Image description

সৌদি আরবে ফ্রি ভিসার নামে বিপুল টাকা খরচ করে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন হাজার হাজার বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী। কাজের সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা না থাকা, কফিলের (সৌদি নিয়োগকর্তা বা জিম্মাদার) চাঁদা দাবি এবং ইকামা (বৈধ বসবাসের কার্ড) নবায়নের অতিরিক্ত খরচে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ শ্রমিকেরা।

দেশের প্রধান শ্রমবাজার সৌদি আরবে শ্রমিকদের এসব দুঃখ-বেদনা ও সমস্যা নিয়ে তেমন আলোচনা হয় না, ফলে তা সমাধানে কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও চোখ পড়ে না। অনেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে দেশটিতে গিয়ে একদিকে প্রত্যাশিত কাজ ও আয় পান না, অন্যদিকে ইকামা ও অন্যান্য খরচ মেটাতে গিয়ে আয়ের বড় অংশ শেষ হয়ে যায়।

হাবিবুর রহমান ইনসান নামে এক প্রবাসী প্রায় সাত লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে গেছেন। প্রথম কিছুদিন তিনি বেকার ছিলেন, তাই দেশে পরিবারকে কোনো টাকা পাঠাতে পারেননি। এখন গাড়ি চালিয়ে মাসে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা (৯০০ থেকে ১২০০ রিয়াল) দেশে পাঠাতে পারছেন। কিন্তু তাকে কাজ করার সুযোগ দেওয়ার বিনিময়ে প্রতি মাসে কফিলকে দিতে হয় ৫০০ রিয়াল।

ইনসানের মতে, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দক্ষতার অভাব এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাই কর্মীদের সংকট বাড়িয়ে তুলছে।

তার ভাই মোহাম্মদ মিনহাজুল ইসলাম জানান, সৌদি আরবে নির্দিষ্ট কোম্পানির কাজ ছাড়া ফ্রি ভিসায় গিয়ে কফিলের অধীনে থেকে নিজের চেষ্টায় কাজ খুঁজে নিতে হয়।

ইনসানের সঙ্গে যাওয়া রিকাপ হোসেন নামের আরেক প্রবাসী শুরুতেই কাজ না পেয়ে উল্টো দেশ থেকে টাকা এনে চলতেন।

প্রবাসীরা জানান, বৈধভাবে বিদেশে এসেও ইকামা ও কর্মসংস্থানজনিত জটিলতায় পড়তে হয়। ইকামা হলো সৌদি আরবে প্রবাসীদের থাকার ও কাজ করার বৈধ পরিচয়পত্র। প্রতি বছর এটি নবায়নের দায়িত্ব নিয়োগকর্তার হলেও বাস্তবে প্রবাসীদের কাছ থেকেই টাকা আদায় করা হয়। প্রথমবার ইকামা তৈরি ও সংশ্লিষ্ট খরচ মিলিয়ে ১৬ থেকে ১৮ হাজার রিয়াল (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা) পর্যন্ত খরচ হয়ে যায়। আবার বাংলাদেশি দালালদের প্রতারণার কারণে ভিসার টাকা কফিলকে না দেওয়ায় অনেকেই আকস্মিকভাবে ইকামা বাতিলের শিকার হন।

আলামিন হোসাইন নামের অপর এক প্রবাসী জানান, আগে ছোট প্রতিষ্ঠানের অধীনে কম খরচে চারজন পর্যন্ত কর্মী রাখার যে সুযোগ ছিল, তা গত পাঁচ-ছয় মাস ধরে বন্ধ রয়েছে। এতে ইকামার মেয়াদ ও নবায়ন নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

বর্তমানে কিছু মধ্যস্থতাকারী এক বছরের কথা বলে পাঁচ হাজার রিয়ালের বিনিময়ে মাত্র তিন মাসের ইকামা করে দিচ্ছে। ফলে তিন মাস পরপর প্রবাসীদের নতুন করে টাকা ঢালতে হচ্ছে। উচ্চ আয়ের পেশাজীবীরা এ খরচ বহন করতে পারলেও সাধারণ শ্রমিকদের জন্য তা অত্যন্ত কঠিন।

পাশাপাশি অনেক প্রবাসী সরাসরি কোম্পানিতে কাজ না পেয়ে জনশক্তি সরবরাহকারী বা রেন্টাল কোম্পানির মাধ্যমে কাজ করতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছেন। মূল কোম্পানি প্রতি ঘণ্টার জন্য ১২ থেকে ১৪ রিয়াল দিলেও কর্মীর হাতে পৌঁছায় মাত্র ৬ থেকে ৭ রিয়াল। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজ শুরুর তিন-চার মাস পর বেতন দেওয়ার শর্তে শ্রমিকদের কাজ করতে হয়। ইরান যুদ্ধের আশঙ্কায় অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংকট আরও ঘনীভূত হয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৯ লাখ ৪০ হাজার কর্মী সৌদি আরবে গেলেও সেই অনুপাতে প্রবাসী আয় বাড়েনি।

এই পরিস্থিতি সামাল দিতে বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি রপ্তানিকারক সংগঠনগুলোর সমিতি বায়রার সাবেক সচিব ফখরুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, সৌদি আরবে কর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়ায় তদারকি বাড়ানো জরুরি। ভিসা অনুমোদনের আগেই সৌদি সরকারের মাধ্যমে নিয়োগকর্তার আর্থিক সামর্থ্য, আবাসন ব্যবস্থা ও প্রকল্পের বাস্তব অস্তিত্ব যাচাই বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে কর্মীদের অপ্রয়োজনীয় অভিবাসন ব্যয় ও প্রতারণা কমানো সম্ভব হয়।

সৌদি আরবে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দেলোয়ার হোসেন টাইমসকে জানান, কর্মী নিয়ে আসার পর ইকামা করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়োগকর্তার হলেও সময়মতো তা না করায় কর্মীরা বিপদে পড়েন। সমস্যা সমাধানে কাজের ধরন, বেতন, ইকামার দায়িত্ব ও উভয় পক্ষের বাধ্যবাধকতা স্পষ্ট করে কর্মী ও মালিকের মধ্যে লিখিত চুক্তি থাকা জরুরি বলে তিনি উল্লেখ করেন।