রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে বুড়িগঙ্গার ঐতিহাসিক স্রোতধারা, পুরান ঢাকার শতবর্ষী স্থাপত্য, পৃথিবীর দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সাগরকন্যা কুয়াকাটা কিংবা জীববৈচিত্র্যে অনন্য সুন্দরবনের রহস্যঘেরা ম্যানগ্রোভ বন– প্রকৃতি ও ঐতিহ্যের এমন বর্ণাঢ্য সমাহার দক্ষিণ এশিয়ায় সত্যিই বিরল। অথচ চোখজুড়ানো প্রাকৃতিক প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে বাংলাদেশ আজ এক উপেক্ষিত নাম।
ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক দূরত্ব খুব বেশি না হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ থাইল্যান্ড যেখানে বছরে তিন কোটির বেশি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করে হাজার কোটি ডলারের অর্থনীতি গড়ে তুলেছে, সেখানে বাংলাদেশ কেবল ফাইলবন্দি নীতি আর কাঠামোগত অব্যবস্থাপনার চক্রে স্থবির হয়ে আছে। প্রকৃতি দুহাত ভরে দিলেও পর্যটন খাতকে বিশ্বমানের করে তোলার ক্ষেত্রে পদে পদে হোঁচট খাচ্ছে দেশ।
সর্বশেষ ২০২৫ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এ বছর বাংলাদেশে বিদেশি দর্শনার্থী এসেছিলেন মাত্র ৫ লাখ ৮৫ হাজারের মতো, যার অতিক্ষুদ্র অংশই প্রকৃত অবকাশযাপনকারী পর্যটক। পর্যটক আগমন ও আয়ের এই আকাশ-পাতাল ব্যবধান কেবল সাধারণ সংখ্যার ফারাক নয়; পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় নীতি, কাঠামোগত দুর্বলতা, অবকাঠামোর ঘাটতি, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিংয়ের অভাব এবং সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিকল্পনাহীনতারই এক নির্মম দর্পণ।
পরিসংখ্যানে নির্মম ফারাক
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের (বিটিবি) তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে মোট বিদেশি দর্শনার্থী এসেছিলেন ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন। এর আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪ এবং ২০২৩ সালে ছিল ৬ লাখ ৫৫ হাজার ৪৫১ জন। অর্থাৎ ধারাবাহিক এই পরিসংখ্যান বলছে, বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বিদেশি পর্যটক বা দর্শনার্থী আগমন উল্টো ৭ দশমিক ৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এই পরিসংখ্যানের গভীরে প্রবেশ করলে আরও উদ্বেগজনক চিত্র স্পষ্ট হয়। মোট পাঁচ লাখের বেশি যে দর্শনার্থী এসেছেন, তাদের মধ্যে প্রকৃত অবকাশযাপনকারী বা ‘লেজার ট্যুরিস্ট’-এর অংশ অত্যন্ত নগণ্য– যা বড়জোর ১৫ শতাংশের কাছাকাছি। বাকি বড় অংশটি আসে ব্যবসায়িক প্রয়োজনে, প্রাতিষ্ঠানিক বা কূটনৈতিক মিশনে কিংবা প্রবাসী ও ভারতীয় উপমহাদেশের সীমান্তবর্তী যাতায়াতের সূত্রে। বিশেষ করে ২০২৫ সালে ভারত থেকে আসা দর্শনার্থীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও সিইআইসি ডেটার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছ থেকে বাংলাদেশের আয় ছিল প্রায় ৪৪০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা ২০২৩ সালের ৪৫৩ মিলিয়ন ডলারের তুলনায় কিছুটা কম। ২০২৫ সালে সামান্য বেড়ে তা ৪৮৮ মিলিয়ন ডলারে ঠেকেছে। জাতীয় অর্থনীতির মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) পর্যটন খাতের প্রত্যক্ষ অবদান মাত্র ৩ শতাংশের কোঠায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
এর ঠিক উল্টো পিঠে রয়েছে থাইল্যান্ডের রমরমা পর্যটন অর্থনীতি। দেশটির পর্যটন ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক পর্যটক পা রেখেছেন ৩ কোটি ২৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি। কেবল এই আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় থেকেই দেশটির অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৫৪ হাজার কোটি থাই বাথ বা প্রায় ৪৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অভ্যন্তরীণ পর্যটনসহ দেশটির মোট পর্যটন আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮৬ বিলিয়ন ডলারে। বিশ্ব ভ্রমণ ও পর্যটন কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) হিসাব অনুযায়ী, থাইল্যান্ডের জিডিপিতে পর্যটন খাতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ অবদান ১২ থেকে ১৩ শতাংশ এবং এই খাত দেশটির লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের প্রধান উৎস।
