Image description

চট্টগ্রাম নগর পুলিশের (সিএমপি) কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অপরাধের অভিযোগ থামছেই না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পুলিশে ব্যাপক রদবদল হয়েছে। তবু গত এক বছরে অন্তত ছয়টি ঘটনায় একাধিক কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার বা বদলি করা হয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে আছে মাদক আত্মসাৎ, ক্রিকেটারকে মারধর, চাঁদাবাজি, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে ব্ল্যাকমেইল, নাগরিককে তুলে নিয়ে টাকা আদায় এবং ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নগদ অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, অভিযোগ ওঠার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার, সংযুক্ত বা বদলি করা হয়েছে। কিন্তু তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ বা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির তুলনামূলক কম। বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু প্রত্যাহার বা বদলি করলে জবাবদিহি নিশ্চিত হয় না। নিরপেক্ষ তদন্ত, প্রমাণ যাচাই এবং দোষ প্রমাণিত হলে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। না হলে অভিযুক্ত কর্মকর্তার কাছে এটি শাস্তির চেয়ে সাময়িক প্রশাসনিক ব্যবস্থা হিসেবেই বিবেচিত হতে পারে।

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আনার পথে এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে প্রায় এক লাখ পিস ইয়াবা জব্দ করা হয়। অভিযোগ আছে, চালানটি আইনি প্রক্রিয়ায় জব্দ না দেখিয়ে আত্মসাৎ করা হয় এবং বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

সিএমপির নিজস্ব তদন্তে উঠে আসে, কোতোয়ালি থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের নির্দেশে এ ঘটনা ঘটেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৭ জুন রাতে তাকে থানা থেকে সরিয়ে পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে এক কনস্টেবলকে আগেই সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল।

জাতীয় দলের ক্রিকেটার নাঈম হাসানকে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) পরিচয়ে হেনস্তা ও মারধরের অভিযোগ ওঠে গত জুনে। এরপর খুলশী থানার তৎকালীন ওসি আরিফুর রহমানকে প্রত্যাহার করে লাইনওয়ারে সংযুক্ত করা হয়। ১৪ জুন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী এ আদেশ দেন। এ ঘটনায় আরো কয়েকজন পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। অভিযোগকারী পক্ষের সোর্স হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়।

দায়িত্ব নেওয়ার ১৭ দিনে প্রত্যাহার

সদরঘাট থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার ১৭ দিনের মাথায় মুহাম্মদ শরীফকে প্রত্যাহার করা হয়। সিএমপির এস্টেট অ্যান্ড বিল্ডিং শাখার পরিদর্শক থেকে ১৮ জুন তাকে সদরঘাট থানায় পদায়ন করা হয়েছিল। এর আগে তিনি সিটি এসবি ও ডিবিতে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতিসহ একাধিক অভিযোগে ৫ জুলাই সন্ধ্যায় তাকে সরিয়ে দামপাড়া পুলিশ লাইনসে সংযুক্ত করা হয়।

একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিএমপির সাবেক কমিশনার ও বর্তমানে আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়নের (এপিবিএন) প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজকে ‘হানি ট্র্যাপে’ ফেলে ব্ল্যাকমেইল করা হয়েছিল। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতারকচক্রের মূল হোতা জুবাইরুল হক জিয়ান প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজের কণ্ঠ নারীকণ্ঠে রূপান্তর করে টার্গেটদের সঙ্গে কথা বলতেন। এই চক্রের সঙ্গে সিএমপির দুই ওসি বাবুল আজাদ ও জাহেদুল ইসলামের যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

হাসিব আজিজ ফাঁদে পড়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে তার দাবি, পরিচয় ভুয়া বুঝতে পেরে তিনি যোগাযোগ বন্ধ করে অ্যাকাউন্ট ব্লক করে দেন। প্রতারক তাকে দিয়ে কোনো অনৈতিক কাজ করাতে পারেনি।

ঘটনা প্রকাশের পর ২৩ আগস্ট এক অফিস আদেশে পাঁচলাইশ মডেল থানার ওসি জাহেদুল ইসলামকে সিটি এসবিতে বদলি করা হয়। এর আগেই বাবুল আজাদকে ওসির পদ থেকে সরিয়ে মহানগর গোয়েন্দা বিভাগে (দক্ষিণ) বদলি করা হয়েছিল।

 

আটকে রেখে টাকা আদায়ের অভিযোগ

ডিবির উপপরিদর্শক (এসআই) মহিউদ্দীন রাজুর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী লুৎফুর নেছার অভিযোগ, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় মুরাদপুরের বাসা থেকে ডিবি পরিচয়ে কয়েকজন তাকে তুলে নিয়ে যান। কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা বা লিখিত নোটিস ছিল না। তাকে ডিবি উত্তর বিভাগের কার্যালয়ে প্রায় ১৬ ঘণ্টা আটকে রাখা হয়।

