সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের অস্ত্র হাতে মাদকবিরোধী অভিযানের সংবাদ প্রকাশের জেরে গত ১৯ অক্টোবর সাংবাদিকদের ‘কুত্তার মতো পিটানো’র হুমকি দেন ইসলামী বক্তা ড. সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী।
এর আগে, সাতক্ষীরায় ধর্ম অবমাননার অভিযোগে ওয়াহিদুজ্জামান শামীমকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে ‘আলহামদুলিল্লাহ’ বলে স্বাগত জানান তিনি। হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেও বক্তব্য দেন আব্বাসী।
এর আগেও বিভিন্ন সময় আল্লাহ ও মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননাকারীদের ‘কল্লা কেটে দেওয়া’ বা নিজ হাতে শাস্তি কার্যকরের কথা বলেছেন তিনি।
সাতক্ষীরায় পিটিয়ে হত্যার আসামির প্রশংসা, মুক্তির পক্ষে সাফাই
গত ১৩ অক্টোবর সাতক্ষীরার দেবহাটায় ওয়াহিদুজ্জামান শামীম নামের এক ব্যক্তিকে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে দুই দফায় পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শামীমের পরিবারের দাবি, তিনি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন।
এই হত্যাকান্ডের আগে একইদিন ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে ফেসবুক লাইভে মানুষকে জড়ো হওয়ার আহ্বান জানান ফজলুল হক আমিনী নামে এক ব্যক্তি। একটি রেকর্ডিং শুনিয়ে তিনি বলেন, শামীমের “বেঁচে থাকার কোনো অধিকার নেই”। পরে চিকিৎসকের চেম্বারের সামনে থেকে আরেকটি লাইভে শামীমের অবস্থান জানান এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় শামীমকে চেম্বার ও হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে টেনেহিঁচড়ে বের করে বেধড়ক গণপিটুনি দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় নিহতের ভাই মামলা করলে পুলিশ প্রধান আসামি ফজলুল হক আমিনীকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়।
এই হত্যাকাণ্ডের পর ‘মুসান্না আল ফাইয়াজ’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে ড. এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীকে বলতে শোনা যায়, “সাতক্ষীরার দেবহাটায় এক বেয়াদব, বেইমান আল্লাহর হাবিব নূর নবীজি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আরশচুম্বী শানমানের খেলাফ এবং ইসলাম ধর্মের বিপক্ষে বক্তব্য দিয়েছে। স্থানীয় জনগণ তাকে গণপিটুনি দিয়ে জাহান্নামে পাঠায় দিছে। বলেন, আলহামদুলিল্লাহ।”
ভিডিওতে হত্যাকাণ্ডের প্রশংসার পাশাপাশি প্রধান আসামি আমিনীকে ‘মর্দে মুজাহিদ’ উল্লেখ করে তাঁর নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেন আব্বাসী।
তিনি বলেন, “আমরা বরং বলব সেই মর্দে মুজাহিদ, যে ব্যক্তি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নেতৃত্ব দিয়েছে, তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হোক।”
দেশের প্রচলিত আইনের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে যারা মুরতাদ হয়, নাস্তিক হয়, শাতেম, আল্লাহ ও তাঁর হাবীবের শানে বেয়াদবি করে, তাদেরকে প্রতিরোধ করার মতো প্রচলিত কোন আইন নাই। এজন্যে তারা এরেস্ট হয় আবার জামিনে মুক্তি পায়। তৌহিদী জনতার, ঈমানদারদের দ্বিতীয় কোনো পথ নাই তো নিজের হাতে আইন তুলে নেওয়া ছাড়া।”
সাংবাদিকদের পেটানোর হুমকি
এদিকে অস্ত্র হাতে এক প্রতিমন্ত্রীর মাদকবিরোধী অভিযানের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার জেরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন ড. আব্বাসী।
