Image description

অরক্ষিত সড়কে যেন রাজত্ব চলছে দস্যু আর ডাকাত দলের। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, দেশে মোট দস্যুতার ৮৫ শতাংশই সংঘটিত হয় সড়ক-মহাসড়কে। আর বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ১৫ শতাংশ। ডাকাতি-দস্যুতার জন্য দুর্বৃত্তরা বেছে নেয় গভীর রাতের নির্জন সড়ক।

প্যাট্রোল ও তল্লাশি চৌকি কম থাকায় রাত ১২টার পর থেকে ভোরের আগ পর্যন্ত ডাকাতি হয় বেশি। এছাড়া ঈদ-পূজাসহ বিভিন্ন উৎসব এবং শীত মৌসুমে ডাকাতি-দস্যুতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে যায়। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে প্যাট্রোল ও তল্লাশি চৌকি বাড়ানো এবং অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরার (সিসিটিভি) আওতায় আনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান মতে, সারা দেশে গত আগস্টে রেকর্ড হওয়া দস্যুতার ১৫৪ ঘটনার মধ্যে ১৩১টি সংঘটিত হয়েছে রাস্তায়, যা শতকরা হিসেবে ৮৫ শতাংশেরও বেশি। এ সময় ঢাকা মহানগরীতে ২২টি দস্যুতার মধ্যে ২১টি সংঘটিত হয়েছে সড়কে। চট্টগ্রাম মহানগরীতে আটটি দস্যুতার ঘটনার আটটিই সড়কে সংঘটিত হয়।

খুলনা মহানগরীতে দুটি দস্যুতার ঘটনার একটি বাসাবাড়িতে, অন্যটি সড়কে। বরিশাল মহানগরীর তিনটি দস্যুতার ঘটনার তিনটিই সড়কে, রাজশাহী মহাগরীতে দুটি দস্যুতার একটি সড়কে, গাজীপুর মহানগরীর সাতটি দস্যুতার ঘটনার সাতটিই সড়কে সংঘটিত হয়েছে।

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জে ৩৩টি দস্যুতার ঘটনা সংঘটিত হয়। এর মধ্যে ৩১টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে সড়কে। ময়মনসিংহ রেঞ্জে চারটি দস্যুতার ঘটনার চারটিই সড়কে সংঘটিত হয়েছে। চট্টগ্রাম রেঞ্জে ২৯টি ঘটনার ২০টি সড়কে, সিলেট রেঞ্জে পাঁচটির মধ্যে তিনটিই সড়কে সংঘটিত হয়।

খুলনা রেঞ্জে ১০টি দস্যুতার ঘটনার নয়টি সড়কে, বরিশাল রেঞ্জে পাঁচটি ঘটনার একটি সড়কে, রাজশাহী রেঞ্জে দস্যুতার ১৩ ঘটনার ১১টিই সড়কে সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া রংপুর রেঞ্জে রেকর্ড হওয়া দুটি এবং রেলওয়ে রেঞ্জে রেকর্ড হওয়া পাঁচটি ঘটনাই সড়কে সংঘটিত হয়েছে।

