শেষ মুহূর্তে ভেস্তে যাচ্ছে হেফাজতে ইসলামের উদ্যোগে কওমি ঘরানার ইসলামি সাত দলের জোট গঠনের প্রক্রিয়া। সাত দলের তিন দলই জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দল ছাড়ার শর্ত নাকচ করে দিয়েছে। দল তিনটি হচ্ছে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত মজলিস। এর মধ্যে খেলাফত মজলিস আগেই ১১ দল ছেড়েছে। তবে হেফাজতের পক্ষ থেকে দলীয় সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের বিষয়টি মানতে রাজি নয় তারা।
একদিকে অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ মানতে নারাজ তিন দল। অন্যদিকে জামায়াতের সঙ্গে থাকা কাউকে নিয়ে জোট করতে চায় না হেফাজতে ইসলাম।
রাজধানীর খিলগাঁওয়ের মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সাত দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবে হেফাজত। প্রকাশ্যে এখনও এ নিয়ে আশাবাদের কথা বলছে দলগুলো। তবে নেতাদের সঙ্গে আলাপে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। তারা বলছেন, জোটবদ্ধ হওয়ার জন্য এমন শর্ত দেওয়া উচিত নয়, যা দলগুলোর ওপর বাইরের হস্তক্ষেপ চাপিয়ে দেয়।
দেশ ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে হেফাজত বা যে কোনো ব্যানারে কাজ করতে আপত্তি নেই দলগুলোর। তবে দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তের ভার দলীয় ফোরামেই রাখতে চায় তারা।
কী আছে হেফাজতের ঐক্যের ফর্মুলায়
ঐক্য প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর বৈঠক করে সাত দল। হেফাজতের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরীর নেতৃত্বে চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির জামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর মাদ্রাসায় ওই বৈঠক হয়েছিল। সাত দলের পাঁচজন করে ৩৫ প্রতিনিধিসহ এতে হেফাজতের শীর্ষ নেতারা ছিলেন। ওই বৈঠকে হেফাজতের পক্ষ থেকে দলগুলোর নেতাদের কাছে সাত দলীয় ঐক্যের সাংগঠিক ফর্মুলা পেশ করা হয়। ওই ফর্মুলার কপি এশিয়া পোস্টের হাতে এসেছে।
ঐক্যের ফর্মুলার দুই নম্বরে সাত দলের ঐক্যের উদ্দেশের ‘খ’-তে বলা হয়, ‘৭ দলীয় জোটভুক্ত কোনো দল একক সিদ্ধান্তে অন্য কোনো ইসলামি ও অনৈসলামিক দলের সঙ্গে জোট করতে পারবে না। দেশ, জাতি ও ইসলামের বৃহত্তর স্বার্থে কিংবা প্রয়োজনে ৭ দলের মজলিসে শুরা ও উপদেষ্টা পরিষদের অনুমতিক্রমে অন্য দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে পারবে।’
‘গ’-তে বলা হয়, ‘সাত দলীয় জোটের কোনো নেতা ভ্রান্ত ও আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা পরিপন্থি কোনো দলের সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করতে পারবে না।’
উল্লিখিত দুটি নীতিমালার বিরোধিতা করেছে সাত দলের ঐক্য প্রক্রিয়ায় থাকা অধিকাংশ দল। বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ, নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত মজলিস মনে করে, ‘খ’-তে উল্লিখিত শর্ত দলগুলোর সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দেবে। এরকম শর্ত মানলে দলগুলোর অস্তিত্ব থাকবে না। দলের মজলিসে শুরা ও নির্বাহী পরিষদ অকার্যকর হয়ে পড়বে।
‘গ’ শর্ত মানতে নারাজ বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি। তাদের মতে, এ শর্তে তাদেরকে জামায়াত জোট থেকে বের করতে চায় হেফাজত। যদিও এর মধ্যে ১১ দল ছেড়েছে খেলাফত মজলিস। এদিকে এ শর্তকে স্বাগত জানিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম।
জামায়াত-সঙ্গ মানবে না হেফাজত
হেফাজতের দাবি, জামায়াতে ইসলামী আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের বিরোধী দল। তাদের আকিদা ভ্রান্ত। সংগঠনটির স্পষ্ট বক্তব্য, জামায়াত জোটে থাকা কাউকে কওমি জোটে নেওয়া হবে না।
হেফাজতে ইসলাম আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা ও মতাদর্শকে অটুট রাখতে চায় বলে জানান হেফাজতের সাংগঠনিক সম্পাদক মুফতি বশীরুল্লাহ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, কেউ কারও সঙ্গে মিশলে একসময় তার মতাদর্শ গ্রহণ করে। হেফাজত ভ্রান্ত কারও সঙ্গে মেশা পছন্দ করছে না। কেউ কেউ নিজেদের নানাবিধ স্বার্থ হাসিলের জন্য জোট ছেড়ে আসতে চাচ্ছে না। কিন্তু বেশিরভাগ দলই হেফাজতের ডাকে সাড়া দিচ্ছে।
সাত দলে আসতে কাউকে ফোর্স করছে না হেফাজত। যারা আসতে চায় তাদের স্বাগত জানাবে সংগঠনটি। তাদের নিয়ে জোট করবে জানিয়ে মুফতি বশীরুল্লাহ বলেন, জামায়াতের সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত শত্রুতা নেই। তবে তাদের আকিদা ভ্রান্ত। জামায়াতের সঙ্গে থাকা কোনো দলকে ইসলামি জোটে জায়গা দেবে না হেফাজত। কেউ জামায়াতেও থাকবে, আবার সাত দলেও থাকবে- এটা হবে না। এটা আদর্শ নয়। এক সঙ্গে দুই নৌকায় পা রাখা যায় না।
