Image description

বলিউডের পর্দায় যাদের বীরত্ব দেখে হাততালি দেয় দর্শক, বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে কি তবে তাদেরও রক্ত হিম হয়ে আসছে? ছায়াপথ আর রূপালি পর্দার আলো পেরিয়ে ভারতের বিনোদন জগতে এখন এক ভয়াবহ আতঙ্ক আর আততায়ীদের রক্তের খেলা।

নেপথ্যে একটাই নাম, জেলবন্দি গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই এবং তার চক্র। আর অপরাধ? সালমান খানের সঙ্গে একটু ঘনিষ্ঠতা বা সুসম্পর্ক রাখা।

ঠিক দুই বছর আগের কথা। ২০২৪ সালের ১২ অক্টোবরের সেই কালরাত মুম্বাইয়ের মানুষ নিশ্চয়ই এখনো ভুলতে পারেনি। প্রকাশ্য রাস্তায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল প্রভাবশালী প্রাক্তন রাজনৈতিক নেতা বাবা সিদ্দিকীকে।

সালমান খান,বাবা সিদ্দিকী ও শাহরুখ খানঠিক সেই মর্মান্তিক ঘটনার দ্বিতীয় বার্ষিকীর মাত্র ছয় দিন পর, গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় আবারও কেঁপে উঠল মুম্বাইয়ের অভিজাত এলাকা জুহু। এবার নিশানায় তরুণ অভিনেতা টাইগার শ্রফ।

আততায়ীদের ছোড়া গুলিতে ভাগ্যক্রমে টাইগার নিজে বেঁচে গেলেও গুরুতর আহত হয়েছেন তার গাড়িচালক। এ ঘটনার পরই বিনোদন অঙ্গনে নেমে এসেছে অমাবস্যার অন্ধকার।

হামলার রেশ কাটতে না কাটতেই ইন্টারনেটে ভেসে আসে একটি অডিও ক্লিপ। সেখানে অনিল পণ্ডিত নামে এক সন্ত্রাসী নিজেকে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সহযোগী দাবি করে হুমকির সুরে বলেছেন, ‘গোটা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে আমাদের কথা ছাড়া যারা চলবে কিংবা সালমান খানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখবে, তাদের আমরা মেরে ফেলব। এটাই প্রথম এবং শেষ সতর্কবার্তা।’

পুলিশি অনুসন্ধানে জানা গেছে, এ হামলার মাস্টারমাইন্ড অনিল পণ্ডিত ও তার সহযোগী হরমণ সান্ধু দুজনেই বর্তমানে আমেরিকার মাটিতে বসে এ অপরাধের জাল বুনছে। ঠিক যেমনটা বাবা সিদ্দিকীর হত্যার দায় স্বীকারকারী শুভম লঙ্কারও বিদেশে বসেই করেছিল।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, ভারতের আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সুদূর আমেরিকা থেকে কীভাবে একের পর এক এভাবে ছক কষে তারা হামলা চালিয়ে যাচ্ছে?

 

যদি রহস্যের গোড়ায় যাওয়া যায়, তবে সব পথ গিয়ে মেশে ১৯৯৮ সালের সেই বিখ্যাত কৃষ্ণসার হরিণ শিকার মামলায়। ১৯৯৮ সালে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় জোধপুরে কৃষ্ণসার হরিণ শিকার করেছিলেন সালমান।

রাজস্থানের বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের মানুষ এ বিলুপ্তপ্রায় হরিণকে নিজেদের সন্তানের মতো ভালোবাসেন ও পূজা করেন। তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ক্ষুণ্ন করার অপরাধে সালমান খানকে চিরতরে শেষ করার শপথ নেয় গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই।

কিন্তু সালমানকে ছোঁয়া না গেলে? সমস্যা নেই। বিষ্ণোই চক্রের নতুন নিয়ম, ‘সালমানের সঙ্গে যার দেখা মিলবে, তাকেই বলির পাঁঠা বানানো হবে।’ এর আগে ২০২৪ সালের এপ্রিলে সালমানের নিজের আবাসন গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্টে মোটরসাইকেল থেকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছিল, যার দায় স্বীকার করে আনমোল বিষ্ণোই এটাকে স্রেফ ‘ট্রেলার’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।

এরপর নভি মুম্বাই পুলিশ সালমানের খামারবাড়িতে অনুপ্রবেশ ও নজরদারির অভিযোগে একাধিক বন্দুকধারীকে গ্রেপ্তারও করে। কিন্তু তাতে কি গ্যাংয়ের আস্ফালন থেমেছে? এ আতঙ্ক কি শুধুই মুম্বাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ? উত্তর হলো, না। বলিউডের পরিধি ছাপিয়ে এ আক্রোশ এখন পৌঁছে গেছে সাতসাগর পাড়েও।

