Image description

সৌদি আরব বাংলাদেশি শ্রমিকদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। সেখানে গিয়ে কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ গৃহকর্মী, আবার কেউ কাজ করেন বিভিন্ন সেবা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে। তাদের অধিকাংশের এই বিদেশযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে পরিবারের আর্থিক ভবিষ্যৎ। তাই প্রবাসে কোনো শ্রমিক বিপদে পড়লে তার প্রভাবও পড়ে দেশে থাকা স্বজনদের ওপর।

সম্প্রতি সৌদি আরবে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এ নিয়ে আছে নানা প্রশ্ন, আলোচনা ও সমালোচনা। বিদেশে কাজ করতে যাওয়া একজন নাগরিক বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হলে তাঁর আইনি সহায়তা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নিজ দেশের কূটনৈতিক মিশনের ভূমিকা কতটা কার্যকর থাকে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

কিন্তু ঠিক কবে থেকে সৌদি আরবে বাংলাদেশের শ্রমিক পাঠানো শুরু হয় তা কি আমরা জানি?
সৌদি আরবে বাংলাদেশি শ্রমিকদের যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ দশক আগে। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৬ সালে সৌদি আরবে কাজ করতে গিয়েছিলেন ২১৭ জন বাংলাদেশি। এরপর কয়েক দশকে দেশটি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রম অভিবাসনের গন্তব্যগুলোর একটি।

শুরুতে অল্পসংখ্যক মানুষের বিদেশযাত্রা সময়ের সঙ্গে বড় এক কর্মপ্রবাহে রূপ নেয়। কাজের সন্ধানে সৌদি আরবে গেছেন নির্মাণশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, গাড়িচালক, কারিগর, দোকানকর্মীসহ নানা পেশার মানুষ। তাদের অনেকের কাছে বিদেশে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল পরিবারের আর্থিক সংকট কাটানোর চেষ্টা। কারও লক্ষ্য ছিল ঋণ শোধ করা, কারও জমি কেনা, কারও সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানো কিংবা নিজের একটি ঘর তৈরি করা।সৌদি আরবের কোন এক মেসে প্রবাসী শ্রমিকরা

সৌদিমুখী শ্রমপ্রবাহের ব্যাপ্তি
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে সৌদি আরবের গুরুত্ব কতটা, তা বোঝা যায় সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) ৫ জানুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কাজ নিয়ে সৌদি আরবে গেছেন ৭ লাখ ৫২ হাজার ৭১৫ জন বাংলাদেশি। জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্যের বরাত দিয়ে প্রকাশিত এই হিসাব অনুযায়ী, ওই বছর বিদেশে কাজ করতে যাওয়া বাংলাদেশিদের সবচেয়ে বড় গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। বর্তমানে দেশটিতে প্রায় ৩৫ লক্ষ বাংলাদেশি বসবাস করছে।

বর্তমান বাস্তবতায় এই বিপুলসংখ্যক মানুষের বিদেশযাত্রার পেছনে রয়েছে পরিবারের আর্থিক প্রয়োজন, দেশে পর্যাপ্ত কাজের সুযোগের অভাব, ঋণ পরিশোধ, জমি কেনা, বাড়ি নির্মাণ এবং সন্তানদের পড়াশোনার খরচ জোগানোর মতো নানা লক্ষ্য। প্রবাসী আয় বাংলাদেশের বহু পরিবারের জীবনযাত্রা বদলেছে। কিন্তু বিদেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হওয়া আর বিদেশে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ জীবন নিশ্চিত হওয়া অবশ্য এক বিষয় নয়।

শ্রমিকের নিরাপত্তা বিচার করতে হলে শুধু কতজন বিদেশে গেলেন বা কত টাকা পাঠালেন, তা দেখলে চলবে না। তাদের কতজন নিয়মিত বেতন পান, নিয়োগের সময় যে কাজ ও বেতনের কথা বলা হয়েছিল তা পান কি না, কর্মস্থলে দুর্ঘটনা ঘটলে ক্ষতিপূরণ মেলে কি না এবং চাকরি হারালে কীভাবে দেশে ফিরবেন এসব প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।
কফিলের হাতে কতটা ক্ষমতা