গত ১৭ অক্টোবর ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন গেন্ডারিয়ায় পিস্তল হাতে মাদকবিরোধী অভিযানে নামলে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হলে ১৯ অক্টোবর তিনি পদত্যাগ করেন।
ইশরাকের পদত্যাগের পরদিন ২০ অক্টোবর ‘Abbasi Monjil Joinpur’ ফেসবুক পেজ থেকে প্রকাশিত ভিডিওতে সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা যায় আব্বাসীকে।
ইশরাকের অস্ত্র উঁচিয়ে অভিযান চালানোর পদ্ধতি ভুল ছিল স্বীকার করলেও, এই সংবাদ প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের ওপর সহিংস হামলার হুমকি দেন তিনি।
তিনি বলেন, “আমার খুব দুঃখ লাগছে ইশরাকের বিষয়টা। অবশ্য এটা ঠিক পিস্তল উঁচিয়ে করাটা তার পদ্ধতি খারাপ ছিল। উদ্দেশ্য মহৎ ছিল। সবচেয়ে খারাপ বাংলাদেশের সাংবাদিকগুলো। ঠিক। এগুলোরে কুত্তার মতো পিটানো দরকার।”
সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ডা বাস্তবায়নের অভিযোগ তুলে আব্বাসী বলেন, “এই সাংবাদিকগুলো হচ্ছে সাংঘাতিক। এরা হলুদ সাংবাদিকতা করে। এরা বিদেশি ইন্টিলিজেন্স ব্রাঞ্চ কর্তৃক পয়সায় চলে। বাংলাদেশ ভালো হোক এটা তারা চায় না। এইসব হলুদ সাংবাদিকতা যারা করে তাদেরকে লাল কার্ড দেখাতে হবে।”
সাংবাদিকদের পেটানোর হুমকি দেওয়ার ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর সমালোচনার মুখে ২১ অক্টোবর নিজের বক্তব্যের পক্ষে সাফাই গান ড. আব্বাসী।
তিনি বলেন,“সব সাংবাদিককে আমি গালিগালাজ করি নাই। সাংবাদিকদের মধ্যে যারা হলুদ সাংবাদিকতা করে তাদেরকে আমি গালি দিয়েছি। সাংবাদিকদের মধ্যে যারা পয়সা খেয়ে হিরোকে জিরো বানায়, জিরোকে হিরো বানায়, তাদের বিরোধিতা করেছি। টাকা পেলে তাদের নিউজ পরিবর্তন হয়ে যায়। ভালো মানুষের চরিত্র হনন করে। আর টাকা পেলে চরিত্রহীন মানুষকে পক্ষে নিউজ করে। এ ধরনের সাংবাদিককে আমি যদি গালি দিয়ে থাকি ভুল করছি নাকি?”
সাংবাদিকদের নেতিবাচক প্রচারের কারণেই প্রতিমন্ত্রী ইশরাককে পদ ছাড়তে হয়েছে দাবি করে তিনি আরও বলেন,“সাংবাদিকরা যদি তার পক্ষে ইতিবাচক প্রচার করত, হয়তোবা তার পদ ছাড়তে হইত না তাকে। কিন্তু নেতিবাচক প্রচারের কারণে মাদকবিরোধী অভিযান চালিয়ে সে তার পদ হারাল।এইজন্য আমি মনে করি সাংবাদিকরাই মূলত দায়ী।”
এর আগেও ‘কল্লা কেটে দেওয়ার’ কথা বলেছেন আব্বাসী
২০২৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে এক সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে আল্লাহ ও মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অবমাননাকারীদের ‘কল্লা কেটে দেওয়ার’ কথা বলেন আব্বাসী।
পরদিন রাজনীতি ডটকমের প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আর মিছিল নয়, এবার শরিয়া আদালতে মুরতাদের শাস্তি ফাঁসি আমরা নিজ হাতে কার্যকর করব। আল্লাহ ও তার হাবিব (সা.)-এর বিরুদ্ধে বেয়াদবি করে যারা, নাস্তিকদের মধ্যে সেটা যদি বাকস্বাধীনতা হয়, তাদের কল্লা কেটে দেবো এটা আমাদের হাতের স্বাধীনতা।’
ওই বক্তব্যের পর ২০২৫ সালের ১০ মার্চ ২২৩ জন বিশিষ্ট নাগরিকের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে প্রকাশ্যে হত্যার প্ররোচনার অভিযোগে আব্বাসীর বিচার দাবি করা হয়।
বিবৃতিদাতাদের অভিযোগ ছিল, ধর্ম অবমাননা ও ধর্মদ্রোহের শাস্তির নামে আব্বাসী নিজ হাতে হত্যার অধিকার দাবি করেছেন।