পর্যটনে বাংলাদেশের সঙ্গে থাইল্যান্ডের ব্যবধান আকাশ-পাতাল। ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে ৩ কোটি ২৯ লাখ ৭০ হাজারের বেশি আন্তর্জাতিক পর্যটক এলেও বাংলাদেশে বিদেশি দর্শনার্থী এসেছেন মাত্র ৫ লাখ ৮৫ হাজার ১৪৫ জন। বাংলাদেশের বিদেশি দর্শনার্থীদের মধ্যে প্রকৃত অবকাশযাপনকারীর সংখ্যা প্রায় ১৫ শতাংশ। একই বছরে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের কাছ থেকে থাইল্যান্ডের আয় হয়েছে ৪৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, বিপরীতে বাংলাদেশের আয় ৪৮৮ মিলিয়ন ডলার। পর্যটন খাতে থাইল্যান্ডের এই সাফল্যের বিপরীতে বাংলাদেশে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে না পারার চিত্রই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও পদে পদে ভোগান্তি
একজন বিদেশি পর্যটক যখন বাংলাদেশে পা রাখেন, তখন বিমানবন্দর থেকেই তার দুর্ভোগের সূচনা হয়। দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলোর যাত্রীসেবা ও লাগেজ হ্যান্ডলিংয়ের মান নিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের অভিযোগ। রাজধানী ঢাকা থেকে প্রধান পর্যটন কেন্দ্রগুলো– যেমন কক্সবাজার, সুন্দরবন বা সেন্ট মার্টিনে পৌঁছানোর যাতায়াতব্যবস্থা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ, কষ্টদায়ক ও অস্বস্তিকর। অভ্যন্তরীণ রুটে উড়োজাহাজের বাড়তি ভাড়া এবং সড়কপথের দীর্ঘ যানজট শুরুতেই পর্যটকদের ক্লান্ত ও নিরুৎসাহিত করে তোলে।
গন্তব্যে পৌঁছানোর পরও পর্যটকদের বড় সংকটে পড়তে হয়। হোটেল, রিসোর্ট ও রেস্তোরাঁর নিম্নমানের সেবা এবং সেবার তুলনায় আকাশছোঁয়া দাম অন্যতম বড় সমস্যা। আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল বুকিং প্ল্যাটফর্ম, স্বচ্ছ মূল্যতালিকা এবং পর্যটকদের জন্য ২৪ ঘণ্টার হেল্পলাইন বা সহায়তা ব্যবস্থারও চরম অপ্রতুলতা রয়েছে। পরিচ্ছন্নতার অভাব, নিরাপদ খাবার পানির সংকট, খাবার হোটেলের স্বাস্থ্যবিধি না মানার প্রবণতা এবং বিদেশি পর্যটকদের টার্গেট করে স্থানীয় পর্যায়ে অতিরিক্ত দাম আদায় কিংবা প্রতারণার অভিযোগ নিত্যদিনের ঘটনা।
পাশাপাশি রয়েছে নিরাপত্তা ও পরিবেশগত বিপর্যয়। দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটক ও প্লাস্টিক দূষণের কারণে দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য আজ ধ্বংসের মুখে। সুন্দরবনের মতো বিশ্বমানের ম্যানগ্রোভ বনেও পর্যটনের সুনির্দিষ্ট ও পরিবেশবান্ধব কোনো পরিকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
কুয়াকাটার সম্ভাবনা ও চরম অব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম বড় প্রতীক ‘সাগরকন্যা’ কুয়াকাটা। বিশ্বের বিরল এক প্রাকৃতিক বিস্ময়, যেখানকার সৈকতে দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই উপভোগ করা যায়। কক্সবাজারের বিকল্প হিসেবে গড়ে ওঠার বিশাল সম্ভাবনা থাকলেও কেবল দূরদর্শী পরিকল্পনার অভাব ও চরম অব্যবস্থাপনার কারণে কুয়াকাটা আজও অবহেলিত এক পর্যটন কেন্দ্র।
পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, কুয়াকাটার যে প্রাকৃতিক প্যানোরামিক ভিউ রয়েছে, তা থাইল্যান্ডের জনপ্রিয় সৈকতগুলোর চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। অথচ যাতায়াতের দীর্ঘসূত্রতা, অপরিকল্পিত ও যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মাণ, সৈকতের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস এবং সাগরের লোনা পানির আগ্রাসনে ভাঙনের কবলে পড়ে কুয়াকাটা তার চিরচেনা রূপ হারাচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট, মানসম্মত রেস্তোরাঁ, সুপেয় পানির তীব্র সংকট ও পরিচ্ছন্নতার চরম ঘাটতির কারণে বিদেশি পর্যটক তো দূরের কথা, দেশি পর্যটকেরাও অনেক সময় স্বস্তি পান না। সৈকত এলাকায় হকারদের দৌরাত্ম্য, নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জোয়ারের সময় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আতঙ্ক কুয়াকাটার পর্যটন সম্ভাবনাকে প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে ফেলছে।
সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, থাইল্যান্ডের ফি ফি দ্বীপ বা পাতায়া সৈকতে যেভাবে কঠোর পরিবেশগত নিয়ম ও পর্যটকবান্ধব পরিবেশ বজায় রাখা হয়, কক্সবাজার বা কুয়াকাটায় তার সিকিভাগও বাস্তবায়ন করা যায়নি। কেবল ছুটির দিনে সাময়িক ভিড় জমানো আর লোকদেখানো প্রচারণার বাইরে আন্তর্জাতিক মানের ‘ইকো-ট্যুরিজম হাব’ হিসেবে সৈকতগুলোকে গড়ে তুলতে সুনির্দিষ্ট মাস্টারপ্ল্যানের ঘাটতি এখানে প্রকট।
ব্যাংককের চাও ফ্রায়া বনাম ঢাকার বুড়িগঙ্গা
একই মহাদেশ, দুটি প্রধান শহর আর দুটি ঐতিহাসিক নদীর প্রবাহ। একটি ব্যাংককের ‘চাও ফ্রায়া’, অন্যটি ঢাকার ‘বুড়িগঙ্গা’। অথচ একটি নদী আজ দেশের অর্থনীতি, নগরজীবন ও বিশ্ব পর্যটনের অন্যতম প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে; বিপরীতে অন্যটি পরিচিতি পেয়েছে বর্জ্য ফেলার ক্ষেত্র ও দূষণের প্রতীক হিসেবে। সঠিক পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও রূপ-লাবণ্য থাকা সত্ত্বেও কীভাবে আকাশ-পাতাল ব্যবধান তৈরি হতে পারে, এটি তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। ব্যাংকক যেখানে কেবল নদীভিত্তিক পর্যটনের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলারের রাজস্ব আয় করছে, সেখানে বুড়িগঙ্গার তীরের শত শত বছরের ঐতিহ্য ও অপার সম্ভাবনা পরিবেশগত সংকটে মুখ থুবড়ে পড়েছে।
থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের বুক চিরে বয়ে চলা চাও ফ্রায়া নদী শহরটির যাতায়াত ও অর্থনীতিকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। নদীভিত্তিক ক্রুজ, ঐতিহ্যবাহী লং-টেইল বোট এবং নিয়মিত ওয়াটার ট্যাক্সি সার্ভিস দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক ও যাত্রী পরিবহন করা হয়। শুধু ওই নদীকে কেন্দ্র করে আধুনিক শপিং মল, আন্তর্জাতিক মানের হোটেল ও রেস্তোরাঁসহ স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসার সুপরিকল্পিত বিকাশ ঘটেছে। দ্রুত নগরায়ণ ও জোয়ার-ভাটায় পলি জমার মতো পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলাতেও দেশটি বাস্তবায়ন করেছে সমন্বিত মহাপরিকল্পনা।
বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ঐতিহাসিক ধমনি বুড়িগঙ্গা আজ শিল্পবর্জ্য, পয়োবর্জ্য, প্লাস্টিক দূষণ, অবৈধ দখল ও নিয়মিত নাব্যতা সংকটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। অতিমাত্রার দূষণে নদীর পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের পরিমাণ শূন্যের কাছাকাছি নেমে গেছে, নদীটি পরিণত হয়েছে প্রায় জলজ প্রাণীশূন্য এক জলাধারে। অথচ লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল ও ওয়াইজঘাটের মতো ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে পর্যটন ও নদীভ্রমণভিত্তিক এক বিশাল অর্থনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করার সুযোগ ছিল। তবে সঠিক নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা এবং পরিকাঠামোর অভাবে সেই অমিত সম্ভাবনা এখনো আটকে আছে।
নীতি ও মহাপরিকল্পনায় স্থবিরতা
