সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি নাগরিক নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার হানিমুনে ওমরাহ পালন করতে গিয়েছিলেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া তথ্য ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছে নজরুলের পরিবার। নজরুলের মা রহিমা বেগমের দাবি, সুইটি আক্তার তার পুত্রবধূ ছিলেন না। তার ছেলে অবিবাহিত ছিলেন। ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা প্রচারণা তাদের আরও বিপর্যস্ত করে তুলেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সম্প্রতি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন পোস্টে দাবি করা হয়, নজরুল ও সুইটি নবদম্পতি ছিলেন। হানিমুনে ওমরাহ পালন করতে সৌদি আরবে যান। সেখানে স্ত্রীর কপালে চুমু দেওয়ার অপরাধে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে বলেও প্রচার করা হয়। তবে এসব দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি।
নজরুলের পরিবারের অভিযোগ, তাদের সন্তান ষড়যন্ত্রের শিকার। নজরুল নিজের পক্ষে কথা বলার সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা পেয়েছিলেন কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।
নজরুলের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামে। চার সন্তানের মধ্যে তিনি সবার বড়। বাবার নাম আব্দুল বাছির। পরিবারের অভাব দূর করতে ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর ঢাকার একটি রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে সৌদি পাড়ি জমান তিনি। একপর্যায়ে মক্কা নগরীতে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, সৌদিতে যাওয়ার পর নিয়মিত বাড়িতে ফোন করতেন নজরুল। তবে প্রায় ছয় মাস পর হঠাৎ তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এক মাস তার কোনো খোঁজ না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবার। পরে ফোন করে নজরুল জানান, তিনি কারাগারে আছেন। তবে কী কারণে তাকে আটক করা হয়েছে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি তিনি।
নজরুলের মা রহিমা বেগম বলেন, ‘এক মাস তার কোনো খোঁজ পাইনি। পরে একদিন ফোন করে জানায়, সে জেলে। কাজের জন্য বের হওয়ার সময় পুলিশ তাকে জিজ্ঞেস করে, সে নজরুল কি না। এরপর তাকে ধরে নিয়ে যায়। কিন্তু কী অপরাধে তাকে আটক করা হয়েছে, তা পুলিশ জানায়নি।’
সুইটি আক্তারের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও নাকচ করেন রহিমা বেগম। বলেন, ‘আমার ছেলে বিয়ে করেনি। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর শুনছি, একটি মেয়ের সঙ্গে অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে তার সাজা হয়েছে। কিন্তু ওই মেয়েকে আমরা চিনি না। নজরুলও কখনো তার কথা আমাদের বলেনি। বিয়ে করলে আমরা অবশ্যই জানতাম।’
ছেলের ভাষাগত সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘নজরুল আরবি ভাষা বুঝত না। ফলে নিজেকে নির্দোষ হিসেবে যথাযথভাবে তুলে ধরতে পেরেছিল কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে।’
রহিমা বেগমের অভিযোগ, সৌদির বাংলাদেশের দূতাবাস থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি। কীভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে আইনি সহায়তা চাইতে হয়, তা-ও তারা বুঝতে পারেননি।
ছেলের মৃত্যুর আগে পরিবারটি যে আশা নিয়ে দিন গুনছিল, তা এখন হাহাকারে পরিণত হয়েছে। ‘আমরা ভেবেছি, তিন বছরের বেশি সময় ধরে জেলে আছে। হয়তো পাঁচ বছরের সাজা হয়েছে, পাঁচ বছর পর ছেড়ে দেবে। আমি তো জানতাম না, আমার ছেলে এভাবে বুক খালি করে চলে যাবে। এখন আমি আমার ছেলের লাশটা চাই। শেষবারের মতো লাশটা ছুঁয়ে দেখতে চাই’, যোগ করেন তিনি।
মক্কা নগরীর একটি মসজিদ কম্পাউন্ডে অনৈতিক কার্যকলাপের অভিযোগে গত ১৪ অক্টোবর নজরুল ও সুইটির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর শুনে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ওই দিন রাতেই মারা যায় তার ফুফু আবেদা বেগম।