Image description

আজ ২২ অক্টোবর শহীদ শরিফ ওসমান হাদির ৬ষ্ঠ বিবাহবার্ষিকী। ৬ বছর আগে ২০২০ সালের এ দিনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ এই লড়াকু। আততায়ীর গুলিতে শাহাদাতবরণের পর প্রথম বিবাহবার্ষিকী এটি।

বৃহস্পতিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে এক পোস্টে বিবাহবার্ষিকীর কথা স্মরণ করেছেন ওসমান হাদির বড় বোন মাসুমা হাদি। তিনি বিয়ের একটি ছবি যুক্ত করে লিখেছেন, ‘আজ ৬ বছর পূর্ণ হলো আমাদের ওসমান গনির বিয়ের। মায়ের নামাজের চৌকি সাজানো হয়েছে। ওসমান গনির বিয়ের হলুদ সন্ধ্যার মঞ্চ। তিন দুলাভাইয়র সাথে মায়ের নামাজের চৌকিতে আমাদের ছোট্ট পাখিটা।’

এদিকে শহীদজায়া রাবেয়া ইসলাম শম্পা জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিসৌধের পাশে শরিফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের দুটি ছবি ফেসবুকে শেয়ার করেছেন। পোস্টের ক্যাপশনে তিনি দুয়া করে লিখেছেন, ‘হে আল্লাহ, আপনি আমাকে এবং আমার পূর্ববর্তী সকলকে ক্ষমা করুন।’

কবর জিয়ারতকালে একটি অলকানন্দা এবং হাসনাহেনা ফুল নিয়ে যান রাবেয়া ইসলাম শম্পা। সাথে ছিল এক কাপ দুধ চা। ওই ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছেন, ‘আপনি, আমি এবং এক কাপ চা।’

এ ঘটনায় স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েছেন হাদির সহযোদ্ধা, সহকর্মী ও অনুরক্তরা। রাবেয়া ইসলাম শম্পার পোস্টটি শেয়ার করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) কার্যনির্বাহী সদস্য উম্মা উসওয়াতুন রাফি লিখেছেন, ‘এমন বেদনার্ত বিবাহ বার্ষিকী কোনো দম্পতির জীবনে না আসুক।’

কলেজ খুঁজুন

 

তরিক হোসাইন বাপ্পি নামে একজন ছবির নিচে কমেন্ট করেছেন, ‘হাদি ভাই প্রচুর চা খাইতো, ভাইয়ের সাথে থাকা অবস্থায় চায়ের অভ্যাসটা হয়েছে, এখন প্রতিদিন চায়ের কাপ হাতে নিলে ভাইয়ের কথাটায় সবার আগে মনে হয়।’

উল্লেখ্য, শরিফ ওসমান বিন হাদি জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব। ১৯৯৩ সালের ১ জানুয়ারি ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক ধর্মীয় পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মাওলানা আব্দুল হাদি ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ৬ ভাইবোনের মধ্যে সবার ছোট হাদি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসা থেকে আলিম সম্পন্ন করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন বিবাহিত এবং হাদিউল ফিরনাস নামে তাঁর একটি একমাত্র পুত্রসন্তান রয়েছে।

শিক্ষকতা এবং কোচিং সেন্টারে পাঠদানের মাধ্যমে জীবনসংগ্রাম পরিচালনা করা ওসমান হাদি ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে রামপুরা এলাকার সমন্বয়ক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা রেখে পাদপ্রদীপে আসেন। পরবর্তী সময়ে জুলাইয়ের শহীদদের অধিকার রক্ষা, আওয়ামী লীগকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ করার দাবি এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী অনমনীয় অবস্থানের কারণে তিনি সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।

তবে এর আগেও সক্রিয় ছিলেন ওসমান হাদি। আওয়ামী লীগের সময়ে তিনি ‘সীমান্ত শরিফ’ ছদ্মনামে কবিতা লিখতেন এবং ২০২৪ সালের অমর একুশে বইমেলায় তাঁর ‘লাভায় লালশাক পুবের আকাশ’ নামে একটি আলোচিত কাব্যগ্রন্থও প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া বিভিন্ন সময় হাসিনাবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিল তাঁর সরব উপস্থিতি।

২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করে তিনি যখন তাঁর নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন, ঠিক তখনই তাঁর ওপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসার খড়্গ নেমে আসে। ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর জুমার নামাজ শেষে রাজধানীর পল্টনের বিজয়নগর বক্স কালভার্ট এলাকায় রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরবাইকে আসা মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা হাদির মাথা লক্ষ্য করে পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে গুলি চালায়। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে তাঁকে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়, যেখানে টানা ৬ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।

হাদির এই নির্মম হত্যাকাণ্ড পুরো বাংলাদেশে নজিরবিহীন গণবিক্ষোভের জন্ম দেয়, যার ফলে তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দেশে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করতে বাধ্য হয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধিস্থলের পাশে তাঁকে সমাহিত করা হয়।

হত্যাকাণ্ডের পর ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে পল্টন থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, যা পরবর্তীতে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয় এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেয়। এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে সুনির্দিষ্টভাবে ‘ভারতের সংযোগের’ জোরালো অভিযোগ ওঠে, কারণ হাদি শুরু থেকেই ভারতের নীতি ও আধিপত্যের কড়া সমালোচক ছিলেন এবং হত্যার আগে একাধিকবার ভারতীয় ও আওয়ামী লীগ ঘরানার পক্ষ থেকে মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন বলে তাঁর পরিবার দাবি করে।

এ ছাড়া হাদিকে গুলি করার পরপরই মূল শুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার সহযোগী আলমগীর হোসেন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট এবং মেঘালয় সীমান্ত ব্যবহার করে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে আশ্রয় নেয়। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ৮ মার্চ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে ভারতের বিশেষ টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) এই দুই মূল আসামিকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে এ বছরের ২ জুন কলকাতার ওয়াই-চ্যানেলে এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার সময় পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সরাসরি ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের দিকে আঙুল তোলেন।

তিনি জনসমক্ষে দাবি করে বলেন, বিশেষ টাস্ক ফোর্স যখন সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে ঢুকে পড়া হাদির মূল হত্যাকারীদের গ্রেপ্তার করে, তখন ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ স্বয়ং তাকে ফোন করে এই আসামিদের গ্রেপ্তারের খবর ও আসল পরিচয় সম্পূর্ণ গোপন রাখার জন্য চাপ প্রয়োগ করেছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই হত্যাকাণ্ডের মূল কুশীলব ও পরিকল্পনাকারীদের নাম তিনি খুব ভালো করেই জানেন, কিন্তু জাতীয় সৌজন্যতার খাতিরে তা মুখে আনছেন না; কারণ সেই সুনির্দিষ্ট নাম ও পরিচয় যদি তিনি এখন প্রকাশ করে দেন, তবে ওপারে পুরো বাংলাদেশ নজিরবিহীনভাবে উত্তাল হয়ে উঠবে। একই সাথে তিনি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রতি প্রশ্ন ছুড়ে দেন যে, বাংলাদেশে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানোর জন্য আসলে কাকে সুপারি বা চুক্তি দেওয়া হয়েছিল?