খুলনায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড এবং প্রতিনয়িত গুলিবর্ষণ পুরো জনপদকে অপরাধের অভয়ারণ্যে পরিণত করেছে। এ নগরীতে যেন সবসময় আতঙ্ক বিরাজ করছে। কখনো প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, কখনো ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন বা জখম, আবার কখনো গুলিবর্ষণের চিত্র উঠে আসছে।
মঙ্গলবারও খুলনায় এক যুবককে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনতাই করা হয়েছে। গত শনিবার খুলনা নগরীর সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। একই দিন সকালে যুবদল নেতাকে, সন্ধ্যায় দোকানিকে গুলি করা হয়। খুলনাজুড়ে যেন আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ৭১ জন খুন হয়েছেন। নগর গোয়েন্দা পুলিশের অনুমান, নগরে এখনো অন্তত ৩০০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে।
খুলনায় যুবককে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনতাই :
নগরের নিরালা আবাসিক এলাকার ১৭ নম্বর সড়কে সালমান (২৩) নামের এক যুবককে গুলি করে টাকার ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়েছে দুর্বৃত্তরা। মঙ্গলবার বেলা ১১টা ১০ মিনিটের দিকে একটি কোম্পানির কার্যালয়ের সামনে এ ঘটনা ঘটে। আহত সালমানকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সালমান নগরের ১৬ নম্বর সড়কের বাসিন্দা জাহাঙ্গীরের ছেলে। তিনি ক্যামেল সিগারেট কোম্পানির কর্মচারী।
খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. লোকমান হোসেন রিপন বলেন, কী কারণে সালমানকে গুলি করা হয়েছে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
খুলনার সন্ধানী ক্লিনিকে ব্যাপক ভাঙচুর, ফাঁকা গুলি :
নগরীর সন্ধানী ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক কমপ্লেক্সে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করেছে দুর্বৃত্তরা। গত শনিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর কমার্স কলেজের বিপরীতে ক্লিনিকের নিজস্ব ভবনে এ ঘটনা ঘটে। এ সময় আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য ক্লিনিকের বাইরে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে হামলাকারীরা। ঘটনায় ক্লিনিকের এক কর্মকর্তা আহত হয়েছেন। ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এক কর্মীর মোবাইল ফোন।
সকালে যুবদল নেতাকে, সন্ধ্যায় দোকানিকে গুলি :
গত শনিবার সকালে যুবদল নেতাকে, সন্ধ্যায় দোকানের ভেতরে ঢুকে এক মুদি দোকানদারকে গুলি করার ঘটনার ঘটেছে।
গত শনিবার সন্ধ্যায় নগরের দক্ষিণ টুটপাড়া গাছতলা এলাকায় ধনঞ্জয় কুণ্ডু ওরফে আকাশ কুণ্ডু (৪৫) নামের এক মুদি দোকানিকে গুলি করেছে দুর্বৃত্তরা। নিজের দোকানে বসে থাকা অবস্থায় তিনি গুলিবিদ্ধ হন। এর আগে সকালে খুলনার তেরখাদা উপজেলায় দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে রামিম বিশ্বাস (৩২) নামের যুবদলের এক নেতা আহত হন।
এর আগে সকালে তেরখাদা উপজেলার পারহাজীগ্রামে দুর্বৃত্তদের ছোড়া গুলিতে রামিম বিশ্বাস নামে যুবদলের এক নেতা আহত হন। তাকে খুলনা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। রামিম বিশ্বাস তেরখাদা উপজেলার ৬ নম্বর মধুপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি।
১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ৭১ খুন :
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় ৭১ জন খুন হয়েছেন। এর মধ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে ২৩ জনকে। অন্যদের কুপিয়ে বা পিটিয়ে খুন করা হয়েছে। ৭১ খুনের ঘটনায় গত প্রায় ১০ মাসে খুলনা মহানগর ও জেলায় মামলা হয়েছে ৬৯টি। এর কারণ একটি ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ, ছিনতাই, পূর্বশত্রুতা এবং সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর বিরোধ কাজ করেছে।
৬৯ হত্যা মামলা :
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে খুলনায় মোট ৬৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতি চার দিনে একটি করে হত্যা মামলা হয়েছে।
খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় ১০ মাসে নগর এলাকায় ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৩৬ জন। এর আগে ২০২১ সালে ১৫টি, ২০২২ সালে ১৯টি, ২০২৩ সালে ১৭টি, ২০২৪ সালে ২৯টি এবং ২০২৫ সালে ৩৪টি হত্যা মামলা হয়েছিল।
জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকাতেও হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা উদ্বেগজনক। জেলা পুলিশের হিসাবে, ২০২১ সালে ৩০টি, ২০২২ সালে ২২টি, ২০২৩ সালে ২১টি, ২০২৪ সালে ৩১টি এবং ২০২৫ সালে ৪৯টি হত্যা মামলা হয়েছিল। চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৩৫টি হত্যা মামলা হয়েছে।
অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে :
খুলনার অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। কেএমপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত নগরে ৩৪টি হত্যা মামলার মধ্যে ১৪টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে গুলি করে। এসব হত্যাকাণ্ডে মাদকের কারবার ও আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধের বিষয়টি উঠে এসেছে। জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় ৩৫টি হত্যা মামলার মধ্যে ৯টি হত্যাকাণ্ডে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের তথ্য রয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে কেএমপি এলাকায় ২৪টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। ২০২৫ সালে উদ্ধার হয়েছে ৪৭টি। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উদ্ধার করা হয়েছে ৫০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২৩৩টি গুলি। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে ৩০টি বিদেশি পিস্তল ও ৭টি বিদেশি রিভলবার রয়েছে। এসব ঘটনায় অস্ত্র আইনে ৪৩টি মামলা হয়েছে, গ্রেপ্তার হয়েছেন ৭৫ জন।
নগর গোয়েন্দা পুলিশের অনুমান, নগরে এখনো অন্তত ৩০০টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। জেলা পুলিশও গত জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২৬টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৫৩টি গুলি উদ্ধার করেছে।
পুলিশের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গুলির বিভিন্ন ঘটনার পেছনে একক কোনো কারণ নেই। কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ কাজ করেছে, কোথাও চাঁদাবাজি, কোথাও ছিনতাই, কোথাও মাদক ব্যবসা নিয়ে বিরোধ ছিল।
খুলনা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপকমিশনার মোহাম্মদ আহাদুজ্জামান মিয়া বলেন, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ডের পেছনে মাদক-সম্পর্কিত বিরোধ রয়েছে। পুলিশ তালিকাভুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তাদের কেউ কেউ জামিনে বেরিয়ে আবার বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সাধারণ মানুষও অপরাধীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান না। এটিও বড় সমস্যা।