Image description

পুরান ঢাকার রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের পরিচিত এক পরিবারের উত্তরসূরি ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পথচলায় তৈরি হয়েছে নতুন এক সন্ধিক্ষণ। রাজধানীর গেন্ডারিয়ায় মাদকবিরোধী কর্মসূচিতে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র হাতে তার অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ঢাকা-৬ আসনের এই সংসদ সদস্য।

সোমবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হওয়ার কথা রয়েছে তার। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত পদত্যাগের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত নয়।

বাবা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার, প্রকৌশলবিদ্যার শিক্ষা, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জাতীয় সংসদে প্রবেশ- সব মিলিয়ে ইশরাকের রাজনৈতিক পরিচিতি তৈরি হয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ পেরিয়ে।

সাম্প্রতিক বিতর্ক তার রাজনৈতিক জীবনে বড় পরীক্ষা তৈরি করলেও, এই পরিস্থিতি তিনি কীভাবে মোকাবিলা করেন এবং ভবিষ্যতে জনগণের জন্য কীভাবে কাজ করতে চান, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

 

গেন্ডারিয়ার ঘটনা যেভাবে আলোচনার কেন্দ্রে

গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানীর গেন্ডারিয়া রেললাইনসংলগ্ন এলাকায় মাদকবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ কর্মসূচিতে অংশ নেন ইশরাক হোসেন। তার ফেসবুক পেজে প্রকাশিত ভিডিওতে তাকে ব্যক্তিগত আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ঘটনাস্থলে যেতে এবং কয়েকজনকে ধরতে নির্দেশ দিতে দেখা যায়। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর একজন জনপ্রতিনিধি ও সরকারের দায়িত্বশীল সদস্যের এমন কর্মকাণ্ডের আইনগত ও রাজনৈতিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

ইশরাক তার অবস্থান ব্যাখ্যা করে জানান, ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য তার কাছে বৈধ লাইসেন্স করা অস্ত্র ছিল।

তার বক্তব্য অনুযায়ী, এলাকার মাদকবিরোধী প্রতিরোধ কার্যক্রমের অংশ হিসেবেই তিনি সেখানে গিয়েছিলেন। তবে অস্ত্রের লাইসেন্স থাকা এবং জনসমক্ষে সেটি প্রদর্শনের আইনগত গ্রহণযোগ্যতা এক বিষয় নয়। এ কারণে ঘটনাটির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন ও প্রযোজ্য আইন অনুসারে বিষয়টি নিষ্পত্তি করা গুরুত্বপূর্ণ।

এদিকে ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঘটনাটি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। আইনের ব্যত্যয় হয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। ফলে ঘটনাটির চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা ও প্রযোজ্য আইনি প্রক্রিয়ার ওপর।

পদত্যাগ নিয়ে কী জানা যাচ্ছে

ঘটনার পর ইশরাক হোসেনকে পদত্যাগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে- এমন খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে তার দপ্তর থেকে এ ধরনের নির্দেশ পাওয়ার খবরকে অসত্য ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করা হয়। ইশরাকও একপর্যায়ে পদত্যাগের নির্দেশের খবরকে গুজব বলে উল্লেখ করেন।

পরবর্তী সময়ে সোমবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে তিনি জানান, দুপুর ২টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের বিষয়ে চূড়ান্ত ঘোষণা দেবেন। অর্থাৎ, সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, তার নিজের ঘোষণাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আনুষ্ঠানিক পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া, তা গ্রহণ এবং পদত্যাগ কার্যকর হওয়ার বিষয়গুলো আলাদাভাবে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিকভাবে এই সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, একটি বিতর্কের মুখে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত যেমন ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ হতে পারে, তেমনি এর মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও দলের জবাবদিহির প্রশ্নও সামনে আসে।

বাবা সাদেক হোসেন খোকার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার

ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে তার বাবা সাদেক হোসেন খোকার নাম। বীর মুক্তিযোদ্ধা খোকা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। পরবর্তী সময়ে বিএনপির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেন এবং ঢাকার রাজনীতিতে শক্তিশালী সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে তোলেন।

