Image description

রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়ি ও গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেকে ২০১৬ সালে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে ১৬ তরুণকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের দুটি মামলার বিচার এখনো শুরু হয়নি। এর মধ্যে কল্যাণপুরে ৯ তরুণ হত্যার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালসহ আটজনকে আসামি করে চলতি বছরের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় । অন্যদিকে পাতারটেকে সাত তরুণকে হত্যার ঘটনায় হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয় গত ফেব্রুয়ারিতে ।

আট মাসের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাগুলো এখনো অভিযোগ গঠনের শুনানির পর্যায়ে রয়েছে। প্রথমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ থাকা মামলা দুটি পরে ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয় । এতে নতুন করে শুনানির প্রক্রিয়া শুরু করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউটররা।

চব্বিশের বিপ্লবের পর পুনর্গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জুলাই গণহত্যার সাতটি মামলার রায় হয়েছে । এছাড়া ২৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। মামলাগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিলের পর অধিকাংশ মামলা সাধারণত চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে বিচার শুরুর পর্যায়ে যায় । তবে জাহাজবাড়ি ও পাতারটেক হত্যার অভিযোগে করা এই দুটি মামলার ক্ষেত্রে আট মাস পেরিয়ে গেলেও অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ হয়নি ।

বিচারে বিলম্বের বিষয়ে জানতে চাইলে ভারপ্রাপ্ত চিফ প্রসিকিউটর আব্দুস সোবহান তরফদার বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। জাহাজবাড়ি হত্যা মামলার শুনানির জন্য গত ৬ অক্টোবর দিন ধার্য ছিল। পরে তা পিছিয়ে ২৮ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়। শুনানি পেছানোর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, কেন শুনানি পিছিয়েছে, তা ট্রাইব্যুনাল জানে ।

মামলা দুটির দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রসিকিউটর মামুনুর রশিদ বলেন, ট্রাইব্যুনালে অনেকগুলো মামলার বিচার চলছে। অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে মামলাগুলোর বিচারকাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। সব মামলার বিচার একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। একটি মামলাকে অগ্রাধিকার দিয়ে এগিয়ে নিতে গেলে অন্য মামলার কার্যক্রম পিছিয়ে পড়তে পারে।

প্রসিকিউটর ফারুক আহাম্মদ বলেন, মামলা দুটি প্রথমে ট্রাইব্যুনাল-১-এ ছিল। সেখানে মামলার চাপ বেশি থাকায় পরে সেগুলো ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। এখন নতুন করে শুনানি করতে হচ্ছে। এ কারণে সময় বেশি লাগছে। পাশাপাশি অভিযোগগুলো আরো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে জানান তিনি ।

দুই ট্রাইব্যুনালের বেঞ্চ অফিসে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ট্রাইব্যুনাল-১-এ ১২টি এবং ট্রাইব্যুনাল-২-এ ১৪টি মামলা বিচারাধীন। চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ছুটিতে বিদেশে থাকায় তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জাহাজবাড়িতে ৯ তরুণকে হত্যা

রাজধানীর কল্যাণপুরের জাহাজবাড়িতে ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই জঙ্গি নাটক সাজিয়ে নয় তরুণকে হত্যার ঘটনায় পলাতক হাসিনাসহ আটজনের বিরুদ্ধে গত ২৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওই দিন অভিযোগ আমলে নিয়ে হাসিনাসহ পলাতক ছয় আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল-১। অন্যদিকে, এ মামলার দুই আসামি সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক ও ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া অন্য মামলায় গ্রেপ্তার থাকায় তাদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তৎকালীন কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) প্রধান মনিরুল ইসলাম, ডিএমপির তৎকালীন যুগ্ম কমিশনার শেখ মোহাম্মদ মারুফ হাসান, কৃষ্ণপদ রায় ও আব্দুল বাতেন।

মামলাটির প্রাথমিক প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি করে প্রসিকিউশন। পরে মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। ফলে অভিযোগ গঠনের বিষয়ে নতুন করে শুনানি করতে হবে। গত ৬ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য থাকলেও প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তা পিছিয়ে ২৮ অক্টোবর নির্ধারণ করা হয়।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করতেন, এমন ব্যক্তিদের লক্ষ্য করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হতো। পরে তাদের কয়েকজনকে নির্দিষ্ট স্থানে আটকে রেখে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে হত্যা করা হতো। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তে এ ধরনের ১৯টি ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে ।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাদরাসার ছাত্র ও ইসলামি মনোভাবাপন্ন তরুণ মোতালেব ওরফে আব্দুল্লাহ, রায়হান, মতিউর রহমান, জুবায়ের হোসেন, সেজাদ রউফ ওরফে অর্ক, তাজ উল হক ওরফে রাশিক, আবু হাকিম ওরফে নাঈম, আকিফুজ্জামান খান, রকিবুল হাসান এবং অজ্ঞাতনামা আরো একজনকে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে অপহরণ করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের হাজতখানা, সিটিটিসির গোপন বন্দিশালাসহ বিভিন্ন স্থানে গুম করে রাখা হয় ।

