গণপরিবহনে গতি আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল বিআরটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে চলবে বিশেষ বাস। এতে যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি বাড়ার কথা ছিল সড়কের সক্ষমতা। কিন্তু ১৪ বছরেও চালু করা যায়নি সেই বাসসেবা। উল্টো নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেড়েছে যানজট, ভোগান্তি ও পরিবহন ব্যয়
গাজীপুর থেকে রাজধানী ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পের অবকাঠামো সরিয়ে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এজন্য করিডোরে নির্মিত ২৫টি স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করা হবে। দুই লেনের দুটি উড়ালপথকে উন্নীত করা হবে চার লেনে। পাশাপাশি প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা কোম্পানি ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট পিএলসি বন্ধ করে এর কার্যক্রম নেয়া হবে সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের আওতায়।
মন্ত্রিসভার সর্বশেষ অর্থাৎ গত রোববারের বৈঠকে বিআরটি প্রকল্পের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণে এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে গত সোমবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। আর এসব অবকাঠামো অপসারণে ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব দিয়েছে সওজ অধিদপ্তর। সেই সঙ্গে সড়কটি প্রশ্বস্ত করতে চাওয়া হয়েছে আরো ২৭ কোটি টাকা। তবে স্টেশনগুলো ভেঙে যেসব মালামাল পাওয়া যাবে, সেগুলো ৭ কোটি টাকায় বিক্রি করা যাবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। যদিও এগুলো তৈরিতে মোট ৯৯ কোটি টাকা খরচ হয়েছিল বলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে।
গণপরিবহনে গতি আনার লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয়েছিল বিআরটি প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল, ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে নির্দিষ্ট লেনে চলবে বিশেষ বাস। এতে যাতায়াতের সময় কমার পাশাপাশি বাড়ার কথা ছিল সড়কের সক্ষমতা। কিন্তু ১৪ বছরেও চালু করা যায়নি সে বাসসেবা। উল্টো নির্মাণকাজের দীর্ঘসূত্রতায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে বেড়েছে যানজট, ভোগান্তি ও পরিবহন ব্যয়। ২ হাজার ৩৯ কোটি টাকায় শুরু হওয়া প্রকল্পটির ব্যয় কয়েক দফায় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়। এর মধ্যে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা খরচ হলেও মূল উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে নির্মিত বিআরটি অবকাঠামো সরিয়ে সড়কটিকে ছয় লেনের মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী, সড়কের মাঝখানে নির্মিত বিআরটি স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেন করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের আওতায় নির্মিত দুটি দুই লেনের উড়ালপথে বিআরটি লেন তুলে দিয়ে চার লেনের মহাসড়ক হিসেবে সেগুলো উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানির কার্যক্রমও গুটিয়ে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর দায়িত্ব দেয়া হবে সওজ অধিদপ্তরকে।
সিদ্ধান্ত ও বাস্তবায়নের বিষয়ে সওজ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. মনিরুজ্জামান জানান, সড়ক নিরাপত্তা ও অবকাঠামোসংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী কাজ চলছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘ক্যাবিনেট থেকে এরই মধ্যে যে সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, সে অনুযায়ী আমাদের মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা তৈরি করেছে। আমরা ক্যাবিনেট ও মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাগুলো হুবহু অনুসরণ করেই কাজ করে যাচ্ছি এবং আগামীতেও সে অনুযায়ী কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’
এর আগে বিআরটি প্রকল্পটির কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একটি বিশেষজ্ঞ দল। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশে গঠিত এ দলের নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। প্রকল্পটির অপারেশনাল ও কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে গত বছর অক্টোবরে তারা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেয়। তাতে বিআরটি প্রকল্প পুরোপুরি বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়।
