Image description

চলচ্চিত্র নির্মাতা ও অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী ও অভিনেত্রী নুসরাত ইমরোজ তিশার সংসার ভাঙার ভুয়া দাবিটি এবার স্থান পেয়েছে মূল ধারার গণমাধ্যমের সংবাদে।

বৃহস্পতিবার রাত ৮টা ৪২ মিনিটে চ্যানেল-২৪ “বিচ্ছেদের পথে ফারুকী-তিশা, দুজনে আছেন আলাদা” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে।

একইদিন রাত ১২টায় কালেরকণ্ঠ “ভাঙনের মুখে তিশা ফারুকির ১৬ বছরের সংসার!” শিরোনামে একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করে। আজ শুক্রবার ‘সংসারে ভাঙনের সুর, যা জানালেন ফারুকী’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করে সময় টেলিভিশন।

এমন শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে নিউজ নাও-২৪, জুম বাংলা ও ওটিএন বাংলা।

গুজবের উৎস আওয়ামীপন্থী পেইজ

গত ৫ অক্টোবর ‘ইনফো বাংলা’ নামের একটি পেজ থেকে প্রথম ফারুকী ও তিশার সংসার ভাঙার দাবি করা হয়। যার শিরোনাম দেওয়া হয়, “অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি বিক্রি নিয়ে দ্বন্দ্ব : ভাঙল ফারুকী-তিশার সংসার”।

ইনফো বাংলা পেইজ থেকে দাবিটি পোস্ট করার পর আওয়ামী পন্থী অনলাইন একটিভিস্টরাও এটি ব্যাপক ভাবে ছড়িয়ে দেন।

ইনফো বাংলা দাবি করে অস্ট্রেলিয়ায় তিশার নামে থাকা বাড়ি বিক্রিকে কেন্দ্র করে মনোমালিন্যের সূত্রপাত হয়। আর মনোমালিন্য থেকে তা ডিভোর্সের দিকে গড়ায়। ফারুকী ও তিশা আলাদা জীবন যাপন করছেন বলেও দাবি করে পেইজটি।

৫ অক্টোবর এ বেঙ্গল লেন্স ফ্যাক্টচেক করে দেখায় দাবিটি সত্য ছিলো না। বেঙ্গল লেন্সে প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে।

বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে দেখেছে, ইনফো বাংলার দাবি করা ভুয়া তথ্যগুলোই প্রায় হুবহু নতুন করে উঠে এসেছে মূল ধারার সংবাদমাধ্যমের খবরে।

চ্যানেল টোয়েন্টিফোর তাদের প্রকাশিত খবরে সূত্র উল্লেখ করতে গিয়ে বলে, “বিচ্ছেদের পথে তারকা দম্পতি মোস্তফা সরওয়ার ফারুকী-নুসরাত ইমরোজ তিশা। দেড়মাসের বেশি আলাদা আছেন দু'জন। এমনটাই বলছেন তাদের ঘনিষ্ঠজনরা।”

ইনফো বাংলাও তাদের দাবির সূত্র হিসেবে ঘনিষ্ঠজনদের উল্লেখ করেছে।

চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের খবরে বিচ্ছেদের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি বিক্রি নিয়ে মনোমালিন্য। ইনফো বাংলাও কারণ হিসেবে এটিই উল্লেখ করেছিল।

সময় নিউজের খবরেও কারণ হিসেবে ‘অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি বিক্রি নিয়ে মনোমালিন্য’ উল্লেখ করা হয়েছে।

সবগুলো খবরের সূত্রই ‘ঘনিষ্ঠজন’, ‘জানা গেছে’, ‘শোনা যায়’, ‘গুঞ্জন আছে’ ইত্যাদি।

বেঙ্গল লেন্স যাচাই করে দেখেছে, ইনফো বাংলা মূলত একটি আওয়ামী প্রোপাগাণ্ডা পেইজ। এই পেইজ থেকে প্রায়শই আওয়ামী লীগ বিরোধী ও জুলাই অভ্যুত্থান সমর্থকদের নিয়ে অপতথ্য ছড়ানো হয়। একাধিক ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান ইতিপূর্বে ইনফো বাংলার ছড়ানো অপতথ্য শনাক্ত করেছে।