পুলিশের রেকর্ড অনুযয়ী, গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩৮৭টি ডাকাতি ও ১৩৭৪টি দস্যুতা সংগঠিত হয়েছে। এর মধ্যে গত জুনে ডাকাতি ও দস্যুতার ১৮৭ মামলার মধ্যে ১৫১টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছে সড়কে। এপ্রিল থেকে জুন মাসে ডাকাতি ও দস্যুতার ৫৯৯টি ঘটনার অধিকাংশই সড়কে সংঘটিত হয়। এসব ডাকাতির ১৩১টি ঘটনার সময় পর্যালোচনা করে পুলিশ জানিয়েছে, দিনের আলোতে ১৯টি, সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টার মধ্যে ১৬টি, রাত ১২টা থেকে দুটার মধ্যে ৩১টি, রাত দুটা থেকে ভোর হওয়ার আগে ৬৫টি ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড হয়।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অন্তত ১৫ স্থানকে ডাকাতি ও দস্যুতার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বা ডাকাতিপ্রবণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এর মধ্যে নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড, কাঁচপুর ব্রিজ, কেওঢালা, মোগড়াপাড়া ও ছোট সাদিপুর এলাকা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জের ভবেরচর, কুমিল্লার দাউদকান্দি, চান্দিনা, মাধাইয়া বাজার ও চৌদ্দগ্রামের নির্জন কিছু অংশে প্রায়ই ডাকাতি ও দস্যুতার খবর পাওয়া যায়। ফেনীর ফাজিলপুর এবং চট্টগ্রামের মিরসরাই, সীতাকুণ্ড, কুমিরা, বাঁশবাড়িয়া ও ভাটিয়ারী এলাকায় চলন্ত গাড়িতে ইট-লোহার পাইপ ছুড়ে বা ব্যারিকেড দিয়ে রাতের বেলায় ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা রেকর্ড করেছে পুলিশ।

এছাড়া মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, ফরিদপুর, ঢাকা থেকে রাজশাহী ও রংপুর রুট, ঢাকা-সিলেট রুটের কিছু পয়েন্ট এবং গাজীপুর থেকে ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়কে গভীর রাতে দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা প্রায়ই ঘটছে।

গত সোমবার কক্সবাজারের ঈদগাঁও-কক্সবাজার সড়কের হিমছড়ি ঢালায় সকাল সাড়ে ছয়টায় এবং দুপুর দুটায় ভয়ানক ডাকাতি হয়। ১০-১২ জনের মুখোশ পরা ডাকাত দল সড়কে নামে। তারা ৫০-৬০টি যানবাহনে ডাকাতি করে। যাত্রীদের অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে মোবাইল ফোন, নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকার লুট করে। দিনে-দুপুরে দুই দফায় একই এলাকায় ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় জনমনে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জেলা পুলিশ সুপার এএনএম সাজেদুর রহমান জানান, ঘটনার পরপরই পুলিশ দুর্বৃত্তদের গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে। গতকাল মঙ্গলবার দুজনকে গ্রেপ্তার ও লুণ্ঠিত কিছু মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।

জানা গেছে, গত ৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় গাজীপুরের শ্রীপুর-গোসিঙ্গা আঞ্চলিক সড়কে ভয়াবহ ডাকাতি হয়। সেখানে ১০-১২টি মোটরসাইকেলে এসে একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী একটি প্রাইভেটকারের গতি রোধ করে কয়েক রাউন্ড গুলি চালায়। পরে গাড়িতে থাকা বিকাশের পরিবেশকের কাছ থেকে তিন কোটি টাকা লুট করে।

গত ৮ ও ৯ অক্টোবর গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডের কুমিরা ও ভাটিয়ারী অংশে একাধিক প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাস লক্ষ্য করে লোহার পাইপ ও ভারী বস্তু ফেলে যাত্রী ও প্রবাসফেরত যাত্রীদের স্বর্ণালংকার এবং নগদ অর্থ লুটের একাধিক ঘটনা ঘটে। গত ৪ অক্টোবর রাতে নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মোগড়াপাড়া এলাকায় অটোরিকশা নিয়ে ডাকাতির প্রস্তুতিকালে দেশীয় অস্ত্রসহ আন্তঃজেলা ডাকাত দলের ছয় সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

