গোপালগঞ্জ থেকে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রেডিওথেরাপি নিতে এসেছেন মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল। পেটে টিউমার হওয়ায় অস্ত্রোপচারের পর কেমোথেরাপি নিয়েছেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, এরপর তার রেডিওথেরাপি নেওয়ার কথা। কিন্তু গত ১৯ অক্টোবর সকাল থেকে হাসপাতালে অপেক্ষা করেও সিরিয়াল পাননি তিনি। রেডিওথেরাপি বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, আপাতত নতুন রোগীদের সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না।
মোস্তফা কামাল বলেন, ‘কেমোথেরাপির পর রেডিওথেরাপি দেওয়ার কথা চিকিৎসক বলেছিলেন। কিন্তু হাসপাতাল থেকে কোনও সিরিয়াল পাচ্ছি না। আমরা গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে থেরাপি নেওয়া সম্ভব না। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এত কষ্ট করে গোপালগঞ্জ থেকে ঢাকায় এসেছি। কিন্তু সিরিয়াল পাচ্ছি না।’
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন টাঙ্গাইলের সাথিয়া খাতুন। স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর রেডিওথেরাপি নিতে এসেছেন তিনি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে তাকে জানানো হয়েছে, এখন নতুন করে সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না। মেশিন নষ্ট থাকায় দুই বছরের আগে সিরিয়াল পাওয়া যাবে না বলেও তাকে জানানো হয়েছে।
একই পরিস্থিতিতে পড়েছেন টাঙ্গাইলের সাথিয়া খাতুন। স্তন ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর রেডিওথেরাপি নিতে এসেছেন তিনি। কিন্তু হাসপাতাল থেকে তাকে জানানো হয়েছে, এখন নতুন করে সিরিয়াল দেওয়া হচ্ছে না। মেশিন নষ্ট থাকায় দুই বছরের আগে সিরিয়াল পাওয়া যাবে না বলেও তাকে জানানো হয়েছে।
সাথিয়া খাতুন বলেন, ‘সরকারিভাবে থেরাপি দেওয়ার জন্য এত দূর থেকে এসেছি। এখানে এখন সিরিয়াল পাচ্ছি না। আমাকে সরকারিভাবেই চিকিৎসা নিতে হবে, বেসরকারি হাসপাতালে দেওয়ার মতো সামর্থ্য আমার নেই। আমরা দিন আনি দিন খাই মানুষ। হাসপাতাল থেকে বলা হয়েছে, দুই বছরের আগে সিরিয়াল পাবো না। মেশিন নাকি নষ্ট। আমরা গরিব মানুষ, যাবো কোথায়? এই হাসপাতালে রেডিওথেরাপি বন্ধ রয়েছে বা আমরা দিতে পারবো না, তা তো জানতামও না। কষ্ট করে সেই গ্রাম থেকে এসেছি।’
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালসাথিয়ার মতো অসংখ্য ক্যানসার রোগীকে রেডিওথেরাপি নেওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। হাসপাতালটির ছয়টি রেডিওথেরাপি মেশিনের মধ্যে চারটি দুই বছরের বেশি সময় ধরে অকেজো। বাকি দুটি দিয়ে চিকিৎসা চলছে। এরই মধ্যে অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে। কেউ কেউ ২০২৮ সালের শেষভাগে চিকিৎসার সিরিয়াল পেয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীর অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে না পেরে গত দেড় মাস ধরে নতুন রোগীদের রেডিওথেরাপির নিবন্ধন বন্ধ রাখা হয়েছে।
চিকিৎসকদের মতে, ক্যানসারের অস্ত্রোপচারের পর রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসার ধরন অনুযায়ী সাধারণত দ্রুত রেডিওথেরাপি শুরু করা প্রয়োজন। অস্ত্রোপচারের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলে ক্যানসার ফিরে আসা বা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। ফলে দীর্ঘ অপেক্ষা রোগীদের চিকিৎসায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা গেছে, বর্তমানে দুটি মেশিনে পুরোনো ও অপেক্ষমাণ রোগীদের রেডিওথেরাপি দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, মেশিন দুটি সক্ষমতার তুলনায় বেশি রোগীকে সেবা দিচ্ছে। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, সকাল ৮টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত তিন শিফটে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের (এনআইসিআরএইচ) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোস্তফা আজিজ সুমন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বর্তমানে আমরা আর সিরিয়াল নিচ্ছি না। কারণ, আগের সিরিয়ালগুলোই প্রায় ২০২৮ সালের শেষ পর্যন্ত বরাদ্দ আছে। তাই নতুন রোগীদের সিরিয়াল দিতে পারছি না। ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের দুই বছর অপেক্ষা করা কোনোভাবেই ঠিক হবে না।’
তিনি বলেন, ‘নতুনভাবে সিরিয়ালের অপেক্ষায় আছেন সাড়ে ৭ হাজার রোগী। আমরা চলমান দুটি মেশিন দিয়ে যতটা সম্ভব বেশি থেরাপি দিচ্ছি। রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি, আর মেশিনের সংখ্যা কম থাকায় এই সমস্যা দেখা দিয়েছে। আশা করা যায়, ২০২৭ সালের মাঝামাঝি নতুন মেশিন আসবে। তখন আমরা আরও বেশি রোগীকে থেরাপি দিতে পারবো এবং ভোগান্তি কমবে। নতুন রেডিওথেরাপি মেশিনের সঙ্গে আনুষঙ্গিক সবকিছু দেওয়া হবে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।’
জাতীয় ক্যানসার হাসপাতালে রোগী ও তাদের স্বজনদের ভিড়। ছবি: বাংলা ট্রিবিউনবিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী ক্যানসারে আক্রান্ত অর্ধেকের বেশি রোগীর চিকিৎসার কোনও না কোনও পর্যায়ে রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হতে পারে। সংস্থাটি এ চিকিৎসার সুযোগ সম্প্রসারণের পাশাপাশি নিরাপদ ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
ক্যানসারের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল হওয়ায় অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রোগীরা তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসা নিতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আসেন। কিন্তু রোগীর তুলনায় রেডিওথেরাপি মেশিনের সংখ্যা কম হওয়ায় চিকিৎসা পেতে দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এর সঙ্গে চারটি মেশিন বছরের পর বছর অকেজো পড়ে থাকায় সংকট আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এনআইসিআরএইচের চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, একজন রোগীর রেডিওথেরাপির কোর্স সম্পন্ন করতে সাধারণত চার থেকে আট সপ্তাহ সময় লাগে। এত দিন নতুন রোগীদেরও চিকিৎসার জন্য সিরিয়াল দেওয়া হতো। তবে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বর্তমানে নতুন নিবন্ধন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের বিপুলসংখ্যক ক্যানসার রোগীর চিকিৎসার চাপ একটি বিশেষায়িত হাসপাতালের পক্ষে সামাল দেওয়া কঠিন। তাই রাজধানীর বাইরে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে ক্যানসার চিকিৎসার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা জরুরি। আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা নিশ্চিত করতে শুধু রেডিওথেরাপি মেশিন কিনলেই হবে না; এ চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষিত রেডিয়েশন অনকোলজিস্ট, মেডিকেল ফিজিসিস্ট ও রেডিয়েশন থেরাপিস্টও তৈরি করতে হবে।
জনস্বাস্থ্য ও টিকা বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম এ বারী বলেন, ‘ক্যানসারের মতো প্রাণঘাতী রোগে আক্রান্ত হয়েও সরকারি হাসপাতালে রেডিওথেরাপির জন্য রোগীদের দীর্ঘ ভোগান্তি অত্যন্ত দুঃখজনক। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে রোগীর জীবনঝুঁকি বাড়ে। অথচ সংকট মোকাবিলায় সরকার কেন আগেই প্রয়োজনীয় মেশিনের ব্যবস্থা করেনি, সেই প্রশ্নও উঠছে।’
তিনি বলেন, দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে সমন্বয় করে হলেও রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীন আন্তর্জাতিক ক্যানসার গবেষণা সংস্থার গ্লোবক্যান ২০২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ২০২৪ সালে আনুমানিক ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৬৩ জন নতুন করে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৭ হাজার ৮২০ জন এবং নারী ৭৯ হাজার ৪৪৩ জন।
এসব রোগীর একটি বড় অংশ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অনেকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যান। তবে সরকারি ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকায় জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি।
এসব রোগীর একটি বড় অংশ সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। অনেকে চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরেও যান। তবে সরকারি ব্যবস্থায় তুলনামূলক কম খরচে চিকিৎসার সুযোগ থাকায় জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে রোগীর চাপ বেশি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরকার সরদার শাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, ‘দেশে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। রোগীদের যাতে রেডিওথেরাপি নিতে ছয় থেকে আট মাস দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে না হয়, সে জন্য ক্যানসার চিকিৎসাসেবা আরও সহজলভ্য ও বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সরকারি হাসপাতালগুলোতে ১৭টি নতুন রেডিওথেরাপি মেশিন (লিনিয়ার অ্যাক্সিলারেটর) স্থাপন করা হবে। ২০২৭ সালের জুনের মধ্যে এসব মেশিন স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হবে। এর মধ্যে ছয়টি মেশিন ঢাকার বিভিন্ন বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে এবং বাকি ১১টি ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে স্থাপন করা হবে। এতে ঢাকার বাইরের রোগীরা নিজ নিজ এলাকায় কম খরচে আধুনিক ক্যানসার চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পাবেন।’
ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি স্থাপন কিংবা পুরোনো ও অকেজো যন্ত্রপাতি অপসারণের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, জীবনরক্ষাকারী ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করতে এগুলো শুল্কমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের সিংহভাগ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে।
ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি স্থাপন কিংবা পুরোনো ও অকেজো যন্ত্রপাতি অপসারণের ক্ষেত্রে কোনও ধরনের আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা সহ্য করা হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, জীবনরক্ষাকারী ক্যানসার চিকিৎসার যন্ত্রপাতি দ্রুত আমদানি নিশ্চিত করতে এগুলো শুল্কমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ক্যানসার প্রতিরোধ ও চিকিৎসায় বর্তমান সরকার প্রয়োজনীয় সব পদক্ষেপ নেবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে স্বাস্থ্য খাতের বাজেটের সিংহভাগ ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যয় করা হবে।