১৯৯১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০০১ সালে তিনি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী হন। পরে ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়ে ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পুরান ঢাকায় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও সাংগঠনিক যোগাযোগ তাকে বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নগরনেতায় পরিণত করেছিল।

২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। তার রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতা ও পুরান ঢাকার সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্ক ইশরাকের জন্য পরিচিতির একটি ভিত্তি তৈরি করেছে। তবে বাবার উত্তরাধিকার ধরে রাখার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতা প্রমাণ করা ইশরাকের নিজস্ব দায়িত্ব।

প্রকৌশলী থেকে রাজনীতির মাঠে

ইশরাক হোসেন যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব হার্টফোর্ডশায়ারে প্রকৌশলবিদ্যায় পড়াশোনা করেন। তার পেশাগত পরিচয় প্রকৌশলীর হলেও, সময়ের সঙ্গে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন। ২০১৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর তার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও দৃশ্যমান হয়।

২০২০ সালের ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপির মেয়র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি অর্জন করেন। ওই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তরুণ নেতা হিসেবে তার রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়। পরবর্তী সময়ে দলীয় কর্মসূচি, আন্দোলন এবং সাংগঠনিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি নিজের রাজনৈতিক পরিচিতি বিস্তৃত করেন।

২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৬ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর তার রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায় শুরু হয়। সংসদ সদস্য হওয়ার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান তিনি। এর ফলে স্থানীয় রাজনীতির পরিচিত পরিসর ছাড়িয়ে রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সুযোগ তৈরি হয়।

সংকটের মধ্যেও ভবিষ্যৎ রাজনীতির প্রশ্ন

ইশরাকের সামনে এখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- সাম্প্রতিক বিতর্কের যথাযথ নিষ্পত্তি এবং তার দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অবস্থান সুস্পষ্ট করা। মাদকবিরোধী কার্যক্রমের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সক্রিয় থাকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, একজন জনপ্রতিনিধির প্রতিটি পদক্ষেপে আইন, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব এবং জননিরাপত্তার মানদণ্ড বজায় রাখা সমান জরুরি।

পদত্যাগের ঘোষণা কার্যকর হলে মন্ত্রিত্বের বাইরে থেকেও ঢাকা-৬ আসনের সংসদ সদস্য হিসেবে তার রাজনৈতিক ভূমিকা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তার আনুষ্ঠানিক বক্তব্য না পাওয়া পর্যন্ত নতুন কোনো পদক্ষেপ, কর্মসূচি কিংবা রাজনৈতিক কৌশলকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন হবে না।

সামনে তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে এলাকার নাগরিক সমস্যা সমাধানে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া, মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগে ভূমিকা রাখা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এসব ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতা দেখাতে পারলে সাম্প্রতিক বিতর্কের বাইরে নিজের কর্মদক্ষতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হবে।

ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাইরে নিজস্ব রাজনৈতিক অবস্থান

সাদেক হোসেন খোকার সন্তান হিসেবে ইশরাক হোসেনের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু থেকেই জনমনোযোগ পেয়েছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, জনসেবার মান, রাজনৈতিক আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ওপর। পারিবারিক ঐতিহ্য তাকে পরিচিতি দিতে পারে; সেই পরিচিতিকে স্থায়ী রাজনৈতিক আস্থায় রূপান্তর করতে প্রয়োজন নিজস্ব অর্জন।

গেন্ডারিয়ার ঘটনা তাই কেবল একটি বিতর্কের বিষয় নয়; এটি ইশরাকের নেতৃত্ব, রাজনৈতিক বিচক্ষণতা ও জবাবদিহির প্রতিও একটি পরীক্ষা। পদত্যাগের বিষয়ে তার চূড়ান্ত বক্তব্য, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং ঢাকা-৬ আসনের মানুষের জন্য তার ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা- এই তিনটি বিষয়ই নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে তার রাজনৈতিক পথচলার পরবর্তী অধ্যায়।

উল্লেখ্য, এই সংকট থেকে ইশরাক হোসেন কী শিক্ষা নেন এবং কীভাবে নিজের রাজনৈতিক দায়িত্বকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেন, সেটিই হবে তার ভবিষ্যৎ মূল্যায়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি।