ভূমিহীন ও বেকার মুক্তিযোদ্ধাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে গড়ে তোলা আবাসন প্রকল্পে শেষ পর্যন্ত বঞ্চনার শিকার হয়েছেন বীর মুক্তিযোদ্ধারা। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের শীর্ষনেতা, উচ্চপদস্থ পুলিশ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা এবং প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সমিতির এক প্রভাবশালী নেতার আত্মীয়স্বজনদের কবজায় চলে গেছে এ প্রকল্পের অধিকাংশ ফ্ল্যাট।
রাজধানীর মিরপুর-১৫ এলাকায় ১৬ দশমিক ২ একর জমির ওপর নির্মিত ‘বিজয় রাকিন সিটি’ নামের এই আবাসন প্রকল্পে মোট ফ্ল্যাটের সংখ্যা ১ হাজার ৯৫০টি। ১৯৯৪ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া অসচ্ছল ও ভূমিহীন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ‘মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি’র অনুকূলে এই জমি বরাদ্দ দেন।
পরবর্তীতে ২০১০ সালে সমিতির তৎকালীন সভাপতি পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মো. মোর্শেদুল আলম ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ‘রাকিন’-এর সঙ্গে ৫৭:৪৩ অনুপাতে ফ্ল্যাট নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করেন।
এই চুক্তির আওতায় ১ হাজার ৮০টি ফ্ল্যাট পায় ডেভেলপার কোম্পানি এবং সমিতির ভাগে আসে ৮৭০টি ফ্ল্যাট। তবে এই ৮৭০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে মাত্র ৩২ জন সাধারণ মুক্তিযোদ্ধা পেয়েছেন ৫৭টি ফ্ল্যাট। অবশিষ্ট ৮৩৮টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে এমন সব ব্যক্তিকে, যাদের এই প্রকল্পে ফ্ল্যাট পাওয়ার কোনো আইনি বা নৈতিক অধিকার ছিল না।
বরাদ্দ পাওয়া প্রভাবশালীদের মধ্যে রয়েছেন ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কামরুল ইসলামের ২টি, শেখ ফজলুল করিম সেলিমের দুই ছেলে ও এক মেয়ের নামে তিনটি, আব্দুর রাজ্জাকের দুই ছেলের দুটি, সাবেক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের দুই মেয়ের দুটি, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম ও তার ভাইদের চারটি, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের স্ত্রীর একটি এবং সাবেক আইনমন্ত্রী প্রয়াত আব্দুল মতিন খসরু দুটি ফ্ল্যাট।
এ ছাড়া গোপালগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র কাজী লিয়াকত আলীসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের আরও ২২ জন নেতা ৪০টি ফ্ল্যাট হাতিয়ে নিয়েছেন।
পুলিশ প্রশাসনের মধ্যে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, এ কে এম শহীদুল হক, নূর মোহাম্মদ, নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা ও সৈয়দ বজলুল করিমের নামে ফ্ল্যাট নিবন্ধিত আছে। তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ উচ্চপদস্থ ২৩ জন পুলিশ কর্মকর্তার নামে বরাদ্দ হয়েছে ৭০টি ফ্ল্যাট। অন্যান্য প্রাক্তন অতিরিক্ত আইজিপি ও তাদের পরিবারের সদস্যরাও ফ্ল্যাট পেয়েছেন।
সিভিল প্রশাসনের মধ্যে সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান ও তার পরিবার ৪টি, বিচারপতি নাঈমা হায়দার একটি এবং ২১ জন সাবেক সচিবকে ২১টি ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে ১৩০ জন প্রভাবশালীর দখলেই রয়েছে ২১৫টি ফ্ল্যাট।
অন্যদিকে, সমিতির তৎকালীন সভাপতি এ টি আহমেদুল হক চৌধুরী নিজে, স্ত্রী ও প্রবাসী দুই মেয়ের নামে একাই নিয়েছেন ৬টি ফ্ল্যাট। প্রকল্পের প্রকৌশল দলের প্রধান এ টি এম খালেদুজ্জামান মুক্তিযোদ্ধা না হওয়া সত্ত্বেও নিজের ও পরিবারের নামে ১৫টি ফ্ল্যাট বাগিয়ে নিয়েছেন।
সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলম একাই তার স্ত্রী, শাশুড়ি, শ্যালক, শ্যালিকা, ভাতিজা ও ভাগিনাসহ নিকটাত্মীয়দের নামে ৫৯টি ফ্ল্যাট বরাদ্দ নিয়েছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ১০৩ কোটি টাকার বেশি।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সমিতির মাধ্যমে এই প্রকল্পের ৮৩৮টি ফ্ল্যাট অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে অমুক্তিযোদ্ধা ও প্রভাবশালীদের নামে হস্তান্তর করা হয়। সমিতির বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খ ম আমীর আলী টাইমসকে জানান, সমিতির সদস্যদের জন্য এসব ফ্ল্যাটের বিপরীতে এককালীন ৯৩ হাজার টাকা এবং নিবন্ধন ফি বাবদ মাত্র ৩০ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হয়েছে। ১ হাজার ৫৫৩ ও ১ হাজার ৮৭২ বর্গফুট আয়তনের এই ফ্ল্যাটগুলোর প্রতিটির বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত পৌনে দুই কোটি টাকা।