সরেজমিন অনুসন্ধান ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের তথ্যানুযায়ী, থাইল্যান্ডের এমন আকাশচুম্বী সাফল্যের মূলে রয়েছে দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট নীতি। দেশটি পর্যটনকে কেবল একটি খাত হিসেবে দেখেনি, বরং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড’ ব্র্যান্ডের আগ্রাসী প্রচারণা, ট্যুরিজম অথরিটি অব থাইল্যান্ডের (টিএটি) অতিসক্রিয় বিপণন কৌশল, সহজ ভিসা নীতি এবং গন্তব্যভিত্তিক টেকসই অবকাঠামোগত উন্নয়ন তাদের পর্যটনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। পর্যটকদের অতিরিক্ত চাপ কিংবা মৌসুমভিত্তিক মন্দার মতো চ্যালেঞ্জ থাইল্যান্ড দক্ষতার সঙ্গে সামাল দিয়েছে, কিন্তু তাদের জাতীয় নীতির ধারাবাহিকতায় কখনো ছেদ পড়তে দেয়নি।
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে ২০১৯ সালে জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ছয়–সাত বছরেও তা চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা, নীতিগত অস্থিরতা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে পর্যটন উন্নয়ন কার্যক্রম বিচ্ছিন্ন ও অপরিকল্পিতভাবে এগোচ্ছে। পরিকল্পিত পর্যটন অঞ্চল ও আন্তর্জাতিক মানের অবকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও রয়েছে ঘাটতি। অন্যদিকে থাইল্যান্ড দীর্ঘমেয়াদি নীতি, সহজ ভিসা, আন্তর্জাতিক প্রচার ও পর্যটকবান্ধব সেবার মাধ্যমে নিজেকে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশকেও পর্যটন খাতকে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে।
বিপরীতে বাংলাদেশের অবস্থা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দেশে পর্যটন খাতের উন্নয়নের জন্য ২০১৯ সালে একটি জাতীয় পর্যটন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ছয়-সাত বছর পেরিয়ে গেলেও সেই মহাপরিকল্পনা আজও চূড়ান্ত অনুমোদন পায়নি। করোনা মহামারি, আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের দোলাচলে এটি বারবার ফাইলবন্দি বা পর্যালোচনাধীন অবস্থাতেই আটকে থেকেছে।
ফলে দেশের পর্যটন উন্নয়ন ঘটছে অত্যন্ত বিচ্ছিন্ন, অপরিকল্পিত ও খণ্ডিত উপায়ে। কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের চরম অভাব রয়েছে। পরিকল্পনা ছাড়াই যত্রতত্র হোটেল-মোটেল গড়ে ওঠায় উপকূলীয় পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে, অথচ আন্তর্জাতিক মানের কোনো সমন্বিত ট্যুরিজম জোন আলোর মুখ দেখেনি।
ব্র্যান্ডিংয়ের ব্যর্থতা ও বিনিয়োগে খরা
থাইল্যান্ড বিশ্ববাজারে নিজেদের ‘নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর, সাশ্রয়ী ও বৈচিত্র্যময়’ গন্তব্য হিসেবে সফলভাবে ব্র্যান্ডিং করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ যুগের পর যুগ ধরে কক্সবাজারকে কেবল ‘বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত’ হিসেবে চিরাচরিত স্লোগানে প্রচার করেই দায় সেরেছে। আধুনিক ডিজিটাল মার্কেটিং, টার্গেট মার্কেটভিত্তিক ক্যাম্পেইন (যেমন ইউরোপের প্রবীণ পর্যটক কিংবা পূর্ব এশিয়ার অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী তরুণদের টার্গেট করা) কিংবা আন্তর্জাতিক ট্রাভেল ভ্লগার ও ইনফ্লুয়েন্সারদের মাধ্যমে প্রচারের কোনো সুসংগঠিত কৌশল নেই।
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও রয়েছে বড় বাধা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমির মালিকানা ও অধিগ্রহণের দীর্ঘসূত্রতা, নীতিগত অস্থিতিশীলতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পর্যটন খাতে পুঁজি খাটাতে সাহস পান না। ফলে থাইল্যান্ড বা মালয়েশিয়ার মতো বড় বড় বৈশ্বিক হোটেল চেইন বা থিম পার্ক বাংলাদেশে গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে স্থানীয় উদ্যোক্তারাও পুঁজির সংকট ও পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক নীতি সহায়তার অভাবে বড় বিনিয়োগে হাত দিতে ভয় পান।
গলদ কোথায়, উত্তরণের উপায় কী
