Image description

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নামে পশু জবাই, পত্রিকা অফিসের সামনে ভোজ বসিয়ে তওবা করানোর চেষ্টা, বিশ্ববিদ্যালয়ে গরুর মাংস রান্না নিয়ে ঝগড়া আর যে রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস পাওয়া যায় না তা বয়কটের ডাক—সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংঘাতের এক নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে গরু।

ভারতে গরুর মাংস খাওয়া নিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচারের কঠোর সমালোচনা করে আসছে বাংলাদেশের ধর্মীয় ও ডানপন্থী দলগুলো। তারা একে উগ্র রাজনীতি বলেই মনে করে। কিন্তু এখন দেশের ভেতরের চিত্র দেখে একই প্রশ্ন উঠছে: প্রতিপক্ষকে দমাতে বা নিজের পছন্দের খাবার অন্যের ওপর চাপিয়ে দিতে সংখ্যাগরিষ্ঠের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করার এই চর্চা কি তবে বাংলাদেশেও তৈরি হচ্ছে?

গবেষক মীর হোজাইফা আল মামদূহ টাইমসকে বলেন, ‘ইসলামে কোনো খাবার খাওয়া জায়েজ হওয়া আর সেই খাবারকে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রধান প্রতীক বানিয়ে ফেলা—দুটো এক কথা নয়।’

তিনি বলেন, রাজনৈতিক বিরোধীদের নামে পশু জবাই, ‘পাপ’ বা ‘ফ্যাসিবাদ’ থেকে মুক্তির নামে ভোজের আয়োজন কিংবা কাউকে তওবা করতে বাধ্য করার সঙ্গে ইসলামি নৈতিকতার কোনো সম্পর্ক নেই।

এসবের পেছনে স্পষ্ট রাজনৈতিক উদ্দেশ্য দেখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মামুন আল মোস্তফা। তিনি টাইমসকে বলেন, ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহারের ফলে গত শতাব্দীর শুরু থেকে যে সামাজিক সংঘাত দেখা দিয়েছিল, তা এতদিন বিভিন্ন ধর্মের নেতাদের মধ্যকার পারস্পরিক আলোচনা ও সমঝোতার মাধ্যমেই সমাধান হয়ে আসছিল।

তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখে মনে হচ্ছে, ধর্মীয় পরিচয় ও খাবারের মতো বিষয়গুলো এখন রাজনৈতিক আনুগত্য প্রমাণের মাধ্যম হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন জায়গায় গরুর মাংসকে কেন্দ্র করে নানা কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এগুলোর নাম দেওয়া হয় ‘জুলাই জিয়াফত’, ‘ফ্যাসিবাদ মুক্ত উৎসব’ কিংবা ‘ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধ’। এমনকি জবাই করা পশুর নাম দেওয়া হয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের নামে। আবার কোথাও কোথাও গরুর মাংস রান্নাকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ ও পাল্টা কর্মসূচির সৃষ্টি হয়।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অস্থায়ী মন্দিরের পাশে মুক্তমঞ্চে কিছু শিক্ষার্থী গরুর মাংসের খিচুড়ি রান্না করলে তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। উপাসনালয়ের এত কাছে গরুর মাংস রান্নার প্রতিবাদ জানায় মন্দির কমিটি। জবাবে কিছু শিক্ষার্থী দাবি তোলেন, দেশের ৯২ শতাংশ মানুষই মুসলিম; তাই গরুর মাংস রান্নায় বাধা দেওয়া মানে সংখ্যাগরিষ্ঠের খাবারের স্বাধীনতা ও অধিকার কেড়ে নেওয়া।

জনস্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে ক্যাম্পাসে পশু জবাই করতে নিষেধ করেছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ইসলামী ছাত্রশিবির পরিচালিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (জাকসু) এর প্রতিবাদ জানায়। তারা ক্যাম্পাসে গরু জবাই করে ভোজের ঘোষণা দেয় এবং ‘গরুর মাংস খাওয়ার অধিকার’ আদায়ের আন্দোলন শুরু করে।

এ ভোজের কারণ ব্যাখ্যা করে জাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘প্রশাসন নোটিশ দিয়ে গরু জবাই বন্ধ করতে চেয়েছিল, শিক্ষার্থীরা তারই প্রতিবাদ জানিয়েছে।’

প্রশাসনের সিদ্ধান্তকে মুসলিমদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হিসেবে দেখে তিনি বলেন, ‘যে দেশে ৯২ শতাংশ মানুষ মুসলিম, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ে গরু জবাই বন্ধের নির্দেশ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।’

গরুর মাংস মুসলিম পরিচয়ের প্রতীক কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, আল্লাহ গরুর মাংসকে হালাল করেছেন এবং মুসলিমরা তা খায়। ঈদুল আজহায় গরু কোরবানি দেওয়া এ দেশের মানুষের আবেগ ও বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত। তাই কেউ বাধা দিলে প্রতিবাদ হওয়াটাই স্বাভাবিক।

 

বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, ধর্মীয় বা সামাজিক উৎসব ছাড়া নির্দিষ্ট কসাইখানার বাইরে খোলা জায়গায় গবাদিপশু জবাই করা নিষেধ। আইন ভাঙলে সর্বোচ্চ এক বছরের জেল হতে পারে। এমনকি উৎসবের দিনেও কসাইখানার বাইরে পশু জবাইয়ের অনুমতি লাগে, যা দেওয়ার এখতিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের নেই।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ছোট করা এবং জয় উদযাপনে পশু জবাইয়ের এ সংস্কৃতি মূলত ২০২৪ সালের আগস্টের পরিবর্তনের পর শুরু হয়।

