঁ কা বাপ মোটাপা শীর্ষক অধিবেশনে তিনি শিশুদের কোলেস্টেরল স্ক্রিনিংয়ের সুপারিশ করেন। একই সঙ্গে হৃদস্বাস্থ্য মূল্যায়নে ইকোকার্ডিওগ্রামের ভূমিকার ওপরও জোর দেন। শেঠ বলেন, অনেক তরুণ আকস্মিকভাবে মারা যান, পরে দেখা যায় শৈশব থেকেই তাদের হৃদরোগ ছিল, যা শনাক্ত হয়নি। অধিবেশনে সহ-আলোচক ফোর্টিস সি-ডকের নির্বাহী চেয়ারম্যান ও পরিচালক ডা. অনুপ মিশ্র এ বক্তব্যে সম্মতি জানান।
হৃদরোগ আর শুধু বয়স্কদের নয়
অশোক শেঠ সতর্ক করে বলেন, হৃদরোগ আর কেবল প্রবীণদের সমস্যা নয়। ভারতে তরুণদের হার্ট অ্যাটাক নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। তিনি বলেন, দেশটিতে হার্ট অ্যাটাকের প্রায় ৫০ শতাংশ ঘটে ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে।
আলোচনায় গত ১৫ বছরে হৃদরোগ প্রায় ২০০ শতাংশ বাড়ার কথাও উঠে আসে। জনগোষ্ঠী ও পরিমাপ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে বৃদ্ধির সঠিক হার ভিন্ন হতে পারে। তবে এ ধরনের পরিসংখ্যান জীবনযাত্রার পরিবর্তন, স্থূলতা ও অন্যান্য হৃদরোগ ঝুঁকির কারণ খতিয়ে দেখার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
হৃদরোগ কয়েক বছর ধরে গড়ে উঠতে পারে, প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায়ই কোনও স্পষ্ট উপসর্গ থাকে না। তাই গুরুতর জটিলতা তৈরির আগেই উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণ শনাক্ত করা জরুরি।
লুকানো চর্বিতে ঝুঁকি বাড়ে
অনুপ মিশ্র বলেন, বাড়তি চর্বি শুধু সৌন্দর্যের সমস্যা নয়। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চারপাশে চর্বি জমলে তা বিপাকজনিত সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং বেশ কয়েকটি দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তিনি অদৃশ্য চর্বির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, যা কারও চেহারা বা মোট ওজন দেখে বোঝা নাও যেতে পারে। অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চারপাশের ভিসেরাল ফ্যাটের সঙ্গে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এবং বিপাকজনিত রোগের উচ্চ ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। ক্লিনিক্যাল মূল্যায়নে এমন ঝুঁকি শনাক্ত করা যায়, যা কাউকে দেখে বোঝা না-ও যেতে পারে।
ঝুঁকি শনাক্তে আগেভাগে স্ক্রিনিংয়ে
শিশু ও তরুণদের হৃদরোগ শনাক্তের গুরুত্ব আলোচনায় উঠে আসে। আকস্মিকভাবে হৃদরোগজনিত কারণে মারা যাওয়া কিছু তরুণের ক্ষেত্রে পরে এমন হৃদরোগ ধরা পড়ে, যা আগে শনাক্ত হয়নি।
পারিবারিক ইতিহাস, অকারণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, ব্যায়ামের সময় বুকে ব্যথা এবং নিকটাত্মীয়দের আকস্মিক হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ইতিহাস গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত হতে পারে, যেগুলোর ক্ষেত্রে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
চিকিৎসকেরা কিছু হৃদ্ঝুঁকি মূল্যায়নের উপায় হিসেবে কোলেস্টেরল পরীক্ষা ও ইকোকার্ডিওগ্রাফির কথা বলেন। তবে প্রতিটি শিশুর জন্য এসব পরীক্ষা আবশ্যক নয়। কোলেস্টেরল স্ক্রিনিং নির্ভর করে বয়স, পারিবারিক ইতিহাস ও অন্যান্য ঝুঁকির কারণের ওপর। আর উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষার ফল বা পারিবারিক ইতিহাসে হৃদ্রোগের সম্ভাবনার ইঙ্গিত থাকলে সাধারণত ইকোকার্ডিওগ্রাম করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
আগেভাগে মূল্যায়ন করলে বংশগত কোলেস্টেরলজনিত সমস্যা ও হৃদযন্ত্রের কাঠামোগত সমস্যা শনাক্ত করা যায়। এতে চিকিৎসকেরা উপযুক্ত পর্যবেক্ষণ বা চিকিৎসার পরামর্শ দিতে পারেন।
শুধু ওজন প্রশিক্ষণ হৃদস্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট নয়
চিকিৎসকেরা জোর দিয়ে বলেন, ব্যায়ামের রুটিন শুধু পেশি গড়ার দিকে মনোযোগ না দিয়ে সামগ্রিক হৃদ্স্বাস্থ্যের সক্ষমতা বাড়ানোর দিকে হওয়া উচিত। ওজন প্রশিক্ষণ শক্তি বাড়াতে ও পেশি ধরে রাখতে সাহায্য করে, তবে আদর্শভাবে তা অ্যারোবিক কার্যকলাপের সঙ্গে মিলিয়ে করতে হবে।
দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটাসহ হৃদ্স্পন্দন বাড়ায় এমন কাজ হৃদ্স্বাস্থ্যের সক্ষমতা বাড়াতে পারে। প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার অ্যারোবিক কার্যকলাপের পাশাপাশি সপ্তাহে দুই বা তার বেশি দিন পেশি শক্তিশালী করার ব্যায়ামের পরামর্শ দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্যকর সকালের নাশতায় প্রোটিন, আঁশ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পুষ্টি থাকতে পারে। ব্যক্তিগত প্রয়োজন অনুযায়ী পূর্ণ শস্য, ডাল, ফল, বাদাম ও দুগ্ধজাত খাবার এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অধিবেশনের মূল বার্তা ছিল, স্থূলতাজনিত জটিলতা ঠেকাতে শুধু ওজন কমানোই যথেষ্ট নয়। লুকানো চর্বি শনাক্ত, পেশি গঠন, শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং প্রাসঙ্গিক ঝুঁকির কারণ নির্ণয়ে স্ক্রিনিং এসবের মাধ্যমে মানুষ দীর্ঘমেয়াদে নিজের হৃদ্স্বাস্থ্য রক্ষা করতে পারে।
সূত্র: এনডিটিভি