বাংলাদেশের পর্যটন খাতের স্থবিরতার প্রধান কারণ হলো প্রাকৃতিক সম্পদকে আন্তর্জাতিক মানের আস্থার জায়গা, নিরাপদ অভিজ্ঞতা এবং অর্থনৈতিক পণ্যে রূপান্তর করতে না পারা। থাইল্যান্ডের পর্যটনশিল্পের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, তারা নিজেদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে শুধু দর্শনীয় স্থান হিসেবে ফেলে রাখেনি; বরং সেগুলোকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন অভিজ্ঞতায় রূপান্তর করেছে। পাতায়ার সমুদ্রসৈকত, ফুকেট ও আশপাশের দ্বীপপুঞ্জ, নদীভিত্তিক ভ্রমণ, পাহাড়, বন ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে তারা সুপরিকল্পিতভাবে পর্যটকদের সামনে তুলে ধরেছে। সহজ যাতায়াত, মানসম্মত হোটেল-রেস্তোরাঁ, বিনোদনের নানা আয়োজন, পর্যটকবান্ধব সেবা এবং আন্তর্জাতিক প্রচারের মাধ্যমে থাইল্যান্ড নিজেকে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।
থাই-বাংলা ট্যুর অপারেটরের সহসভাপতি ও সুহা ট্রাভেলস থাইল্যান্ডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ সোলাইমান মনে করেন, প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের দিক থেকে বাংলাদেশের কোনো ঘাটতি নেই। বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অনন্য কুয়াকাটা, প্রবালসমৃদ্ধ সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, নদ-নদী ও সবুজ প্রকৃতি– সব মিলিয়ে বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনা অনেক বড়। কিন্তু এসব আকর্ষণকে আন্তর্জাতিক পর্যটকের কাছে পরিকল্পিত ও আকর্ষণীয় প্যাকেজ হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে আমরা এখনো পিছিয়ে আছি।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, একজন বিদেশি পর্যটক শুধু সুন্দর জায়গা দেখতে চান না; তিনি জানতে চান সেখানে গিয়ে কী কী করা যাবে, কীভাবে সহজে পৌঁছানো যাবে, কোথায় নিরাপদে থাকবেন, কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাবেন এবং তার ব্যয়ের বিনিময়ে কতটা মানসম্মত সেবা নিশ্চিত হবে। থাইল্যান্ড এসব বিষয়কে পর্যটন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ করেছে। বাংলাদেশকেও গন্তব্যভিত্তিক পরিকল্পনা, উন্নত যোগাযোগ, পরিচ্ছন্নতা, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষিত গাইড, মানসম্মত আবাসন এবং আন্তর্জাতিক বিপণনে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সোলাইমান বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে, শুধু প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই একটি দেশ আন্তর্জাতিক পর্যটনকেন্দ্র হয়ে ওঠে না। সেই সম্পদকে সংরক্ষণ করতে হয়, পর্যটকের জন্য উপযোগী করতে হয় এবং সারা বিশ্বের মানুষের কাছে কার্যকরভাবে তুলে ধরতে হয়। বাংলাদেশ যদি সমন্বিত পরিকল্পনা, সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ ও পর্যটকবান্ধব সেবার ওপর জোর দেয়, তাহলে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্ট মার্টিন, সুন্দরবনসহ দেশের বিভিন্ন গন্তব্য আন্তর্জাতিক পর্যটন মানচিত্রে শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।
বিশ্ববাজারে ‘অ্যামেজিং থাইল্যান্ড’ ব্র্যান্ডের মাধ্যমে নিজেদের পর্যটন আকর্ষণ তুলে ধরেছে থাইল্যান্ড। দেশটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি মানসম্মত আবাসন, সহজ যাতায়াত, বৈচিত্র্যময় বিনোদন ও পর্যটকবান্ধব সেবাকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশ এখনো আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর বিপণন ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারে পিছিয়ে রয়েছে। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জমিসংক্রান্ত সমস্যা, নীতিগত অনিশ্চয়তা ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের পথেও বাধা সৃষ্টি করছে।
