সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর সড়কের মুক্তিরখলা সেতু নির্মাণে সরকারি বরাদ্দ ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৯৯ হাজার ৫০৮ টাকা। এ কাজ করতে হলে স্থানীয় সংসদ সদস্য (এমপি) ও জেলা বিএনপির নেতা নূরুল ইসলাম নূরুলকে চাঁদা হিসেবে দিতে হবে ১ কোটি টাকা। অস্বীকৃতি জানানোয় ঠিকাদারকে মিথ্যা অভিযোগে করা মামলায় ফাঁসিয়ে করা হচ্ছে হয়রানি। বাসায় পুলিশ পাঠিয়ে পরিবারের সদস্যদের দেখানো হচ্ছে ভয়ভীতি। আতঙ্কে সুনামগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় এসে আশ্রয় নিয়েছেন ঠিকাদার। এখানেই শেষ নয়, বিভিন্ন মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর পরও চাঁদার টাকা না দেওয়ায় এক সপ্তাহ আগে ক্যাডার বাহিনী নিয়ে খোদ এমপি নূরুল ইসলাম প্রকল্পস্থলে গিয়ে গালাগাল করেছেন ঠিকাদারের লোকজনকে। নির্দেশ দিয়েছেন কাজ বন্ধের। তখন থেকেই বন্ধ সরকারের এ উন্নয়নকাজ। এমন অভিযোগ তুলে ধরে আইনগত ব্যবস্থা এবং জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পুলিশ সদর দপ্তরে লিখিত আবেদন জানিয়েছেন ঠিকাদার ইঞ্জিনিয়ার মো. শফিকুল ইসলাম।
তার আবেদনের অনুলিপি, ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও ফুটেজ এবং মোবাইল ফোনে কথোপকথনের অডিও ক্লিপ বিশ্লেষণে মিলেছে অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা।
এদিকে নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পর গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যার আগে আগে এমপি নূরুল ইসলাম মোটরসাইকেল বহরের ক্যাডার বাহিনী নিয়ে তার প্রতিষ্ঠানের বাস্তবায়নাধীন ৮৭ কোটি টাকার আরেক সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে ভাষ্য ঠিকাদার শফিকুল ইসলামের। তার দাবি, নির্দেশ তামিলে দেরি হওয়ায় এমপি নিজে রোলার চালক মনির হোসেনকে টেনেহিঁচড়ে রোলার থেকে নামিয়ে কিল-ঘুসি মারেন। একই সময় এমপির ক্যাডাররা পে-লোডার চালক কবির হোসেন ও সুপারভাইজার হোসেন আলীকে লাথি ও কিল-ঘুসি মারেন। এরপর থেকে ওই সেতুর কাজও বন্ধ থাকার তথ্য জানিয়েছেন প্রকল্পটির ব্যবস্থাপক (ম্যানেজার) রফিক আলী।
বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা ও সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার একাংশ নিয়ে গঠিত সুনামগঞ্জ-৪ আসনের এমপি নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগ ঘিরে এলাকায় চলছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা।
এমপি নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দপ্তরে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়ার কথা স্বীকার করে ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘এমপি নূরুল ইসলাম আমার কাছে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেছেন। এত টাকা আমি তাকে কোথা থেকে দেব? এই কাজে আমার লাভ হবে কয় টাকা! চাঁদা না দেওয়ায় তিনি আমাকে ও আমার পরিবারকে হয়রানি করছেন। পুলিশ আমার বাসায় গিয়ে পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখাচ্ছে। আমার নামে দুটি মিথ্যা মামলা দিয়েছে। তারপরও আমি চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে এক সপ্তাহ ধরে কাজ বন্ধ করে রেখেছে। প্রকল্পে আমার প্রায় ২ কোটি টাকার মালামাল পড়ে আছে। বিষয়টি আমি সড়ক ও জনপথ বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদেরও অবহিত করেছি। আজ (গতকাল) সন্ধ্যার আগে আমার আরেকটি সাইটের (প্রকল্প) কাজ বন্ধ করে দিয়েছে। এমপি নিজে শ্রমিকদের মারধরও করেছেন।’
