আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে একসময় বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে ছিল বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার আট মাস পর এখন সেই দলগুলোর নেতারা বলছেন, আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বেশ পিছিয়ে সরকার। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারের কাজেও তেমন কোনো গতি নেই।
তাদের মতে, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ ও গণভোটের বড় বড় প্রতিশ্রুতিগুলোর বেশিরভাগই পূরণ হয়নি। ফলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর রাজনীতিতে যে জাতীয় ঐক্য তৈরি হয়েছিল, তা বজায় রাখতে সরকারের আদৌ ইচ্ছা আছে কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
তবে কোনো কোনো নেতা মনে করেন, অপরাধ দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দ্রুত পূরণ করতে পারলে সরকার এখনো মানুষের আস্থা ফিরে পেতে পারে। একই সঙ্গে তারা সতর্ক করে বলেন, এভাবে চলতে থাকলে জনগণের ক্ষোভ আরও বাড়বে এবং নতুন করে আন্দোলন গড়ে উঠতে পারে।
২০২২ সালের শেষের দিকে আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগ ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিএনপির নেতৃত্বে শরিক দলগুলো একযোগে আন্দোলন শুরু করে। সব দল নিজ নিজ অবস্থান থেকে এক হয়ে মাঠে নামে। এরপর ২০২৩ সালের ১২ জুলাই বিএনপি ও সমমনা দলগুলো এক দফা আন্দোলনের ডাক দেয়।
সরকারবিরোধী জোরালো আন্দোলন সত্ত্বেও ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে আবার ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। তবে বিএনপি ও বেশিরভাগ বিরোধী দল ওই নির্বাচন বর্জন করায় সেখানে বড় কোনো বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছিল না।
এরপর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। অভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ দিন পর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় ফেরে বিএনপি।
নির্বাচনে জেতার পর বিএনপি তাদের আন্দোলনসঙ্গীদের নিয়ে ‘জাতীয় সরকার’ গড়ার কথা বলেছিল। কিন্তু পরে শরিক দলগুলো থেকে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজনকে মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী করা হয়।
নির্বাচনের আট মাস পর বিএনপির সাবেক আন্দোলনসঙ্গীদের মূল্যায়নে একটি বিষয় স্পষ্ট—সরকারকে শুধু তাদের নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি পূরণ করলেই চলবে না, অভ্যুত্থানের পর মানুষের মনে পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা-ও পূরণ করতে হবে।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, প্রথম আট মাসে সামাজিক ও অর্থনৈতিক খাতে কিছু কাজ হলেও জননিরাপত্তা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় বিএনপি সরকার সফল হতে পারেনি। এতে সরকারের ওয়াদা পূরণের ক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
টাইমস অব বাংলাদেশ’কে তিনি বলেন, ‘সরকারের সদিচ্ছা নিয়ে হয়তো সন্দেহ নেই। কিন্তু দেশ চালানোর সক্ষমতা নিয়ে এরই মধ্যে মানুষের মনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দলের লোকজনের বিরুদ্ধে এখনো চাঁদাবাজি, দখলদারি, দুর্নীতি ও সহিংসতার নানা অভিযোগ আসছে।
ভোটের আগে দল ও সরকারকে আলাদা রাখার প্রতিশ্রুতি থাকলেও, বর্তমানে বিএনপিকে জামায়াতে ইসলামীর মতো অন্যান্য বিরোধী দলের তুলনায় রাজনৈতিক ময়দানে কম সক্রিয় দেখা যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেন সাইফুল হক। তিনি বলেন, ‘কাগজে-কলমে দল আর সরকার আলাদা হতে পারে, কিন্তু বাস্তবে দলের স্বাধীন কার্যক্রম খুব একটা চোখে পড়ছে না।’
এছাড়া বাণিজ্য নীতি, চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার ব্যবস্থাপনা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তির বিষয়গুলো নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারকে কাজ করার পর্যাপ্ত সময় দেওয়ার পাশাপাশি আরও জোরালো পদক্ষেপ নিতে হবে।
অন্যদিকে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, প্রথম আট মাসে সুশাসন, অর্থনৈতিক খাতের সংস্কার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় বিএনপি সরকার মানুষের প্রত্যাশা মেটাতে পারেনি। উপরন্তু, সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে উল্টো হেঁটে পেছনে সরছে।
টাইমস’কে মান্না বলেন, যেসব কাজ করার কথা ছিল সরকার তা এখনও করেনি। বরং বিএনপির নিজস্ব ৩১ দফা সংস্কার রূপরেখা, জুলাই সনদ ও গণভোটের প্রতিশ্রুতি থেকেও তারা দূরে সরে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘সরকার কথা দিয়ে কথা রাখছে না, তারা এখন নতুন করে অন্য কিছু ভাবছে।’
মান্না আরও জানান, ভোটাররা যে প্রত্যাশা নিয়ে রায় দিয়েছিল, সরকারের সংস্কারকাজ তার তুলনায় খুবই কম। বিশেষ করে সংবিধান সংস্কার এবং জনগণের মতামতের ভিত্তিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে কোনো বাস্তব অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুমের অভিযোগ, সবার মতামত নিয়ে সংস্কারের যে কথা ছিল, তা বাদ দিয়ে বিএনপি সরকার নিজেদের মতো একা একা আইন পরিবর্তন করছে। এতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল, তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
তিনি টাইমস’কে বলেন, যেসব বিষয়ে সংস্কারের জন্য সংবিধান বদলানোর প্রয়োজন ছিল না এবং সবার সম্মতি ছিল, সরকার সেসব সংস্কার করতেও সরকার পিছিয়ে যাচ্ছে।
তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘আমরা মনে করছি সরকার অত্যন্ত বিপজ্জনক পথে এগোচ্ছে।’
কাইয়ুম জানান, তাদের দল সরকারকে আগের অবস্থানে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। নিজের ভুল শুধরে আইন সংশোধন ও সংস্কারের ওয়াদা পূরণ করার সুযোগ এখনো সরকারের হাতে রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
টাইমস’কে কাইয়ুম বলেন, ‘সরকার যদি সংস্কারের প্রতিশ্রুতি থেকে সরে আসে, তবে ভবিষ্যতে আবার স্বৈরাচারী শাসন ফিরে আসার পথ খুলে যেতে পারে। এমনটা করা গণঅভ্যুত্থানের গণতান্ত্রিক চেতনার সম্পূর্ণ বিরোধী। সরকারের সামনে এখনো সঠিক পথে ফিরে আসার সময় আছে।’