এ বিষয়ে ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বিআরটি প্রকল্পের সম্ভাব্য সমাধানগুলোর মধ্যে এটি বাতিল করাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত। তবে দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে গাজীপুরসহ এ পথে চলাচলকারীদের যে দুর্ভোগ পোহাতে হয়েছে, তা বিবেচনায় নিয়ে তাদের জন্য বিকল্প গণপরিবহনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিআরটি চালু হলেও গাজীপুরের যাত্রীদের বিমানবন্দরে এসে অন্য বাসে উঠতে হতো। এতে পুরো যাত্রায় কাঙ্ক্ষিত সুবিধা পাওয়া সীমিত হয়ে পড়ত। প্রকল্পটি বাতিল করে সড়ককে উচ্চ গতির মহাসড়কে রূপান্তর করলে গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলের যোগাযোগ সহজ হবে। পাশাপাশি গাজীপুর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত কমিউটার ট্রেন চালুর বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে। কারণ এ পথে রেলের তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন নির্মাণের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’
হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ দশমিক ৫ কিলোমিটার পথে বিআরটি নির্মাণে ২০১২ সালের নভেম্বরে অনুমোদন দেয়া হয়। ২০১৬ সালের মধ্যে নির্মাণ শেষ করে ২০১৭ সালে যাত্রী পরিবহন শুরুর লক্ষ্য ছিল। প্রকল্পের আওতায় প্রতিদিন প্রায় ২৫ হাজার যাত্রী পরিবহনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু ভূমি অধিগ্রহণ, নকশা পরিবর্তন, ভূগর্ভস্থ গ্যাস ও বিদ্যুতের লাইন সরানো, পানি নিষ্কাশন সমস্যা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতায় কাজ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়। প্রকল্পের মেয়াদ পাঁচ দফা বাড়ানোর পরও কাজ শেষ করা যায়নি। সর্বশেষ অনুমোদিত মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।
প্রকল্পের অনুমোদিত ব্যয় তিন দফা সংশোধনের পর বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি ৩২ লাখ টাকায়। প্রাথমিক ব্যয়ের তুলনায় বৃদ্ধি পায় ২ হাজার ২২৮ কোটি টাকার বেশি, অর্থাৎ প্রায় ১০৯ শতাংশ। সওজ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পে ক্রমপুঞ্জীভূত ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। অনুমোদিত ব্যয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশ খরচ হলেও যাত্রী পরিবহনের জন্য বিআরটি চালু করা সম্ভব হয়নি। ২০২৫ সালে প্রকল্পের ব্যয় প্রায় ৬ হাজার ৫৯৮ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হলেও তা অনুমোদন পায়নি।
নির্মাণকাজের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে বিমানবন্দর, উত্তরা, টঙ্গী, আবদুল্লাহপুর ও গাজীপুর এলাকায়। সড়কের মাঝখানে নির্মাণসামগ্রী, বিভাজক ও অসমাপ্ত অবকাঠামোর কারণে যান চলাচলের জায়গা কমে যায়। এতে কর্মস্থলে যাতায়াতকারী মানুষ থেকে শুরু করে পণ্যবাহী যানবাহন পর্যন্ত সবাইকে বাড়তি সময় ও পরিবহন ব্যয় বহন করতে হয়েছে। ঢাকা-গাজীপুর মহাসড়ক বৃহত্তর ময়মনসিংহ, উত্তরবঙ্গ ও টাঙ্গাইলের সঙ্গে রাজধানীর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ পথ। গাজীপুরের শিল্পাঞ্চলে কাঁচামাল সরবরাহ এবং তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহনের জন্যও সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকল্পটির অন্যতম ব্যর্থতা ছিল বিশেষ বাস সংগ্রহ করতে না পারা। প্রথমে স্বয়ংক্রিয় দরজাযুক্ত দীর্ঘ বাস চালুর পরিকল্পনা করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পরে বৈদ্যুতিক বাস কেনার উদ্যোগও কার্যকর হয়নি। সর্বশেষ ২০২৪ সালের এপ্রিলে ১৩৭টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ডিজেলচালিত বাস কেনার দরপত্র আহ্বান করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাস সংগ্রহ করা যায়নি। অন্যদিকে স্টেশনগুলোর নকশায় বাসের দরজার অবস্থান নিয়ে অসামঞ্জস্য ছিল। বাংলাদেশের প্রচলিত বাসের দরজা বাম পাশে থাকলেও বিআরটি স্টেশন তৈরি করা হয়েছিল ডান পাশে দরজাবিশিষ্ট বাসের কথা বিবেচনায় রেখে। ফলে বিশেষ বাস চালু হলেও বিদ্যমান গণপরিবহনের সঙ্গে সংযোগ নিয়ে জটিলতা তৈরির আশঙ্কা ছিল।
প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে। বুয়েটের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুসলেহ উদ্দীন হাসান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ত্রুটি ও ব্যর্থতা থাকলেও বাতিলের আগে এর আর্থিক ক্ষতি এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করা উচিত ছিল।’ প্রকল্পটির পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল বলে জানান তিনি।