অন্যদিকে ট্যুর অপারেটর্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (টোয়াব) পরিচালক ও আরাল সী লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নাসিরউদ্দিন বাদল ঢাকা পোস্টকে বলেন, দেশের পর্যটনশিল্পের অপার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও সঠিক মাস্টারপ্ল্যান এবং কার্যকর নীতিমালা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে আমরা আজ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে রয়েছি। ভারতের সুন্দরবন বা আমাজনের মতো বিশ্বমানের জঙ্গল ও রিভার ট্যুরিজমে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলেও আমাদের দেশে নানা রকম অপ্রয়োজনীয় বাধা তৈরি করা হচ্ছে। সাজেক বা অন্যান্য পর্যটনকেন্দ্রে অব্যবস্থাপনা এবং পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারায় পর্যটন খাত মুখ থুবড়ে পড়ছে।
তিনি বলেন, বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে এবং তাদের নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বিমানবন্দরসহ বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যমান হয়রানি ও জটিলতা অবিলম্বে দূর করতে হবে। কক্সবাজারসহ প্রধান সমুদ্রসৈকতগুলোতে বিদেশি আদলে জাল বা নেট দিয়ে নিরাপত্তা বেষ্টনী তৈরি করা জরুরি, যাতে পর্যটকেরা অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পান। ট্যুরিজম বোর্ডের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কেবল বিদেশ ভ্রমণ না করে দেশের প্রকৃত পর্যটন পণ্য ও রিসোর্টগুলোকে টিকিয়ে রাখতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে।
থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের পর্যটন ভিসাকে সহজলভ্য এবং যাতায়াতব্যবস্থা আধুনিকায়ন করার দাবি জানিয়ে নাসিরউদ্দিন বাদল বলেন, দেশের পর্যটন খাতকে বাঁচাতে এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের পথ সুগম করতে একটি যুগোপযোগী ও মাস্টারপ্ল্যানভিত্তিক সমন্বিত নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের বড় দাবি।
ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) সাধারণ সম্পাদক এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন সংস্থা রূপান্তর ইকো ট্যুরিজম লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাজমুল আজম ডেভিডও দেশের পর্যটনশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে ও এর টেকসই বিকাশের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং কার্যকর পদক্ষেপের ওপর জোর দিয়েছেন।
ঢাকা পোস্টকে তিনি বলেন, পর্যটকদের নিরাপত্তা, ভালো অবকাঠামো এবং পর্যটন খাতের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে আমাদের দেশে বিদেশি পর্যটকেরা সেভাবে আকৃষ্ট হচ্ছেন না। পলিথিন ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাবে শুধু শহর নয়, নদী-নালা বেয়ে পলিথিন সুন্দরবনের ভেতরে ও গভীর সাগরে গিয়ে জমছে, যা পরিবেশের জন্য বড় হুমকি। আমাদের কুয়াকাটা ও কক্সবাজারের মতো দুটি সৈকত এবং সুন্দরবনের বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ থাকা সত্ত্বেও যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাব রয়েছে।
উদাহরণ হিসেবে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের কথা উল্লেখ করে নাজমুল আজম বলেন, সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনে আইন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটনের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা হচ্ছে না। বরং সেখানে মাস ট্যুরিজম ও আনন্দ-ফুর্তির পিকনিক ট্যুরিজম চলছে। সুন্দরবন এলাকায় ২০১৪-১৫ সাল থেকে ব্যক্তি উদ্যোগে রিসোর্ট গড়ে উঠলেও সেখানে সরকারের কোনো সহযোগিতা নেই, বরং পদে পদে বাধা রয়েছে। হুট করে মিটিং করে এসব রিসোর্ট অবৈধ ঘোষণা করে ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এলাকার অর্থনীতিতে এর ভূমিকা ও পরিবেশগত ক্ষতির ওপর কোনো ধরনের ইমপ্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট বা গবেষণাও করা হয়নি।