বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকার ঋণ।
নতুন পে-স্কেল বা বেতন কাঠামো অনুযায়ী ১ নভেম্বর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দেবে সরকার। ওইদিন অক্টোবরের বেতনের সঙ্গে আগের তিন মাসের জন্য নতুন বেতনের বকেয়াও পরিশোধ করা হবে। বাড়তি এ ব্যয় সংস্থানে সরকার চলতি মাসে ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া বাড়িয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক আজ ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিলের নিলাম ডেকেছে। এ নিলামের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়া হবে।
দেশের ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নেয়ার জন্য সরকার সাধারণত ৯১ দিন, ১৮২ দিন ও ৩৬৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ইস্যু করে। রাজস্ব আয় ও দৈনন্দিন বা মাসিক ব্যয়ে সাময়িক ঘাটতি তৈরি হলে অল্প সময়ের জন্য ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিল ছাড়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে এ ধরনের বিশেষ বিল ইস্যুর প্রয়োজন হয়নি। হঠাৎ বিশেষ বিল ইস্যুর কারণ জানতে চাইলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ডেট ম্যানেজমেন্ট বিভাগের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোববার তথা ১ নভেম্বর সরকার নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ করবে। এজন্য বাড়তি টাকার প্রয়োজন। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ১৪ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের নিলাম আহ্বান করা হয়েছে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গতকাল পর্যন্ত চলতি অক্টোবরে সরকার ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে ৫৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আজ আরো ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ নিলে এ মাসে নেয়া ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ৬০ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। দায়িত্ব নেয়ার পর এক মাসে সরকারকে এত পরিমাণ ঋণ নিতে দেখা যায়নি। এর আগে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে বিল-বন্ডের মাধ্যমে ব্যাংক খাত থেকে ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ তুলেছিল সরকার। আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে নেয়া ঋণের পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৫০ ও সাড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকা।
তবে ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলামের মাধ্যমে নেয়া এ ঋণের হিসাব নিট নয়। নতুন নেয়া ঋণের বড় অংশ মেয়াদ পূর্ণ হওয়া আগের বিল-বন্ড পরিশোধ বা রি-ইস্যুতে ব্যয় হয়। এ কারণে ট্রেজারি বিল-বন্ডের নিলামে উত্তোলিত ঋণের তুলনায় নিট ঋণের স্থিতি অনেক কম হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া নিট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৪ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে নেয়া হয়েছে ২৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকার ঋণ। বাকি ১ হাজার ১৭ কোটি টাকা জোগান দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অক্টোবরে নেয়া নতুন ঋণের হিসাব জানা গেলেও কত টাকার ঋণ এ মাসে পরিশোধ করা হয়েছে, সেটি সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা গতকাল জানাতে পারেননি।
এদিকে সরকারের ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় চলতি অক্টোবরে ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদহারও বেড়েছে। মাসের শুরুতে ৫ অক্টোবরের নিলামে ৯১ দিন মেয়াদি ট্রেজারি বিলের ইল্ড ছিল ৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। কিন্তু ধারাবাহিকভাবে বেড়ে ২৬ অক্টোবরের নিলামে একই বিলের ইল্ড ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশে উঠে যায়। একইভাবে বাকি সব মেয়াদের বিল ও বন্ডের ইল্ড রেটও বেড়েছে। বিল-বন্ডের ইল্ড এমন সময়ে বাড়ছে, যখন দেশের ব্যাংকগুলোয় ইতিহাসে সর্বোচ্চ পরিমাণ অতিরিক্ত তারল্য সৃষ্টি হয়েছে। আগস্ট শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ ছিল ৪ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। বিপুল এ তারল্যের একটি অংশ অলস পড়ে আছে।
সরকারের ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় বিশেষ নিলাম আয়োজনের পাশাপাশি বাড়তি বিল-বন্ড ইস্যু করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব হলো চাহিদা অনুযায়ী ট্রেজারি বিল-বন্ডের মাধ্যমে সরকারকে ঋণের জোগান দেয়া। আমরা কেবল সে দায়িত্ব পালন করছি। প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকার রাজস্ব আয় করতে পারছে না। তাই ব্যাংক খাত থেকে বাড়তি ঋণের প্রয়োজন হচ্ছে।’
আরিফ হোসেন খান আরো বলেন, ‘প্রচলিত বিল-বন্ডের পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ব্যাংক শরিয়াহভিত্তিক সুকুক ছাড়ার বড় উদ্যোগ নিচ্ছে। কেবল চলতি অর্থবছরে ৩২ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সুকুকের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদে ঋণের জোগান হলে ব্যাংক খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা কিছুটা হলেও কমবে।’
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘোষণা করেছে সরকার। এর মধ্যে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি ধরা হয়েছে। এ অর্থ দেশী-বিদেশী উৎস থেকে ঋণ নিয়ে জোগান দেয়ার কথা। এর মধ্যে দেশের ব্যাংক খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকার ঋণ নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। গত অর্থবছরে ব্যাংক খাত থেকে রেকর্ড ১ লাখ ৩৪ হাজার ৫৭১ কোটি টাকার ঋণ নিয়েছিল সরকার। যদিও সংশোধিত বাজেটে সে লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর কারণে এবার সরকারকে আরো বেশি ব্যাংক ঋণনির্ভর হতে হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।