অভিযোগে বলা হয়েছে, সেখানে তাকে শ্লীলতাহানি করা হয়। পরিবারের সদস্যদের মাদক মামলায় ফাঁসানো এবং হত্যা করে লাশ গুমের হুমকি দিয়ে টাকা দিতে বাধ্য করা হয়। টাকা দিতে রাজি হলে কম্পিউটারে জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা তৈরি করে জোর করে তার স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মামলার নথি অনুযায়ী ঘটনার নেপথ্যে একটি ব্যবসায়িক বিরোধ ছিল। লুৎফুর নেছার স্বামী ফজলুল কাদের বাদশা সংযুক্ত আরব আমিরাতে মোবাইল অ্যাকসেসরিজের ব্যবসা করেন। ২০২৪ সালে সেখানে ফটিকছড়ির বাসিন্দা নাজমুল হাসানের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে দুজন যৌথভাবে ব্যবসা শুরু করেন। লোকসান হলে নাজমুল দেশে ফিরে দুই কোটি ৫০ লাখ টাকা দাবি করেন এবং ফজলুল কাদের বাদশার স্ত্রীকে হুমকি দিতে থাকেন বলে অভিযোগ।

জানা গেছে, স্বর্ণালংকার বিক্রি ও ধারদেনা করে ওই দম্পতি এক কোটি ১০ লাখ টাকা জোগাড় করে পরিশোধ করেন। বাকি এক কোটি ৪০ লাখ টাকা কিস্তিতে দিতে চাপ অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ।

ভুক্তভোগী জানান, প্রথমে পাঁচলাইশ থানায় গেলে পুলিশ মামলা না নিয়ে আদালতে যেতে বলে। পরে ১ জুন চট্টগ্রাম মহানগর হাকিম আদালতে তিনি পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেয়। ঘটনার পর অভিযুক্ত এসআইকে বদলি করা হয়।

মহিউদ্দীন রাজু টাকা নেওয়া ও নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, এক ব্যক্তির স্বর্ণসংক্রান্ত আর্থিক অভিযোগ পেয়ে তিনি দুই পক্ষের মধ্যে মীমাংসার চেষ্টা করেছিলেন।

 

ব্যবসায়ীকে তুলে নিয়ে অর্থ আদায়

সবশেষ ৪ সেপ্টেম্বর সিএমপির ল অ্যান্ড অর্ডার ইন্টেলিজেন্স সেলের (এলআইসি) সহকারী কমিশনার শরিফুল আলম সুজন ও তার দলের সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) বাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। পলিপ্রপিলিন ব্যবসায়ী আখতারুজ্জামান শাকিল ও তার বন্ধু মনসুর আলীকে হালিশহর থেকে সাদা পোশাকে তুলে এলআইসি কার্যালয়ে নেওয়া হয়। জুয়ার মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে তাদের কাছ থেকে নগদ অর্থ ও ক্রিপ্টোকারেন্সি আদায় করা হয় বলে অভিযোগ।

জানা গেছে, ভুক্তভোগীদের মোবাইল ফোন জব্দ করে ব্যক্তিগত তথ্য ও ছবি অন্য ডিভাইসে নেওয়া হয়। বাইন্যান্স অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১০ হাজার ৮৬৪ ডলার সমমূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি তিন দফায় স্থানান্তর করানো হয়। রাতে এটিএম বুথ থেকে পাঁচ দফায় চার লাখ টাকা তুলতে বাধ্য করা এবং মোবাইল ব্যাংকিং হিসাব থেকে অর্থ সরানোর অভিযোগও আছে। প্রথমে এক কোটি টাকা দাবি করা হলেও শেষ পর্যন্ত ২০ লাখ টাকা দিতে রাজি হন তারা। নিরাপত্তাহীনতার আশঙ্কায় ভুক্তভোগীরা এখনো মামলা করেননি।

এ বিষয়ে সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

তদারকি নিয়ে প্রশ্ন

একের পর এক ঘটনায় থানা ও গোয়েন্দা শাখায় পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রামের সাধারণ সম্পাদক আখতার কবির চৌধুরী বলেন, পদায়ন ও বদলিতে স্বচ্ছতা না থাকলে প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। তার মতে, গুরুত্বপূর্ণ থানায় পদায়ন ও বদলির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড থাকা এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি থাকা দরকার। কেউ প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশে পদায়ন-বদলি প্রভাবিত করেছেন কি না, তাও তদন্তের আওতায় আনা উচিত।

সার্বিক বিষয়ে পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার বা অপরাধের অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। সত্যতা পাওয়া গেলে বিভাগীয় ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কারো ব্যক্তিগত অপরাধের দায় পুরো বাহিনী নেবে না। মাদক, চাঁদাবাজি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য জনগণের পুলিশ হওয়া, নিপীড়ক হওয়া নয়। পুলিশের ভালো কাজের মাপকাঠি হলো নাগরিক সন্তুষ্টি।’