Image description

প্রায় দুই বছর ধরে আহ্বায়ক কমিটি দিয়ে চলছিল ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির কার্যক্রম। ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর রফিকুল ইসলাম মজনুকে আহ্বায়ক ও তানভীর আহমেদ রবিনকে সদস্য সচিব করে ৬১ বিশিষ্ট ঢাকা মহানগর দক্ষিণ এবং একই বছরের ৪ নভেম্বর আমিনুল হককে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে ৫১ সদস্যের ঢাকা মহানগর উত্তর আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। তখন দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল; এটি আপদকালীন কমিটি। শিগিগরই নির্বাচিত পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হবে। কিন্তু তা কবে চূড়ান্ত হবে, এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনও তৎপরতা নেই।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের কমিটির মেয়াদ সাধারণত দুই বছর। যদিও দলীয় হাইকমান্ড বিশেষ প্রয়োজনে আহ্বায়ক কমিটি গঠন বা আগের কমিটি বিলুপ্ত করে নতুন কমিটি গঠন করতে পারেন।

এর মধ্যে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবায় ভাঙচুরের ঘটনায় কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার দায়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বর্তমানে এ উত্তর বিএনপি অনেকটাই অভিভাবকহীন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক নেতা মনে করেন, রাজধানীর একাংশে দল এভাবে বেশিদিন চললে নেতাকর্মীদের মধ্যে নিষ্ক্রিয়ভাব চলে আসতে পারে। আবার দক্ষিণের আহ্বায়ক কমিটি নিয়েও অনেকে হতাশা প্রকাশ করেছেন। দুই বছরেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের তৎপরতা না থাকায় এমনটি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির এক যুগ্ম আহ্বায়ক জানান, অতীতে যেকোনও আন্দোলন-সংগ্রামে রাজপথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ও উত্তর বিএনপি। কিন্তু দীর্ঘ দিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি না থাকায় কিছুটা স্থবিরতা চলে আসতে পারে। তিনি জানান, দলের সপ্তম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই এই উত্তর ও দক্ষিণে নির্বাচিত কমিটি আসতে পারে। সে লক্ষ্যেই অভ্যন্তরীণভাবে নেতৃত্ব বাছাই হচ্ছে। এক্ষেত্রে বিগত দিনে আহ্বায়ক কমিটির নেতৃত্বে থাকা নেতারাই মূল দায়িত্বে আসতে পারেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। এক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন তরুণ নেতারা। আবার বর্তমান কমিটির বাইরেও নতুন মুখও দেখা যেতে পারে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সম্ভাব্য কমিটি গঠনকে ঘিরে দুই মহানগরের বেশকিছু নেতা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। অনেকেই আগের চেয়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে তৎপরতা বাড়িয়ে দিয়েছেন। আবার কেউ কেউ কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের কাছে নিজের পক্ষে লবিং করছেন।  

 

কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই সুখবর আসতে পারে

দলীয় সূত্র জানায়, সাংগঠনিকভাবে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ শাখাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন বিএনপির হাইকমান্ড। এরই অংশ হিসেবে দুই কমিটি শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যন্ত ঢেলে সাজানো হচ্ছে। এ বিষয়টি স্বয়ং তদারকি করছেন দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অতীতের যেকোনও সময়ের চেয়ে এবারের পূর্ণাঙ্গ কমিটি হবে শক্তিশালী, এমনটি প্রত্যাশা সূত্রটির।

মহানগর উত্তরের বিলুপ্ত আহ্বায়ক কমিটির এক যুগ্ম আহ্বায়ক নাম প্রকাশ না করে জানান, নানা সীমাবদ্ধতার কারণে বিগত দিনে মূল কমিটি দিতে পারেনি বিএনপি। তবে দলের আসন্ন সপ্তম কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের আগেই ঘোষণা করা হতে পারে, ঢাকার দুই সিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি।

অভিভাবকহীন উত্তরের হালচাল

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পর ৪ নভেম্বর আমিনুল হককে আহ্বায়ক ও মোস্তফা জামানকে সদস্য সচিব করে ৫১ সদস্যের ঢাকা মহানগর উত্তর আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে মিরপুরের রাড্ডা স্বাস্থ্যসেবায় ভাঙচুরের ঘটনা কতিপয় নেতার সংশ্লিষ্টতার দায়ে গত ২৬ সেপ্টেম্বর মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করা হয়েছে। বর্তমানে সেখানে নেতৃত্বশূন্যতা বিরাজ করছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা উত্তরে পূর্ণাঙ্গ কমিটির শীর্ষ পদে স্থান পেতে একাধিক নেতা দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন। অনেকে হাইকমান্ডের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন। বিলুপ্ত আহ্বায়ক কমিটিতে থাকা নেতারাও আছেন এ তালিকায়।