প্রকল্পের নথি ও তদন্ত সূত্রে জানা যায়, ১৯৯৩ সালে ১৫ জন কার্যকরী সদস্য ও ৪৯ জন সাধারণ সদস্য নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধা পরিবার কল্যাণ সমিতি গঠিত হয়। পরবর্তীতে মোর্শেদুল আলম কৌশল খাটিয়ে নিজের নামে জমি বরাদ্দ নেওয়ার চেষ্টা চালান। তবে সাধারণ সদস্যদের তীব্র প্রতিবাদের মুখে ব্যর্থ হয়েছে সমিতির সদস্যদের নামে জমি নেওয়া হয়।
এর পর তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের বাদ দিয়ে অমুক্তিযোদ্ধা সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ সদস্য এবং ক্ষমতাচ্যুত সরকারের প্রভাবশালী নেতাদেরকে সমিতির নতুন সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেন। সমিতির বর্তমান ৫১৬ জন সদস্যের মধ্যে ৩৩৪ জনই অমুক্তিযোদ্ধা। এমনকি মোর্শেদুল আলম নিজেও কোনো মুক্তিযোদ্ধা নন।
জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী তার জন্ম ১৯৬৬ সালের ২৪ মার্চ, অর্থাৎ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার বয়স ছিল মাত্র ৫ বছর।
ইতিমধ্যে সাবেক সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত শেষে সমাজসেবা অধিদপ্তর বর্তমান কমিটির কার্যক্রম স্থগিত করে প্রশাসক নিয়োগ করেছে। সমাজকল্যাণ অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ২১ অক্টোবর প্রশাসক হিসেবে বীর মুক্তিযোদ্ধা ইশতিয়াক আজিজ উলফাতকে দায়িত্ব দেয়।
নতুন প্রশাসক জানান, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোর্শেদুল আলমের বিরুদ্ধে ব্যাংক এশিয়া ও ইস্টার্ন ব্যাংকের এফডিআর ভেঙে ৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাৎসহ ‘মুক্তিযোদ্ধা পল্লী প্রকল্প’ নামক অ্যাকাউন্টের ১২ কোটি ১০ লাখ টাকা, রাকিনের সাইনিং মানি বাবদ ১২ কোটি টাকা, দুটি মাইক্রোবাস বিক্রির ৩৫ লাখ টাকা এবং ভূয়া প্লট বিক্রি করে ৫০ লাখ টাকাসহ মোট ৩২০ কোটি ৯৫ লাখ ৮ হাজার ২৬৭ টাকা লুটপাটের বিবরণ পাওয়া গেছে। মোর্শেদুল আলম ২০২৫ সালের ২৩ ডিসেম্বর ছাত্র-জনতার ওপর হামলার এক মামলায় গ্রেপ্তার হলেও পরে জামিনে মুক্তি পান।
এ প্রসঙ্গে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান টাইমসকে বলেন, ‘এভাবে যারা ফ্ল্যাট পেয়েছেন, তারা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ, প্রকল্পটি তাদের উদ্দেশ্যে ছিল না। তাদের উচ্ছেদ করা সরকারের দায়িত্ব এবং এর পেছনে দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।’
বঞ্চিত ২৩৮ জন প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা ২০২৫ সালে ফ্ল্যাট বরাদ্দের দাবিতে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন, যা বর্তমানে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং উচ্চ আদালতও প্রকৃত সদস্যদের তালিকা হালনাগাদ করে ফ্ল্যাট বরাদ্দের নির্দেশনা জারি করেছে।
সমিতির বর্তমান প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খ ম আমীর আলী বলেন, ‘আমরা চাই প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধারা তাদের প্রাপ্য ফিরে পান এবং এজন্য আমাদের প্রশাসক কাজ করে যাচ্ছেন।’
সমিতির প্রশাসক ইশতিয়াক আজিজ উলফাত প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, যেসব বীর মুক্তিযোদ্ধার ঢাকায় মাথা গোঁজার মতো জায়গা নেই, তাদের আবাসনের চিন্তা থেকেই প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু সমিতি সেই আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে অমুক্তিযোদ্ধাদের ফ্ল্যাট দিয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও লুটপাট চালিয়েছে। ইতিমধ্যে ১০টি ফ্ল্যাট অবৈধ দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে বলে জানান তিনি।