অনুমানে প্রতিবেদন করে চ্যানেল-২৪

ফারুকী-তিশার বিচ্ছেদ নিয়ে প্রকাশিত খবরের সূত্র কী তা জানতে চাইলে চ্যানেল-২৪ বিনোদন ডেস্ক ইনচার্জ নাজমুল আলম রানা বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “এটা হচ্ছে উনার যে কাছের মানুষজন, মূলত তাদের কাছ থেকে শোনা। এবং তাদের বর্তমান অ্যাক্টিভিটিস থেকে অনুমান করেই আসলে প্রতিবেদনটি করা এটা হয়েছে। আপনি যদি তাদের সম্পর্কে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন, তাদের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন, তাদের আশপাশে থাকেন কিংবা মানে এই অনেকগুলো নিউজ আসলে নিকেতন পাড়ায় থাকে।

তিনি আরও বলেন, ‘আর কিছু বিষয় থাকে এগুলি আসলে আমি স্ক্রিপ্টে করতে পারি না। তিশার কিছু বিষয় আমি জানি। সাম্প্রতিক কিছু বিষয় আমি শেয়ারও করেছি কোথাও কোথাও।

তিশা ও ফারুকীর সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে নাজমুল আলম বলেন, “করেছি কিন্তু তারা এটা নিয়ে কথা বলতে চায় না। আজকে সময় টিভি থেকে তাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তিনি একটা মন্তব্য করেছেন যে অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে আমি মন্তব্য করতে চাই না।”

বিচ্ছেদের ইস্যুটি প্রথম সামনে এনেছিল আওয়ামীপন্থী প্রোপাগান্ডা পেইজ ইনফো বাংলা এবং একাধিক ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠান বিষয়টি নিয়ে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে –নাজমুল আলমকে তথ্যটি জানালে তিনি বলেন, “আমি কোনো ইনফো বাংলা দেখে কিছু করিনি। আমি তথ্য প্রমাণ নিয়েই করেছি। হ্যাঁ, এখানে তারা দুইজনে কেউ ইস্যু নিয়ে কথা বলতে চায় না বলেই তাদের বক্তব্য নেই। আমরা যে রিপোর্টটা করেছি এটা আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি ১০০% সঠিক।”

অস্ট্রেলিয়ার বাড়ি নিয়ে দ্বন্দ্বের বিষয়ে কোনো প্রমাণ পাওয়া গেছে কি-না জানতে চাইলে নাজমুল বলেন, “তাদের সম্পর্ক ভাঙনের বড় কারণ হচ্ছে মতের অমিল। আর অস্ট্রেলিয়ার বাড়িটা কেন্দ্র করে হতে পারে।”

ফারুকীর চ্যালেঞ্জ

এদিকে পুরোনো গুজব নতুন করে আবার সংবাদ মাধ্যমে স্থান পাওয়া প্রসঙ্গে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বেঙ্গল লেন্সকে বলেন, “আমি এই একটা বিষয়ে বলতে বলতে ক্লান্ত। কয়দিন পর পর একই ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে। অথচ এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ফ্যাক্টচেক করেছে। এসব বিষয় খোঁজখবর নিতে তো খুব বেশিকিছু করতে হয় না। আমার বাসা বনানীতে। বাসার দারোয়ান বা আমার ড্রাইভারকে জিজ্ঞেস করলেও তো জানা যায় যে, আমরা দেড় মাস ধরে আলাদা আছি কি-না? এছাড়া আমার অস্ট্রেলিয়ায় বাড়ি থাকলে সেটা কোন জায়গায় আছে খোঁজ নিয়ে উল্লেখ করুক না, দেখবেন কিছুই নাই সংবাদে।”

সংবাদ প্রকাশকারী মিডিয়া সম্পর্কে ফারুকী বেঙ বলেন, “যেই চ্যানেল-২৪, কালেরকণ্ঠকে আপনি মূলধারার সংবাদ মাধ্যম বলছেন, আমি তো তাদেরকে মূলধারা মনে করি না। কারন, মূল ধারার গণমাধ্যম হলে তো তারা আমার সঙ্গে কথা বলতো।”

তিনি আরও আরও বলেন, “এসব কর্মকাণ্ডের ফলে দিনদিন মানুষ গণমাধ্যমের ওপর থেকে আস্থা হারাচ্ছে। তারা এসব করছে আওয়ামী প্রেসক্রিপশনে। অন্যথায় এই ঘটনায় এতগুলো ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন হলো, তারা নিশ্চয়ই সেগুলো দেখেছে। তাহলে এরপরও কেন করলো এই কাজ? কারণ, ওই যে উপর থেকে সিগনাল পেয়েছে, তাই এখন চরিত্রহনন করতে হবে তাদের। আমার বিরুদ্ধে এই কাজগুলো গণমাধ্যম গত ছয় মাস ধরেই করছে। কিন্তু যখন সত্যটা সামনে আসে, তখন কাউকে আর ক্ষমা চাইতে দেখবেন না। এটাই এখন মিডিয়ার অবস্থা।”