পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঘাইছড়ির সাজেক ভ্যালিতে অবরোধ এবং গোলাগুলির ঘটনার পেছনে রয়েছে মূলত আঞ্চলিক দলগুলোর আধিপত্য বিস্তার। পাহাড়ের দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) আধিপত্য-সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব। জেএসএসের কাছে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত কিছু এলাকা হারিয়ে কোণঠাসা অবস্থানে রয়েছে ইউপিডিএফ। এর জের ধরে বারবার বন্ধ হচ্ছে পর্যটনকেন্দ্র সাজেক।
ইউপিডিএফ-সমর্থিত সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশন সংগঠন দুটি বারবার অবরোধের ডাক দিচ্ছে সাজেকে। পূজার আগে এক দফা অবরোধ ছিল। দুর্গাপূজা শেষে গত বৃহস্পতিবার থেকে তারা অনির্দিষ্টকালের জন্য আবার অবরোধ ডাকে। তাদের দাবি, সাজেক থেকে জেএসএসের ‘সশস্ত্র গোষ্ঠী’কে বিতাড়িত করতে হবে। সেনাবাহিনীর কাছেও তারা এরই মধ্যে একই দাবি জানিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার সাজেক পর্যটন ভ্যালি থেকে প্রায় তিন হাজার পর্যটককে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে আসার সময় উজোবাজার এলাকায় সড়কে ব্যারিকেড দেওয়া হয়। এ সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও অবরোধকারীদের মধ্যে গুলি ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। তবে শুরু থেকে ইউপিডিএফ এ ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে আসছে। কিন্তু ইউপিডিএফ বিবৃতি দিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে দাবি করেছে, জেএসএস সন্ত্রাসীদের এলাকা থেকে হটাতে হবে।
রাঙামাটির পুলিশ সুপার মুহম্মদ রকিব হোসেনও দুই দলের আধিপত্য-সংক্রান্ত বিরোধকে এজন্য দায়ী বলে ইঙ্গিত করেছেন। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘অবরোধকারীরা তিন দফা দাবি দিয়েছে। ওই তিন দফা দেখলেই বোঝা যায় ইনটেশনটা কি। একটা দাবি রয়েছে, অন্য দলের সন্ত্রাসীদের সরে যেতে হবে।’
ঘটনার শুরু যেভাবে
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার সাজেক এবং আশপাশের এলাকায় আধিপত্য ছিল পার্বত্য চুক্তিবিরোধী দল ইউপিডিএফের। সেখানকার বিভিন্ন গ্রাম এবং পাড়ায় তাদের অবস্থান ছিল সুসংহত। অন্যদিকে চুক্তির পক্ষের দল জেএসএস এই এলাকার দু-একটি জায়গায় নিজেদের অবস্থান ধরে রেখেছিল।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে জেএসএস সাজেক ইউনিয়নের কয়েকটি জায়গায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত করে। ২৮ সেপ্টেম্বর তারা মাচালং বাজার ও বুয়াছড়ি এলাকা নিজেদের দখলে নেয়। এই এলাকাটি আগে ইউপিডিএফের মূল ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। দখল নেওয়ার সময় দুই পক্ষের মধ্যে গোলাগুলিও হয়।
ইউপিডিএফ নিজেদের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সাজেক-খাগড়াছড়ি সড়কের উজোবাজার এবং বাঘাইহাটের দিকে চলে যায়। সেখান থেকে তারা সাজেক ইউনিয়নের হারানো নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করে আসছে। এ কারণে গণঅধিকার রক্ষা কমিটি ও সাজেক কার্বারি অ্যাসোসিয়েশনের নামে বারবার অবরোধের ডাক দিচ্ছে।
সাজেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার বিষয়টি স্বীকার করেছেন জেএসএস কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সজীব চাকমা। তিনি আগামীর সময়কে জানালেন, দীর্ঘদিন ধরে সাজেক এবং বাঘাইহাট এলাকায় ইউপিডিএফ সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম করে আসছে। তারা অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, জেএসএস কর্মীদের হত্যার ঘটনা ঘটিয়েছে। ১৯-২০টি গ্রামের মানুষকে তারা বাজারে পর্যন্ত যেতে দিত না। এ কারণে অতিষ্ঠ হয়ে স্থানীয় লোকজন তাদের প্রতিরোধ করেছে। তারা পিছু হটে।’
অবরোধকারীদের তিন দফা দাবি
অবরোধ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে তারা তিনটি দাবিনামা দিয়েছে। এ ছাড়া লিখিতভাবেও সংগঠন দুটি একই দাবি উল্লেখ করেছে। অবরোধকারীদের তিন দফা দাবির মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, জেএসএস সন্ত্রাসীদের এলাকা থেকে বিতাড়িত করতে হবে।
এ ছাড়া সাজেকের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয় দাবি হচ্ছে, এলাকাবাসীর বাড়িঘরে তল্লাশি বন্ধ করতে হবে। অবরোধ চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক পাহাড়ি যুবক এই তিনটি দাবির কথা জানিয়েছেন। এ সময় একজন কর্মকর্তা তার এসব দাবির পরিপ্রেক্ষিতে তাৎক্ষণিক জবাব দেন। ওই কর্মকর্তা যুবকটিকে জানিয়েছেন, ‘বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আপনি কীভাবে জানেন আমরা অভিযান করছি না?’