ঘোষিত বাজেটে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। যদিও অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই (জুলাই ও আগস্ট) ২৫ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা ঘাটতি দেখা গেছে। সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরেও প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি এনবিআর। এ কারণে দৈনন্দিন ব্যয়ের জন্য সরকার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, চলতি অক্টোবরে (২৭ অক্টোবর পর্যন্ত) ৯১ দিন মেয়াদি বিলের চারটি নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। এসব নিলামের ফেস ভ্যালু বা অভিহিত মূল্য ছিল ২০ হাজার কোটি টাকা। সমসংখ্যক নিলামের মাধ্যমে ১৮২ দিন মেয়াদি বিলে ১২ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। আর ৩৬৪ দিন মেয়াদি বিলের নিলাম হয়েছে আরো ৮ হাজার কোটি টাকার। সব মিলিয়ে অক্টোবরে কেবল বিলের মাধ্যমে ৪০ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন করা হয়েছে।
আর ২ থেকে ২০ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের মাধ্যমে অক্টোবরে সরকার ঋণ নিয়েছে ১৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। গতকালও বাজার থেকে ১৫ ও ২০ বছর মেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেয় সরকার। এ দুটি বন্ডের ইল্ড ছিল ৯ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের প্রয়োজনে ১৪ দিন মেয়াদি বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যুকে ‘দেশের অর্থনীতি ও সরকারের সক্ষমতার জন্য ভালো খবর নয়’ বলে মনে করেন সাবেক অর্থ সচিব এবং মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) মোহাম্মদ মুসলিম চৌধুরী। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সাধারণত বাজারে তারল্য উদ্বৃত্ত হয়ে গেলে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ১৪ দিন মেয়াদি বিল ইস্যু করে। এখন দেখছি, সরকার তার কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্যও বিশেষ ট্রেজারি বিল ইস্যু করছে। সরকার তার রাজস্ব আহরণ বাড়াতে পারছে না। বিপরীতে নতুন পে-স্কেলসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। আবার বড় বড় মেগা প্রকল্পও নেয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের ঋণের বোঝা দ্রুত বড় হবে। বিপরীতে বেসরকারি খাত আরো বেশি সংকুচিত ও দুর্বল হবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) ব্যাংক খাত থেকে সরকারের নেয়া ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল সাড়ে ৩৪ শতাংশেরও বেশি। যদিও একই সময়ে দেশের বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। বেসরকারি খাতে বিরাজমান ঋণ খরা আরো তীব্র হচ্ছে। বিপরীতে ক্রমাগত বাড়ছে সরকারের ঋণ নেয়ার প্রবণতা। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী তিন বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে সরকারের মোট ঋণ স্থিতি প্রায় ৩৪ লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াবে।
সরকার এরই মধ্যে দেশী-বিদেশী উভয় উৎস থেকে ঋণ নিয়ে ঋণ শোধের চক্রে পড়েছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন। বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক এ প্রধান অর্থনীতিবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সরকার প্রত্যাশা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় বাড়াতে পারছেন না। এ কারণে বাজেটে ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি মাত্রায় ঋণ নিতে হচ্ছে। যেসব ট্রেজারি বিল-বন্ডের মেয়াদ শেষ হচ্ছে, সরকার সেগুলো “রোলওভার” করতে বাধ্য হবে। কারণ এসব ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এ মুহূর্তে সরকারের নেই।’
বর্তমানে দেশে বেসামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ। এছাড়া পেনশনভোগী রয়েছেন ৯ লাখ ২৫ হাজার। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন, ভাতা ও পেনশনের জন্য ১ লাখ ৩১ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে সরকার। এর মধ্যে শুধু বেতনের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৬ হাজার ২৯২ কোটি টাকা। এ পরিস্থিতিতে আগামী রোববার থেকে নতুন পে-স্কেল অনুযায়ী বেতন পরিশোধ করবে সরকার। নতুন কাঠামোয় সবচেয়ে নিচের গ্রেডে মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০ হাজার টাকা হয়েছে। আর সর্বোচ্চ নির্ধারিত মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বেতন ও ভাতার পুরো কাঠামো ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত হবে। নবম বেতনকাঠামো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হলে সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা বাড়বে।
অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে বর্তমান সরকার বিদেশী বিনিয়োগ ও স্বল্প সুদের অর্থায়ন নিশ্চিতে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন অর্থ মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মুশফিকুর রহমান। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনের এ সংসদ সদস্য বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিএনপি সরকার উত্তরাধিকার সূত্রে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে। আগে থেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও বেকারত্বের পরিস্থিতি প্রকট ছিল। সরকারের আয়ের চেয়ে ব্যয়ও অনেক বেশি। এ পরিস্থিতিতে যেকোনো সরকারের পক্ষেই রাতারাতি ঘুরে দাঁড়ানো অসম্ভব। আমাদের সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করছে।’
মুশফিকুর রহমান আরো বলেন, ‘জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে নির্ধারিত আয়ের চাকরিজীবীদের জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়েছিল। এ কারণে সরকার কর্মচারীদের উৎসাহ দেয়া ও দক্ষতা বাড়াতে নতুন পে-স্কেল দিয়েছে। এর কোনো বিকল্প আমাদের হাতে ছিল না। তবে এটাও ঠিক, ব্যয় বৃদ্ধির চাপ সামাল দিতে আমাদেরকে অবশ্যই আয় বাড়াতে হবে।’