২৪ নভেম্বর কারওয়ান বাজারে ‘বাংলাদেশের জনগণ’ ব্যানারে প্রথম আলো কার্যালয়ের সামনে ‘ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধে প্রথম আলো-ডেইলি স্টার জিয়াফত’ লিখে দুটি গরু জবাই করা হয়। আয়োজকরা জানান, পত্রিকা দুটিকে ‘তওবা’ করাতেই এ ভোজের আয়োজন।

একই বছর চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে হলে মুসলিম শিক্ষার্থীরা খাবারের তালিকায় গরুর মাংস রাখার দাবিতে আন্দোলন করেন। তাদের যুক্তি ছিল, ক্যাম্পাসের ৯২ শতাংশ মুসলিম শিক্ষার্থীকে তাদের পছন্দের খাবার না দেওয়া অধিকার লঙ্ঘন।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর অনলাইনে বক্তব্য দিলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের সামনে গরু এনে উন্মুক্ত রাস্তায় স্লোগান দিয়ে জবাই করা হয়।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গুলিস্তানের গোলাপ শাহ মাজারের কাছে দুটি রেস্তোরাঁর সামনে বিক্ষোভ করে ‘মুসলিম কনজ্যুমার রাইটস কাউন্সিল’। তাদের অভিযোগ ছিল, রেস্তোরাঁ দুটি গরুর মাংস না রেখে মুসলিমদের বঞ্চিত করছে এবং হিন্দুত্ববাদীদের সুবিধা দিচ্ছে। রেস্তোরাঁ দুটিকে ‘ভারতের এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে দেশজুড়ে কোনো রেস্তোরাঁয় গরুর মাংস না রাখলে সেসব রেস্তোরাঁ বর্জনের হুমকি দেওয়া হয়।

চলতি বছরের ৬ ফেব্রুয়ারি ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে শেখ মুজিবুর রহমানের ভাঙা বাসভবনের সামনে গরু জবাই করে ভোজের আয়োজন করে ‘জুলাই ঐক্য জোট’।

১২ মে শাহবাগে ‘জুলাই রেভ্যুলেশনারি অ্যালায়েন্স’ শেখ মুজিবুর রহমান ও শেখ হাসিনার নামে দুটি গরু এবং ওবায়দুল কাদেরের নামে একটি ছাগল জবাই করে।

১৫ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (রাকসু) সাধারণ সম্পাদক সালাউদ্দিন আম্মারের নেতৃত্বে ‘জুলাই জিয়াফত’-এ ‘বাকশাল’ নামের একটি গরু জবাই হয়।

‘গরুর মাংস দিয়ে মুসলিম পরিচয় মাপা যায় না’

গরুর মাংসকে ধর্মীয় পরিচয়ের মূল মাপকাঠি বানানোর এ চেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছেন গবেষক হোজাইফা।

সংখ্যাগরিষ্ঠের অধিকারের নামে এসব কর্মকাণ্ড ইসলামের ন্যায়বিচার, সংযম ও অন্যকে রক্ষার নীতির সঙ্গে মিলে কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অন্যকে ছোট করা আর নিজের আধিপত্য দেখানোর চেষ্টা থেকেসংঘাত তৈরি হয়। গায়ের জোর দেখাতে গেলেই উত্তেজনা বাড়ে।’

তিনি রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজকে একসঙ্গে বসে বিষয়টি সমাধানের তাগিদ দেন।

এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ তানজীমউদ্দিন খান। তিনি বলেন, ‘এসবের আসল উদ্দেশ্য কি ক্যাম্পাসে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা আর নিজেদের দাপট বজায় রাখা?—এ প্রশ্নটা এখন তোলা দরকার।’

খাবার শুধুই খাবার নয়; এর সঙ্গে সংস্কৃতি, ধর্ম, ক্ষমতা ও সামাজিক সম্পর্ক জড়িয়ে আছে বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রেজওয়ানা করিম স্নিগ্ধা। তিনি বলেন, ‘যারা আজ গরুর মাংস খাওয়ার স্বাধীনতার দাবি তুলছেন, তারা কাল অন্য কোনো শিক্ষার্থীর শুকরের মাংস রান্নার অধিকার মেনে নেবেন তো? এখানে যুক্তির চেয়ে পরিচয়, সহনশীলতার চেয়ে দাপট আর নীতির চেয়ে দলীয় পরিচয় বড় হয়ে উঠছে।’

রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনমানসিকতা বদলায় না উল্লেখ করে তিনি সতর্ক করেন, ‘পুরোনো উগ্রতার জায়গায় নতুন উগ্রতা বসানো কোনো মুক্তচিন্তা হতে পারে না।’

তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের শিক্ষার্থী ও গরু জবাইয়ের আয়োজক রাহাত খান কোনো রাজনৈতিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যের কথা উড়িয়ে দেন।

গরু জবাইকে ইসলামের একমাত্র প্রতীক মানতে নারাজ রাহাত বলেন, ‘অধিকাংশ মুসলিম শিক্ষার্থীর ইচ্ছাকে সম্মান জানাতেই গরু জবাইয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর পেছনে কোনো রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা কারও ঈমান পরীক্ষার উদ্দেশ্য ছিল না।’