ডাকাতি ও দস্যুতার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম পুলিশের সব ইউনিটকে সম্প্রতি নির্দেশনা দিয়ে বলেন, ‘ডাকাতদের গ্যাংদের মধ্যে যোগাযোগের নেটওয়ার্ক খুঁজে বের করে তাদের গ্রেপ্তার করতে হবে। কোনো ডাকাত গ্রেপ্তার হলে সেই ডাকাত আর অন্য কোনো ডাকাতির ঘটনায় জড়িত ছিল কিনা সেটা কঠোরভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করে বের করতে হবে এবং প্রাপ্ত তথ্য সংশ্লিষ্ট এলাকায় জানাতে হবে। ডাকাতির মামলায় জামিনে থাকা আসামিদের ওপর নজরদারি অব্যাহত রাখতে হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ডাকাতির মতো দস্যুতাও জনমনে মারাত্মক আতঙ্ক সৃষ্টি করে। নজরদারি করে দস্যুতায় জড়িতদের শনাক্ত করতে হবে। মামলাগুলোর তদন্ত নিবিড়ভাবে করতে হবে।’

হাইওয়ে পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন ও মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, ‘বাসাবাড়ির তুলনায় সড়কে ডাকাতি বেশি হয় এটা সত্য। তবে মহাসড়কের তুলনায় আঞ্চলিক সড়কে ডাকাতি-দস্যুতার ঘটনা বেশি দেখা যায়। আমাদের কাছে যে রেকর্ড বা ঘটনা সম্পর্কে অফিশিয়াল তথ্য রয়েছে, তাতে মহাসড়কে ডাকাতির ঘটনা বাড়েনি। গত সেপ্টেম্বরে আমাদের কাছে ডাকাতির ঘটনার তিনটি রেকর্ড রয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা লক্ষ্য করেছি, ঈদ বা কোনো উৎসব মৌসুমে সড়কে ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা বাড়ে। কারণ ওই সময় প্রবাসীরা দেশে ফেরেন। বিমানবন্দর থেকেই তাদের টার্গেট করা হয়। নির্জন এলাকায় গেলে তারা ডাকাতি বা দস্যুতার শিকার হন’। তিনি আরো বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমের তুলনায় শীত মৌসুমে সড়কে ডাকাতি ও দস্যুতা বাড়ে।’

পুলিশের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘দস্যুতা বা ডাকাতি হওয়ার পর আসামি গ্রেপ্তার করেই ডাকাতির ঘটনা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দিচ্ছে হাইওয়ে পুলিশ। ফুট প্যাট্রোল কার্যক্রম বাড়ানো এবং তল্লাশি চৌকি পরিচালনা করা হচ্ছে। আমরা পর্যবেক্ষণে দেখেছি, ডাকাতি বা দস্যুতার মামলায় জামিন পাওয়া ব্যক্তিরা ফের দস্যুতা ও ডাকাতিতে জড়ায়। তাই ডাকাতি ও দস্যুতার মামলায় জামিন পাওয়া আসামিদের নজরদারিতে রাখি।’

ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনা কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায়Ñ জানতে চাইলে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ওমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, ‘বাসাবাড়ি বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের তুলনায় সড়কে দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা বেশি ঘটে এটা অনেকদিন থেকেই দেখছি। নির্জন সড়কে মাধ্যরাতে বা ভোররাতে ডাকাতি ও দস্যুতা হয়। এটা একটা অর্গানাইজড ক্রাইম বা সংঘবদ্ধ অপরাধ। পরিকল্পিতভাবে সংঘবদ্ধ চক্র ডাকাতি করে।

তিনি বলেন, পুলিশের উচিত ডাকাতি ও দস্যুতার হটস্পটগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো নজরদারির আওতায় আনা। তারা ফুট প্যাট্রোল ডিউটি বাড়াতে পারে, তল্লাশি চৌকি স্থাপন করতে পারে। অধিক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় আনা যেতে পারে। এর মাধ্যমে ডাকাতি ও দস্যুতা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ আরো বলেন, ‘অনেক সময় সংঘবদ্ধ এসব অপরাধীর সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার অসাধু কিছু সদস্য ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের যোগসাজশ থাকে। এটা হতে থাকলে ডাকাতি ও দস্যুতার মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে না। পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পেশাদারিত্বের সঙ্গে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করলে দস্যুতা ও ডাকাতির মতো অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’