Image description

কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর হত্যাকাণ্ডের নতুন করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের পর ঘটনাস্থল থেকে জনতার হাতে আটক হওয়া মো. হেলালের সঙ্গে জাহাঙ্গীরের স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরীর ৯ মিনিট ১৮ সেকেন্ডের একটি ফোনালাপকে কেন্দ্র করে সামনে এসেছে নতুন কিছু অভিযোগ।

আটক মো. হেলাল বরগুনার বামনা উপজেলার চালিতাবুনিয়া এলাকার মৃত সুলতানের ছেলে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরপরই তাকে ঘটনাস্থল থেকে আটক করেন স্থানীয় জনতা। তারপর থেকে হেলাল কারাগারে রয়েছেন।

প্রতিবেদকের হাতে আসা ফোনালাপের বর্ণনা অনুযায়ী, জাহাঙ্গীরকে হত্যার উদ্দেশ্যে নয়, বরং তার হাত কেটে ফেলার জন্য ভাড়া করা হয়েছিল বলে দাবি করেন ফোনালাপের অন্য প্রান্তে থাকা হেলাল। এ কাজের জন্য জাহাঙ্গীরের ছোট ভাই আলমগীর শিকদার তাদের ভাড়া করেছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়।

অপর প্রান্তে থেকে হেলাল বলেন, ‘যখন আলমগীর শিকদার ভাড়া করে তখন তাদের কাছে বলা হয় যেভাবেই হোক তার (জাহাঙ্গীর) একটা হাত কেটে ফেলতে হবে, এতে যদি মারা যায় তাহলে মারা যাক।’

তারা পেশাদার খুনি নন বলেও ফোনালাপে জাহাঙ্গীরের স্ত্রীকে খুনি হেলাল বলতে শোনা যায়।

চুরি, ছিনতাই ও মাদকাসক্তির সঙ্গে জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, টাকার লোভে পড়েই তারা এ কাজে জড়িয়েছেন। জাহাঙ্গীর মারা যাবে এটা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না।

হেলাল আরও বলেন, আমার একজন বন্ধু আছে রিয়াজ তার সঙ্গে খোকা ভাইয়ের মাধ্যমে কথা বলে আলমগীর।

রেকর্ডে আরও শোনা যায়, পরশুদিন জেলে খোকা ভাই আসছিলো তখন আমাদের কে খুব গালাগাল করে, তোরা আলমগীর ভাইয়ের নাম কেন বলতে গেলি, কে এখন তোদের বাঁচাবে‌। আমাদের নিষেধ ছিল তার (আলমগীর) নাম বলা যাবে না, তাহলে আমাদের জামিন করাবে কে।

আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে বলেছি এই কাজ করিয়েছে আলমগীর, এই নাম (আলমগীর) বললে আমাদের বেশি বেশি মারে। আরেকটা কথা শোনেন, কয়েকদিনের মধ্যেই খোকাকে রিমান্ডে নিবে কিন্তু আলমগীর এর নাম বলবে না।

ওরা আর একটা গেইম করতেছে। বিশ্বাস করেন আমি তার (খোকা) এর মাধ্যমে আসছি কিন্তু খোকা আলমগীর ভাইয়ের জন্য আমাদের নিয়ে আসছে‌। আর একটা কথা অনেক মানুষ ফাও ফাও ফেঁসে গেছে, উনারা আমাদের চিনতো না।

এ পাশ থেকে নিহত জাহাঙ্গীরের স্ত্রী প্রশ্ন করেন, তোমাকে কি জেল থেকে নিয়ে আসছে? উত্তরে খুনি হেলাল বলে ‘না না, আমি জেল থেকে আসি নাই। আমি ঢাকা থেকে আসছি। মিঠামইনে আমি ১৫-২০ দিন ছিলাম তারপর সব কিছু বুঝেছি কে করাচ্ছে; কে আনছে, কে টাকা দিয়েছে। আলমগীর ভাইয়ের একজন লোক ছিল সে আমাদের খাওয়া দাওয়ার টাকা দিত, লোকটার নাম মনে নাই কিন্তু লম্বা, কালো ছিল। সে অন্য এলাকার মেম্বার। রিয়াজের সঙ্গে আলমগীরের সরাসরি কথা হতো।

তাসলিমা আক্তার চৌধুরী জানান, এলাকার একজনের মাধ্যমে আমার কাছে খবর আসে যে- একজন আমার সঙ্গে জেল থেকে কথা বলবে, সে ভাড়াটিয়া খুনি হেলাল। তারপরও কথা হয়, সে কিভাবে আসছে, কে আনছে সব কিছু বলে। আলমগীর ভাড়া করে এনেছে এটা বলেছে। প্রায় ১০-১১ দিন আগে খুনি জেল থেকে ফোন দিয়েছিল।

এইসব শোনার পর তাদের পারিবারিক মতামত কি এই প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, আলমগীর যে এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে এটা আমরা সবাই আগ থেকেই সন্দেহ করেছি। সবাই এই হত্যাকাণ্ডের সঠিক বিচার চাচ্ছে।

আলমগীর শিকদারের সঙ্গে কি আপনাদের যোগাযোগ আছে এই প্রশ্নের জবাবে তাসলিমা বলেন, না, আমাদের কোনো যোগাযোগ নাই। কোথায় আছে জানি না।

তাসলিমা আক্তার জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সবার শাস্তি দাবিতে শনিবার বিক্ষোভ মিছিল করবে মিঠামইনবাসী।

বিভিন্ন সূত্র এবং আলমগীর শিকদারের ফেসবুক আইডি থেকে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ ধরে আলমগীর শিকদার দেশের বাইরে সুইজারল্যান্ড আছেন। তার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, এইগুলো ভিত্তিহীন। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। যে ছেলের ১৬৪ হয়েছে অনেকদিন আগে তার বক্তব্য এখন কিভাবে আসে। আমি জড়িত থাকলে আইনে ধরলো না কেন। আমি এখন দেশের বাইরে আছি আবার দেশে আসব।

তিনি আরও জানান, যে ছেলে কথা বলেছে সে তো আমার নাম তো বলে নাই, খোকার নাম বলেছে তাহলে খোকা বলুক আমার নাম, আমি জড়িত। আমার ভাই এর বউ আওয়ামী লীগ পরিবারের সন্তান সে তো এখন আওয়ামী লীগের টান টানবেই। আমার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন করবে আমিও দেশে এসে সংবাদ সম্মেলন করব।

মিঠামইন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মনোয়ার মোহাম্মদ জানান, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে এ পর্যন্ত ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটা ডিবিতে তদন্তের জন্য হস্তান্তর করা হয়েছে।

অষ্টগ্রাম সার্কেল সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. দিদারুল ইসলাম জানান, অন্য একজনের মাধ্যমে ফোনালাপ সম্পর্কে শুনেছি। এখনও রেকর্ডটা শুনিনি। আমি এই বিষয়ে ডিবিতে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলব।

উল্লেখ্য, গত ১৫ জুলাই দিবাগত রাতে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীরকে নিজ বাড়ির সামনে নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়েছিল ভাড়াটিয়া খুনিরা। ১৮ জুলাই নিহত বিএনপি নেতা জাহাঙ্গীর এর স্ত্রী তাসলিমা আক্তার চৌধুরী বাদী হয়ে ৩ জনকে আসামি করে মিঠামইন থানায় মামলা দায়ের করেন। জাহিদুল আলম জাহাঙ্গীর দীর্ঘদিন ধরে মিঠামইন উপজেলা বিএনপির সভাপতি দায়িত্ব পালন করেছিল।

কালবেলা