জনপ্রিয় কমেডিয়ান কপিল শর্মার কানাডার ক্যাফেতে ২০২৫ সালের জুলাই থেকে এ পর্যন্ত অন্তত তিনবার গুলি চালানো হয়েছে। অপরাধ? কপিল তার নেটফ্লিক্স শো-তে সালমান খানকে অতিথি হিসেবে নিমন্ত্রণ করেছিলেন।

একইভাবে ২০২৬ সালের শুরুতে বিখ্যাত পরিচালক রোহিত শেঠির জুহুর বাড়ি লক্ষ্য করে মুড়িমুড়কির মতো গুলি ছোড়া হয়।

পাঞ্জাবি গায়ক এপি ধিলোন এবং গুরু রান্ধাওয়ার গানের অনুষ্ঠান ও ক্যাফেতেও হামলা চালানো হয়েছে ঠিক একই অজুহাতে। এমনকি নিহত বাবা সিদ্দিকীর ছেলে জিশান সিদ্দিকীকে আজও প্রতিনিয়ত প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

সিধু মুসেওয়ালা

চলতি বছরের জুলাই মাসে তৃতীয় বিয়ে করার কারণে আমির খানকেও বিষ্ণোই গ্যাং সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়েছিল। এ ছাড়া  ২০২১ সালের মে মাসে গুলি করে হত্যা করা হয় জনপ্রিয় পাঞ্জাবি গায়ক সিধু মুসেওয়ালাকে। চাঞ্চল্যকর সে হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্তও বিষ্ণোই।

আমেরিকায় বন্দি থাকা লরেন্সের ভাই আনমোল বিষ্ণোইকে ২০২৫ সালের শেষে ভারতে এনে দিল্লির তিহাড় জেলে পুরেছে এনআইএ। মূল শ্যুটারদের একাধিক দল এখন গরাদের পেছনে। তবুও থামছে না একের পর এক হামলা ও হুমকি।

কারাগারের আড়ালে অপরাধ সাম্রাজ্য

কারাগারের চার দেওয়ালের মধ্যেও কীভাবে একটি অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে যাওয়া যায়, তার জ্বলন্ত উদাহরণ এ ৩১ বছর বয়সী লরেন্স বিষ্ণোই।

পাঞ্জাবের এক অত্যন্ত ধনী ও অভিজাত পরিবারে জন্ম নেওয়া লরেন্সের জীবনযাত্রা অন্য দশটা সাধারণ অপরাধীর মতো ছিল না। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ায় ছোটবেলা থেকেই বিলাসবহুল জীবন কাটিয়েছেন তিনি।

নামকরা স্কুল ও কনভেন্টে পড়াশোনা করা লরেন্সের মধ্যে ছাত্রজীবনেই এক ভিন্ন জেদ কাজ করত। চণ্ডীগড়ের কলেজে পড়ার সময় ছাত্ররাজনীতিতে পা রাখলেও নির্বাচনে হেরে যাওয়ার সেই পরাজয় তাকে মানসিকভাবে ভেঙে দেয়।

এরপরই এলাকার কিছু দুষ্কৃতকারীর সংস্পর্শে এসে অপরাধের চোরাবালিতে পা রাখেন তিনি। আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে।

বর্তমানে গুজরাটের সবথেকে সুরক্ষিত কারাগারে বন্দি থাকা সত্ত্বেও তার ইশারায় পাঞ্জাব, হরিয়ানা, রাজস্থান ও দিল্লির ৭০০ জনেরও বেশি শুটার ও গ্যাংস্টার দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।

শুধু তাই নয়, কানাডায় বসে তার পার্টনার গোল্ডি ব্রার এ সিন্ডিকেট পরিচালনা করেন।

সামাজিক মাধ্যমের আধুনিক গ্যাংস্টার কালচার, অস্ত্র আর টাকার ঝলক দেখিয়ে পাঞ্জাবের তরুণ প্রজন্মকে অপরাধের দিকে আকর্ষিত করার ক্ষেত্রে এ চক্রের রয়েছে কুখ্যাত ভূমিকা।

জেলখানা থেকে দেওয়া তার বিভিন্ন সাক্ষাৎকার বা ভিডিও বারবার প্রমাণ করেছে যে, প্রশাসনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে কীভাবে জেলের ভেতর থেকেও অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।

লরেন্স বিষ্ণোই আজ শুধু ভারতের রাজনীতি বা অপরাধ জগৎ নয়, আন্তর্জাতিক কূটনীতিরও এক অন্যতম আলোচিত চরিত্র হয়ে উঠেছে।