কাজের খোঁজে বাংলাদেশি শ্রমিকসৌদি আরবে বিদেশি শ্রমিকদের কর্মজীবন বুঝতে ‘কফিল’ বা স্পনসরের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। প্রচলিত স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় শ্রমিকের কাজ ও বসবাসের বৈধতার সঙ্গে নিয়োগকর্তার সম্পর্ক রয়েছে। ফলে নিয়োগকর্তার সঙ্গে বিরোধ তৈরি হলে বা চাকরি ছেড়ে অন্যত্র যেতে চাইলে শ্রমিকের জন্য জটিলতা তৈরি হতে পারে।

 

সৌদি আরবে শ্রম আইন ও স্পনসরশিপ ব্যবস্থায় সংস্কার আনা হয়েছে। তবে আইন পরিবর্তনের পরও শ্রমিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা কতটা বদলেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানায়, শ্রমিকদের মধ্যে চুক্তির শর্ত বদলে দেওয়া, অতিরিক্ত নিয়োগব্যয়, বেতন না দেওয়া, পাসপোর্ট আটকে রাখা এবং জোরপূর্বক শ্রমের ঝুঁকি নিয়ে অভিযোগ রয়েছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি, সব কফিল বা নিয়োগকর্তা শ্রমিকের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেন—এমন সিদ্ধান্তের ভিত্তি নেই। কিন্তু কোনো শ্রমিকের বৈধ অবস্থান, চাকরি ও আয়ের পথ যদি নিয়োগকর্তার সিদ্ধান্তের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তাহলে সেই সম্পর্কের অপব্যবহারের ঝুঁকিও তৈরি হয়।

ঋণ করে বিদেশযাত্রা, বেতন না পেলে বিপদ
বিদেশে যাওয়ার আগেই অনেক শ্রমিককে বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়। এ অর্থের একটি অংশ জোগাড় করতে কেউ জমি বিক্রি করেন, কেউ ঋণ নেন, কেউ আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ধার করেন। ফলে সৌদি আরবে পৌঁছানোর পর বেতন না পাওয়া কিংবা প্রতিশ্রুত কাজ না পাওয়ার অর্থ শুধু সাময়িক আয়হানি নয়; দেশে রেখে আসা পরিবারের ওপরও এর প্রভাব পড়ে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ সৌদি আরবের দুটি নির্মাণপ্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মীদের বকেয়া বেতন নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটি বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের ২৭ জন শ্রমিকের সাক্ষাৎকার নেয়। তাদের অনেকে বছরের পর বছর ধরে বেতন ও অন্যান্য পাওনা আদায়ের অপেক্ষায় ছিলেন। কেউ কেউ বকেয়া অর্থের চেক পেলেও তা ভাঙাতে সমস্যায় পড়েছিলেন; আবার কয়েকজনের নাম পাওনাদারদের তালিকায় না থাকায় তারা দাবি জানাতেই পারেননি।

এটি অবশ্যই সৌদি আরবের সব প্রতিষ্ঠানের অবস্থা বোঝায় না। তবে নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানে বকেয়া বেতন আদায়ের দীর্ঘসূত্রতা এবং শ্রমিকের আর্থিক ক্ষতির নথিভুক্ত উদাহরণ দেয়।

কর্মস্থলে মৃত্যু, কারণ ও ক্ষতিপূরণ
শ্রমিকের নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক কর্মস্থলে দুর্ঘটনা, অসুস্থতা ও মৃত্যুর ঘটনা। ২০২৪ সালের মার্চে দ্য গার্ডিয়ান বাংলাদেশের সরকারি নথির ভিত্তিতে জানায়, ২০০৮ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সৌদি আরবে অন্তত ১৩ হাজার ৬৮৫ বাংলাদেশি মারা গেছেন। শুধু ২০২২ সালেই মারা যান ১ হাজার ৫০২ জন। পত্রিকাটির অনুসন্ধানে দেখা যায়, বহু মৃত্যুর সনদে কারণ হিসেবে ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’, ‘হৃদ্‌যন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ’ বা ‘শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ’ ধরনের বিবরণ দেওয়া হয়েছিল, যা মৃত্যুর অন্তর্নিহিত কারণ স্পষ্ট করে না।

এসব সাক্ষ্য নির্দিষ্ট ঘটনার অভিজ্ঞতা। কিন্তু এগুলো একটি বড় প্রশ্ন সামনে আনে: প্রবাসে একজন শ্রমিক মারা গেলে তার পরিবার মৃত্যুর কারণ জানার, বকেয়া বেতন ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার এবং মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় কতটা সহায়তা পায়?