এক্ষেত্রে সভাপতি পদে জোরেশোরে উচ্চারিত হচ্ছে বেশ কয়েকটি নাম। তারা হলেন, সাবেক আহ্বায়ক ও বর্তমান ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক। ঢাকা-১৮ আসনের এমপি এস এম জাহাঙ্গীর, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার। এলাকায় তিনি ‘কাউন্সিলর আনোয়ার’ নামে পরিচিত। এছাড়া সাবেক ছাত্রনেতা মামুন হাসান এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরশেনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক শফিকুল ইসলাম মিল্টনের নামও সামনে আসছে।

অন্যদিকে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় আছেন, মহানগর উত্তরের বর্তমান সদস্যসচিব মোস্তফা জামান ও ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক এম কফিল উদ্দিন আহমেদ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সদ্য বিলুপ্ত কমিটির এক নম্বর সদস্য আনোয়ারুজ্জামান আনোয়ার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি বিগত দিনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন। তাই নতুন কমিটিতে শীর্ষ পদে স্থান পাবেন বলে আশাবাদী। তার দাবি, বিলুপ্ত কমিটিতেই যোগ্য নেতৃত্ব রয়েছে। সদ্য বিলুপ্ত কমিটির আহ্বায়ক আমিনুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তিনিও একজন প্রার্থী।

বিগত দিনে আমিনুল হকের দায়িত্বশীল ভূমিকারও প্রশংসা করেন আনোয়ারুজ্জামান। তিনি বলেন, নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রতি আস্থা রাখতে চাই। তিনি যেখানে রাখবেন অতীতের মতো সেখানে থেকেই দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ ভূমিকা পালন করবো।

তবে এ বিষয়ে অন্য নেতারা নাম প্রকাশ করে মন্তব্য করতে রাজি হননি। তারা শীর্ষ নেতাদের সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন বলে জানান।

মহানগর দক্ষিণে কারা আলোচনায়?

২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর রফিকুল ইসলাম মজনুকে আহ্বায়ক ও তানভীর আহমেদ রবিনকে সদস্য সচিব করে ৬১ সদস্যের ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়। আগামী ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে এ কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা। তাই সম্ভাব্য পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে কাঙ্ক্ষিত পদ পেতে সংশ্লিষ্ট নেতারা তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন।

সূত্রমতে, বর্তমান আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু ও সদস্য সচিব তানভীর আহমেদ রবিন, যুগ্ম-আহ্বায়ক লিটন মাহমুদ, যুবদলের সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না এবং বিএনপি নেতা কাজী আবুল বাশারসহ আরও কয়েকজন সভাপতি পদে আলোচনায় রয়েছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক লিটন মাহমুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, তিনি বিএনপিকে নিজের আদর্শ হিসেবে লালন করেন। তাই পদ-পদবীকে কখনই বড় করে দেখতে চান না। তবে বিগত দিনের দায়িত্বশীল ভূমিকার কারণে দল হয়তো তাকে সঠিক মূল্যায়ন করবে বলে মনে করেন তিনি।

এ বিষয়ে মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল ইসলাম মজনুর সঙ্গে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

নেতাদের আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর হাতে

ঢাকা মাহানগর উত্তর ও দক্ষিণের পূর্ণাঙ্গ কমিটি শিগগিরই প্রকাশ হবে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে যোগ্য ও ত্যাগীদের ম্যূল্যায়ন করা হবে। বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, আগামী দিনে বিরোধী দলের আন্দোলনসহ যেকোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি মোকাবিলায় ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণকে চালকের আসনে রাখতে চান দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাই কোনও বিতর্কিত ব্যক্তিকে কমিটিতে স্থান দেওয়া হবে না। এ জন্য এ বিষয়টি সরাসরি তিনি তদারকি করছেন। 

এর অংশ গত ৯ মে কেন্দ্রীয় বিএনপিসহ বিভিন্ন সাংগঠনিক ইউনিটের প্রায় ৯০০ শীর্ষ নেতার সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এতে ঢাকাসহ সারা দেশের সব ইউনিটে ক্লিন ইমেজধারী যোগ্য নেতৃত্ব বাছাইয়েরে ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়।

বিশেষ করে ঢাকার দুই সিটির বর্তমান কমিটির পাশাপাশি নতুন মুখ আনার চিন্তাও রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য পদপ্রত্যাশীরা নিজেদের সাংগঠনিক দক্ষতা, আন্দোলন-সংগ্রামে ভূমিকা ও ত্যাগের বিবরণ তুলে ধরে কেন্দ্রীয় নেতাদের কাছে ধরনা দিচ্ছেন। কেউ কেউ আবার বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে তারেক রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমান উল্লাহ আমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক শক্তি। তাই এবার যোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করতে চান দলীয় হাইকমান্ড। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য নেতাদের আমলনামা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। তিনিই যোগ্য প্রার্থী বাছাই করবেন।’