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে ইউপিডিএফের মুখপাত্র অংগ্য মারমা বলেছেন, মূলত জেএসএস সন্তু গ্রুপের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সাজেক থেকে সরিয়ে নেওয়ার ন্যায্য দাবিতে সাজেকবাসী শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করছে। এটা বানচাল করার জন্য নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন দিকে গুলিবর্ষণ করেছেন।
অংগ্যা মারমা অবিলম্বে সাজেকবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের ন্যায্য দাবি মেনে নিয়ে ওই এলাকা থেকে জেএসএস সন্তু গ্রুপের সশস্ত্র সদস্যদের বিতাড়ন এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর-আইএসপিআর এক বিবৃতিতে বলেছে, বৃহস্পতিবার পর্যটকদের স্কট দিয়ে সাজেক থেকে খাগড়াছড়ি নিয়ে যাওয়ার পথে গঙ্গারাম এলাকায় ইউপিডিএফ সড়ক অবরোধ করে বাধা সৃষ্টি করে। এ সময় পর্যটক ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে সাজেক-বাঘাইহাট সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায় এবং সাজেকে বেড়াতে যাওয়া প্রায় তিন হাজার পর্যটক আটকা পড়েন।
পর্যটনের ক্ষতি
দুর্গাপূজার ছুটিতে তিন পার্বত্য জেলায় যখন পর্যটক উপচে পড়েছে, তখন সাজেক ভ্যালি বন্ধ রয়েছে। শীতকালের শুরুর এই সময়টাতে পাহাড়ে পর্যটক প্রতি বছরই বেশি থাকে। শনিবার পর্যন্ত সরকারি ছুটি থাকায় এখন ভরা মৌসুম চলছে।
কিন্তু সাজেকের প্রায় দেড়শ কটেজ এখন পর্যটকশূন্য। কটেজ ছাড়াও এখানে নানা ব্যবসা-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে। অনেকের রুটি-রুজি এখন এখানে। শুধু কটেজে দিনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ব্যবসা হয় বলে জানিয়েছেন কটেজ মালিক সমিতির সভাপতি ও রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য সুপর্ণ দেব বর্মণ।
সুপর্ণ দেব বর্মণ জানিয়েছেন, দিনে প্রায় তিন হাজার পর্যটক আমাদের এখানে থাকতে পারে। এখন ভরা মৌসুম। শীতের শুরু থেকে পর্যটকদের আনাগোনা বেশি থাকে। কিন্তু চলমান ঘটনায় এখন ব্যবসা নেই। সব মিলিয়ে দিনে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ব্যবসায় ক্ষতি হয়। অনেকে আগাম বুকিং বাতিল করেছেন। আমরা আশা করব দ্রুত এ সমস্যার সমাধান হবে।
এদিকে, আমাদের বাঘাইছড়ি (রাঙামাটি) প্রতিনিধি জানিয়েছেন, অবরোধের কারণে পর্যটনকেন্দ্র সাজেকের রিসোর্ট ও কটেজগুলো ফাঁকা পড়ে রয়েছে। রাঙামাটির জেলা প্রশাসক গত ২১ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাজেক পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকদের ভ্রমণ বন্ধ ঘোষণা করেন।
কটেজ অ্যান্ড রিসোর্ট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব সাজেকের সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমার ভাষ্য অনুযায়ী, পর্যটকদের আগমন বন্ধ থাকায় এ খাতের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সাজেকের পর্যটন ব্যবসা মূলত মৌসুমনির্ভর। বছরের অধিকাংশ সময়ের তুলনায় শীত মৌসুমেই তাদের মূল ব্যবসা হয়।
সাজেক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তোফাজ্জল হোসেন জানিয়েছেন, এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। শুক্রবার নতুন করে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক রয়েছে।
প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন বাঘাইছড়ি (রাঙামাটি) প্রতিনিধি।