জামায়াত জোট ছাড়বে না বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি
ঐক্য গড়তে গিয়ে কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়াকে সমর্থন করে না বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ও নেজামে ইসলাম পার্টি। হেফাজতের দেওয়া ফর্মুলার ‘খ’ শর্ত মানলে দলের পরিষদ অকার্যকর হয়ে যায়। ‘গ’ মানলে ছাড়তে হবে ১১ দল। দল দুটি এখনই জামায়াত জোট ছাড়তে রাজি নয়। এতে তাদেরকে সাত দলে না নিলেও তাদের আপত্তি নেই।
এমন প্রস্তাব রাখা যাবে না বলে জানান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, এরকম শর্ত ঐক্যের পথে বাধা। তাদের শর্ত মানলে সব দল বিলুপ্ত করে দিয়ে এক দল করতে হবে। জোট করতে হলে দলগুলোকে নিজস্ব স্বাধীনতা দিতে হবে না। জোটে কোনো একক নেতা থাকবে না। দলের প্রধানরাই শীর্ষ নেতা। তারা ইসলাম ও দেশের স্বার্থে ঐক্যবদ্ধাভাবে কাজ করবে। তারা চাইলে যে কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করতে পারবে। অতীতে সমমনা এমন জোট ছিল বলেও জানান তিনি।
শেষ পর্যন্ত জোট হবে কি না- এ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মামুনুল হকের দলের এ নেতা। তার মতে, এই শর্ত মানতে আমরা যেমন একমত নয়, তেমনি একমত নয় নেজামে ইসলাম পার্টি ও খেলাফত মজলিস। তিন দলই তো একমত নয়, বাকি চার দল নিয়ে কী জোট হয়। ঐক্য হয়। ঐক্য বিনষ্ট করে এমন শর্ত রাখা উচিত নয়। আমরা কোনোভাবেই ১১ দল ছাড়ছি না। প্রত্যেক সরকারই বিরোধী দলকে দুর্বল করতে চায়। আমরা বুঝে-শুনে কোনো ফাঁদে পা দিতে রাজি নয়।
নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইজহার এশিয়া পোস্টকে বলেন, সবাইকে নিজস্ব জায়গা থেকে ছাড় দিতে হবে। শর্ত চাপিয়ে ঐক্য করা যায় না। হেফাজত থেকে সাংগঠনিক কোনো রূপরেখা চাই না। তাদের প্রস্তাবনার ‘খ’ ও ‘গ’-এর সঙ্গে আমরা নীতিগতভাবে ঐক্যমত নই। এগুলো অপরিপক্ক নীতি। আমরা এই মুহূর্তে ১১ দল ছাড়ছি না।’
রাজনৈতিক দলগুলো আকিদা দিয়ে চলে না বলে জানান খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির মাওলানা আহমদ আলী কাসেমী। তিনি এশিয়া পোস্টকে বলেন, দেশ ও জনগণের স্বার্থ কোন দিকে, এ বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতো অরাজনৈতিক দলগুলো চিন্তা করে না। দেশের স্বার্থে তো হিন্দুদের সঙ্গে জোট হতে পারে। সুতরাং আকিদার শর্ত দেওয়া যাবে না।
দলের স্বকীয়তা ভেঙে বা নির্বাহী পরিষদ বাদ দিয়ে কোনো দল ঐক্য করবে বলে মনে করেন না আহমদ আলী কাসেমী।
জামায়াত ছাড়ার শর্তে খুশি জমিয়ত
কোনো দলের সঙ্গে জোট করতে দল একক সিদ্ধান্ত নিতে পারবে না শর্ত দেওয়া সমীচীন নয় বলে মনে করছে জমিয়ত। দলটির মতে, এতে দলের স্বকীয়তা নষ্ট হয়। দলীয় ফোরামে আলোচনার ধারাবাহিকতা বাধাগ্রস্ত হয়। এমন প্রস্তাব সামনে আসা উচিত নয়।
হেফাজতের দেওয়া ‘সাত দলীয় জোটের কোনো নেতা ভ্রান্ত বা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের আকিদা পরিপন্থি কোনো দলের সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ করা যাবে না’- শর্তকে স্বাগত জানিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। দলের মহাসচিব মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী এশিয়া পোস্টকে বলেন, সাত দলের অধিকাংশই আকিদার এই প্রশ্নে একমত। দুয়েকটি দল দ্বিমত পোষণ করছে।
গত ১৬ জুলাই বাবুনগর মাদ্রাসায় হেফাজত সংশ্লিষ্ট সাতটি দলের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী। সভা শেষে জানানো হয়, ভবিষ্যতে একসঙ্গে চলার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা। এক মাসের মধ্যে ঐক্যের রূপরেখা জমা দেবে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলগুলো। এরপর কওমি অঙ্গনে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের আলোচনা শুরু হয়। পরে দলগুলোর রূপরেখা নিয়ে গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর মাখজানুল উলুম মাদ্রাসায় আরেকটি বৈঠক হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। পরবর্তীতে গত ২৭ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রামের বাবুনগর মাদ্রাসায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য বৈঠক হয়। সেখানে হেফাজত আমির, মহাসচিবসহ সাতটি দল থেকে প্রতিটি দলের পাঁচজন করে প্রতিনিধি অংশ নেয়। সে বৈঠকেও চূড়ান্ত রূপরেখা নিয়ে একমত হতে পারেনি তারা।