প্রসিকিউশনের অভিযোগ, এই আট আসামির ষড়যন্ত্র, নির্দেশনা ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ওই তরুণদের কল্যাণপুরের ‘জাহাজ বিল্ডিং’ নামে পরিচিত ভবনের পঞ্চম তলায় আটকে রাখা হয়। পরে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের পুলিশ সদস্যদের ব্যবহার করে ফ্ল্যাটটিকে জঙ্গি আস্তানা হিসেবে দেখানোর নাটক সাজিয়ে ঘিরে রাখা হয়। ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই রাতে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সোয়াট দলের মাধ্যমে জঙ্গি অভিযানের নামে ৯ তরুণকে নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় রকিবুল হাসান নামে এক তরুণ গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। পরে তিনি বেঁচে যান।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, অভিযান শেষে তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম এ সময় ব্যবহৃত গুলি সোয়াট দলের সদস্যদের নামে বণ্টন করে দেখান। জঙ্গি নাটক ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে ঘটনাস্থল থেকে আগ্নেয়াস্ত্র, ধারালো অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের আলামত উদ্ধারের বিষয়ে অসত্য জব্দ তালিকা তৈরির নির্দেশ দেন ।

অভিযোগ অনুযায়ী, তৎকালীন আইজিপি একেএম শহীদুল হকের পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অন্য আসামিদের দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি বাস্তবায়ন করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর শহীদুল হক শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামালকে ঘটনা সম্পর্কে অবহিত করেন।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান কামাল অন্য আসামিদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না নিয়ে তাদের রাষ্ট্রীয় পদক—বিপিএম ও পিপিএম—দিয়ে অপরাধ সংঘটনে উৎসাহ ও সমর্থন দেন। এ ঘটনায় আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে।

পাতারটেকে সাত তরুণকে হত্যা

গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেকে ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর জঙ্গি নাটক সাজিয়ে সাত তরুণকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় হাসিনাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গত ৩ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। এরপর ট্রাইব্যুনাল-১-এ মামলাটির অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি হয়। পরে এ মামলাটিও ট্রাইব্যুনাল-২-এ স্থানান্তর করা হয়। ফলে এ মামলাতেও নতুন করে শুনানি করতে হবে।

শেখ হাসিনা ছাড়া এ মামলার অন্য আসামিরা হলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, আইজিপি একেএম শহীদুল হক, পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) প্রধান জাবেদ পাটোয়ারী, ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম, বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান, গাজীপুরের পুলিশ সুপার ও পরে ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশীদ, বগুড়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুর রহমান মণ্ডল এবং সিটিটিসির সহকারী পুলিশ কমিশনার ও সোয়াট দলের তৎকালীন দলনেতা এসএম জাহাঙ্গীর হাছান। এ মামলায় শহীদুল হক ও আসাদুজ্জামান মিয়া গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, তৎকালীন সরকারের সমালোচনা করে লেখালেখি বা বক্তব্য দেওয়ার কারণে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সাতজনকে তুলে নিয়ে বগুড়ায় পুলিশের একটি গোপন বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়। ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর তাদের গাজীপুরের নোয়াগাঁওয়ের পাতারটেক এলাকায় সোলায়মান সরকারের বাড়িতে নেওয়া হয়। এরপর কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমের (সিটিটিসি) নেতৃত্বে জঙ্গি নাটক সাজিয়ে সোয়াট সদস্যরা সাতজনকেই গুলি করে হত্যা করেন । এ অভিযানের নাম দেওয়া হয়েছিল ‘অপারেশন শরতের তুফান’।

অভিযোগে আরো বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের পর সাতজনের লাশ নিতে আসা পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে বলে স্পষ্ট ভাষায় হুঁশিয়ারি দেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। এরপর ভয়ে পরিবারের সদস্যরা এ বিষয়ে কথা বলতে সাহস করেননি ।

নিহত সাতজনের মধ্যে তিনজন হলেন মো. ইবরাহীম, ফরিদুল ইসলাম আকাশ ও সাইফুর রহমান। অন্য চারজনের পরিচয় এখনো অজানা । এ ঘটনায়ও আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে ।