হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসার চেয়ে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার ওপর সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে দেশের সামগ্রিক স্বাস্থ্য নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
তিনি বলেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রাথমিক ব্যর্থতা নির্দেশ করে। আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই—আমি স্বাস্থ্যের প্রতিমন্ত্রী, হাসপাতালের প্রতিমন্ত্রী নই। আমাদের মূল অগ্রাধিকার হাসপাতাল বৃদ্ধি নয়, বরং তৃণমূল পর্যায় থেকে রোগ, শারীরিক অক্ষমতা ও অকাল মৃত্যু প্রতিরোধ করা।
সোমবার সকালে রাজধানীর হোটেল ওয়েস্টিনে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ আয়োজিত ‘স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নে চিকিৎসা প্রযুক্তির সম্ভাবনা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
গোলটেবিলে আরো বক্তব্য দেন ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আলমগীর হোসেন, আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশের সভাপতি ও মাস্টারকার্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল, ঢাকাস্থ মার্কিন দূতাবাসের বাণিজ্যিক কাউন্সেলর পল জি ফ্রস্ট এবং মেডট্রনিক পিএলসি ও ইন্টেল করপোরেশনের সাবেক চেয়ারম্যান ডা. ওমর ইশরাক।
স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সনাতন স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো থেকে বেরিয়ে এসে তৃণমূলের স্বাস্থ্যকর্মীদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ও ইন্টারনেট অব থিংসের সাথে যুক্ত করা হচ্ছে। সরকার ইতোমধ্যে ১ লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে, যাদের কেবল প্রশিক্ষণই নয়, আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জামে সুসজ্জিত করা হবে।
দেশে অসংক্রামক রোগের প্রকোপ বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে ড. এম এ মুহিত বলেন, রোগীকে সেবা নিতে যেন ঢাকায় ছুটতে না হয়, সেজন্য বিশেষায়িত এই চিকিৎসাসেবা বিভাগীয় পর্যায়ে বিকেন্দ্রীকরণ করা হচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে প্রতিটি জেলা হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ পর্যায়ে এই সেবা সম্প্রসারিত করা হবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ঘোষিত প্রথম বাজেটে হার্টের রিং (স্টেন্ট), ডায়ালিসিস ফিল্টার, এপিআই ও কৃত্রিম চোখের লেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের ভ্যাট ও ট্যাক্স হ্রাস বা মওকুফ করেছে। একই সাথে চলতি অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে দেশের ইতিহাসের সর্বোচ্চ প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বিগত বছরগুলোতে চিকিৎসাসামগ্রী আমদানিতে যে দীর্ঘসূত্রতা ছিল তা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, যে কমিটির বৈঠক অতীতে দুই বছরেও হয়নি, গত পাঁচ মাসেই সেই কমিটি তিনবার বসে চিকিৎসাসামগ্রীর অনুমোদন নিশ্চিত করেছে।
আমেরিকান বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে শুধুমাত্র উচ্চমূল্যের চিকিৎসা সরঞ্জাম বিক্রি করলেই চলবে না; যন্ত্রপাতির জীবনকালীন ব্যয়, বিক্রয়োত্তর সেবা এবং দেশের ভেতরে প্রকৌশলী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উন্নত প্রশিক্ষণের সুযোগ তৈরি করতে হবে। বুয়েট বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের মেডিকেল টেকনোলজিতে দক্ষ করে তোলা এবং স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা যন্ত্রাংশ সংযোজন ও প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য তিনি মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোকে আহ্বান জানান। একই সাথে অকেজো পড়ে থাকা মেডিকেল যন্ত্রপাতির তাৎক্ষণিক তদারকিতে জাতীয় ই-হেলথ ও ডিজিটাল মনিটরিং ড্যাশবোর্ড চালুর পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
তিনি সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া প্রান্তিক জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে প্রতিবন্ধী শিশুদের চিকিৎসা সহায়তায় বৈশ্বিক বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল নিয়ে এগিয়ে আসার জোরালো আহ্বান জানান।
গোলটেবিলে আলোচনায় আরো অংশ নেন মেডট্রনিক বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মায়াঙ্ক ত্রিপাঠী, জিই হেলথকেয়ার বাংলাদেশের কান্ট্রি হেড ও ডিরেক্টর মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান (রোমেল), বেকটন ডিকিনসনের বাংলাদেশ বিজনেস লিডার মির্জা সজীব রায়হান এবং আমচ্যাম হেলথকেয়ার সাবকমিটির ইনচার্জ ডিরেক্টর ও ন্যাটকো বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আল-মামুন এম রাসেল।