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গতকাল রাতে এমপি নূরুল ইসলাম নূরুলের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া মেলেনি। তার একই নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপে এই প্রতিবেদকের পরিচয় জানিয়ে কথা বলার সময় চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো জবাব দেননি। সবশেষ রাত পৌনে ৮টায় এমপি নূরুলের বক্তব্য চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন পাঠানো হয়। রাত ১০টা পর্যন্তও পাওয়া যায়নি তার জবাব।
সংশ্লিষ্ট নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুরের মুক্তিরখলা সেতু নির্মাণের কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স মোস্তফা কামাল। কাজ শেষ করার সময়সীমা ১৮ মাস। গত ৬ জানুয়ারি কার্যাদেশ পাওয়ার পর নির্মাণকাজ শুরু করেন ঠিকাদার শফিকুল ইসলাম। তার ভাষ্য, ২০ জানুয়ারি কাজ শুরুর পরপরই নির্মাণকাজের দায়িত্ব ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন এমপি নূরুল। এতে ব্যর্থ হয়ে ১ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করেন। চাঁদা না দিলে কীভাবে কাজ করেন তা দেখে নেওয়ার হুমকি দেন। এসব হুমকি-ধমকি উপেক্ষা করে ঠিকাদারের লোকজন সেতুর বিকল্প চলাচলের পথ তৈরি শুরু করলে এমপি আরও ক্ষুব্ধ হন। তখন ঠিকাদারকে ‘শায়েস্তা’ করতে আশ্রয় নেন কূটকৌশলের। ঠিকাদার শফিকুল ইসলামকে করা হয় ‘সাজানো’ মামলার আসামি। এরপর শুরু হয় পুলিশি হয়রানি। গ্রেপ্তার এড়াতে সুনামগঞ্জ ছেড়ে ঢাকায় এসে আশ্রয় নেন শফিকুল। এরপর পুলিশ তাকে খোঁজার নাম করে বাড়িতে হানা দিয়ে তল্লাশির নামে পরিবারের সদস্যদের ভয়ভীতি দেখায়।
ওই মামলার এজাহারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জ সদরের ৮ নম্বর ওয়ার্ডে নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল বের করার ঘটনায় থানায় মামলা (নম্বর-৩৪) হয়। এই মামলায় ঠিকাদার শফিকুল ইসলামকে করা হয়েছে ৫১ নম্বর আসামি।
পুলিশ সদর দপ্তরে করা আবেদন ও আগামীর সময়ের হাতে আসা সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২১ অক্টোবর সুনামগঞ্জ সদর থানার এসআই মো. জহির হোসেন ও জাকারিয়া আহমদের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল সিলেট শহরে ঠিকাদার শফিকুলের বাসায় গিয়ে তল্লাশি চালায়। শফিককে না পেয়ে তার স্ত্রীকে ভয়ভীতি দেখান পুলিশ সদস্যরা। এর আগে গত ২৮ মার্চ সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জ থানায় হওয়া মাছ চুরির একটি মামলায় (নম্বর ২০) আসামি করা হয় শফিকুলকে। পরে তদন্তে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে ওই মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেওয়া ঠিকাদার শফিকুলের আবেদনে বলা হয়েছে, মিথ্যা মামলা ও হয়রানির পরও চাঁদা না দেওয়ায় তার পেছনে লেলিয়ে দেওয়া হয় এমপির ক্যাডার বাহিনী। গত ২০ অক্টোবর এমপির ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান নাঈম শফিকুলের মোবাইল ফোনে কল করে তাকে এমপির সঙ্গে দেখা করার জন্য চাপ দেন। এ-সংক্রান্ত কথোপকথনে নাঈমকে বলতে শোনা যায়, ‘আজ আফনার সাইডো গেছিল, কাম বন্ধ হইরা আইচে এমপি সাবে, ইমার্জেন্সি দেহা হরবার লাগি কইচে, আমার কথাখান হুনো, আমি হইলাম তুমি ব্যাডার লগে দেহা হরো।’ জবাবে শফিক বলছিলেন, ‘কাজ বন্ধ করা কি এমপি সাবের কাজ। দেখা করতে যেহেতু বলছে, ফোনে একবার কথা বলব। আমি তো ঢাকায়, তাই দেখা করা সম্ভব না।’ ওইদিনই বেলা ১১টায় ও বিকাল সাড়ে ৫টায় দুই দফায় এমপি তার ক্যাডার বাহিনী নিয়ে প্রকল্পস্থলে গিয়ে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেন বলে দাবি ঠিকাদার শফিকুলের।
এর আগে ৫ অক্টোবর এমপির আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু তার মোবাইল ফোনে কল করে হুমকি-ধমকি দেন বলে অভিযোগ করে ঠিকাদার শফিকুল জানালেন, ধারাবাহিক হুমকির মুখে তিনি ও তার পরিবার চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনও করেছেন।
ঠিকাদার শফিকুলের ভাষ্য, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদনের পর আরও ক্ষিপ্ত হন এমপি নূরুল ইসলাম। গতকাল সন্ধ্যার আগে তিনি ক্যাডার বাহিনী নিয়ে দুই বছর আগে শুরু হওয়া তার আরেক প্রকল্পে গিয়ে শ্রমিকদের মারধর করে কাজ বন্ধ করে দিয়েছেন।
প্রকল্পটির ব্যবস্থাপক রফিক আলী বলেছেন, ‘মাগরিবের ১০-১৫ মিনিট আগে অন্তত ১০টি মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে এমপি নূরুল এসে কাজ বন্ধ করতে হুমকি-ধমকি দিতে থাকেন।’
হামলার শিকার হয়েছেন জানিয়ে পে-লোডার চালক কবির হোসেন মোবাইল ফোনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে এ প্রতিবেদককে বললেন, “আমি ২৭ বছর ধরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের পে-লোডার চালক হিসেবে চাকরি করি। এই পরিচয় দেওয়ার পরও এমপি নিজেই আমার ঘাড় ধরে টেনে নামিয়ে কিল-ঘুসি দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেন। এরপর অন্যরা আমাকে মারধর করে। আমার চাকরিজীবনে এরকম পরিস্থিতির মুখোমুখি হইনি। একজন এমপি কীভাবে আমাদের গায়ে হাত তুলতে পারে? মার খাওয়ার পর আমরা তিনজনই নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল হক স্যারের অফিসে গিয়ে মারধর করে কাজ বন্ধ করে দেওয়ার কথা জানাই। তিনি শুনে হতবাক হন। আমাদের বলেছেন, ‘তোমরা চিকিৎসা নাও। আমি এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেব’।”
সাইট সুপারভাইজার হোসেন আলীও তার ওপর হামলার কথা জানালেন। বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমাদের সবাই মারতে পারে।’
এ বিষয়ে জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল হকের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করেও সাড়া মেলেনি। পরে একই নাম্বারের হোয়াটসঅ্যাপে কল করার কারণ জানিয়ে বার্তা পাঠালেও জবাব দেননি।
সংশ্লিষ্টরা জানালেন, ৮৭ কোটি টাকা ব্যয়ের সুনামগঞ্জের সালামপুর সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হয় বছর দুয়ের আগে। এরই মধ্যে প্রকল্পটির ৮০ শতাংশ কাজ শেষ।
চাঁদা দাবির অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে এমপি নূরুলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জ পৌর যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মাহমুদুল হাসান নাঈম বললেন, “এমপি জেলার সব ঠিকাদারকে ডাকতেই পারেন। তার মানে তো এই নয় যে তিনি চাঁদার জন্য ডেকেছেন। ঠিকাদার শফিক আমার পরিচিত তাই এমপি সাহেব আমাকে বলেছিলেন, ‘শফিককে বলো দেখা করতে’। আমি কোনো চাপ দিইনি। শুধু এমপি সাহেবের খবরটা পৌঁছে দিয়েছি।”
গতকাল এমপি নিজ হাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও সরকারি পে-লোডারের চালককে মারধর করেছেন— এমন অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি খুব ঝামেলায় আছি। আর কথা বলতে পারব না। আপনি এমপি সাহেবকে কল দেন।’
হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে জেলা যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল হাসান রাজু বললেন, ‘আমি ঠিকাদার শফিককে চিনিও না। তাই তাকে হুমকি দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।’ ঠিকাদার শফিকুলের কাছে মালামাল সরবরাহের কাজ চাওয়ার অভিযোগের সদুত্তর দেননি তিনি। আরেক প্রশ্নের জবাবে বললেন, ‘আজ (গতকাল) সন্ধ্যার আগে এমপির সঙ্গে বিশ্বম্ভরপুরে একটি খেলার অনুষ্ঠানে অংশ নিই। ফেরার পথে সালামপুরে ব্রিজ নির্মাণকাজ দেখতে যাই। সেখানে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে দেখে এমপি সাহেব কাজ বন্ধ রাখতে সড়ক ও জনপথ বিভাগের কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেবেন বলে জানান। সেখানে কাউকে মারধরের অভিযোগ সত্য নয়।’