বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) চাকরির আবেদন থেকে শুরু করে কয়েক স্তরের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি) কর্তৃক চূড়ান্তভাবে সুপাশিপ্রাপ্ত হতেই লেগে গেছে দীর্ঘ তিন বছর। এরপর বিসিএস-ক্যাডার বলে সমাজে নাম ছড়িয়ে পড়ায় খুশির বন্যা বয়ে যায় পরিবারে। কিন্তু তারপর কেটে যায় আরও আট মাস। তবুও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারির খবর নেই। ইতিমধ্যে মারাও গেলেন ৪৫তম বিসিএসে উত্তীর্ণ হয়ে চাকরিতে যোগদানের জন্য সুপারিশপ্রাপ্ত দুইজন।
গত ১৭ জুলাই ক্যানসারে মারা যান লাইভস্টক ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত মোছা. মুমতাহিনা মিমু এবং ১৮ আগস্ট রেলে কাটা পড়ে মারা যান কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত মীর তানভীর আহমেদ। তারা যথাক্রমে হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিদ্যালয় এবং শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এই মৃত্যু কাকতালীয় হলেও বাস্তবে বিসিএসে চাকরি পাওয়ার দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় হতাশায় মুষড়ে পড়েছেন চাকরিপ্রার্থীরা। বিগত ১০টি বিসিএস পরীক্ষার সার্কুলার থেকে শুরু করে প্রজ্ঞাপন জারি হওয়া পর্যন্ত সাড়ে তিন থেকে চার বছর সময় লাগছে।
পিএসসির তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ৩০ নভেম্বর ৩ লাখ ১৮ হাজার প্রার্থীর আবেদনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ৪৫তম বিসিএসের নিয়োগপ্রক্রিয়া। ২০২৩ সালের মে মাসে প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১২ হাজার ৭৮৯ জন। ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ৬ হাজার ৫৫৮ জন। এরপর মৌখিক পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে ২০২৫ সালের নভেম্বরে চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করে পিএসসি, যেখানে ১ হাজার ৮০৭ জনকে ক্যাডার পদে সুপারিশ করা হয়। তারপর থেকে এখন পর্যন্ত তিন বছর ১১ মাস হতে চললেও প্রজ্ঞাপনের অপেক্ষা শেষ হয়নি।
ইতিমধ্যে দুবার জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন ৪৫তম বিসিএসের সুপারিশপ্রাপ্তদের প্রতিনিধিরা। মন্ত্রী তাদের দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির আশ্বাস দিয়ে বিদায় করেছেন। এমনকি জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী একাধিকবার গণমাধ্যমে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির কথা বললেও তার কোনো প্রতিফলন ঘটেনি।
সূত্র বলছে, সরকারি চাকরির পরীক্ষায় চূড়ান্তভাবে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ভেরিফিকেশনের একটা বিষয় থাকে। সরকার বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমেও এই যাচাইবাছাইয়ের কাজটি করে থাকে। এবার জুলাই মাসেই যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশের বিশেষ শাখা। কিন্তু এরপর আবারও আরেকটি গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে ভেরিফিকেশন করানো হয়। সেই প্রতিবেদনও জমা পড়েছে মন্ত্রণালয়ে। কিন্তু এরপরেও কোনো অজ্ঞাত কারণে এখনো প্রজ্ঞাপন জারি করা হচ্ছে না।
এই অবস্থা শুধু ৪৫তম বিসিএস এর চাকরিপ্রার্থীদেরই নয়। ভেরিফিকেশনের জটিলতায় আটকে আছে ৪৬তম ও ৪৯তম বিশেষ বিসিএসের প্রজ্ঞাপন প্রক্রিয়াও। অর্থাৎ পিএসসি থেকে চাকরির সার্কুলার, পরীক্ষা গ্রহণ, ফল প্রকাশ ও সুপারিশ-এসব করতে যেমন দীর্ঘ সময় যাচ্ছে, তেমনি শুধু ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে প্রজ্ঞাপন জারিতেও লেগে যাচ্ছে আরও এক বছরের মতো!
এ বিষয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন ৪৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত চিকিৎসক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি জানান, আগে বেসরকারি একটি হাসপাতালে প্র্যাকটিস করলেও পিএসসি থেকে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পর সেই চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। কিছুদিন পরপর মন্ত্রণালয় থেকে দ্রুত প্রজ্ঞাপণ জারির আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আবারও অন্যত্র যোগদান থেকেও বিরত থেকেছেন তিনি। কিন্তু প্রায় ১১ মাসেও প্রজ্ঞাপন না আসায় আর্থিক সংকটে পড়েছেন তিনি। তার মতোই মেধার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও বেকার জীবন যাপন করতে হচ্ছে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সহস্রাধিক চাকরিপ্রার্থীকে।
তাই ৪৫তম বিসিএসের জন্য সুপারিশপ্রাপ্তরা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে শিগগিরই সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনের আয়োজনকারীরা জানান, কোনো দাবি-দাওয়া নয় বরং সরকারের কাছে বাস্তবতা তুলে ধরতেই তারা সংবাদ সম্মেলন করছেন। তাদের বিশ্বাস, সরকার চাইলে বিসিএসের প্রক্রিয়া আরও অনেক দ্রুত করা সম্ভব।
এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমেদ টাইমসকে বলেন, ‘আগে থেকেই এরকম অব্যবস্থাপনা চলে আসছে। এখন হয়তো আরও বাড়ছে। ভেরিফিকেশনে এত সময় লাগাটা অযৌক্তিক। এটা প্রতিষ্ঠানিক অদক্ষতার ফল। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিতার আওতায় আনা এবং আরও গতিশীল করার জন্য সরকারের পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
‘নতুন যারা সরকারি চাকরিতে আসছেন, চাকরি জীবনের শুরুতেই তাদের যে বিব্রতকর অভিজ্ঞতা হচ্ছে-এটা তাদের ওপর দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সরকারি চাকরির ধরন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পান তারা। এই পরিস্থিতির পরিবর্তন হওয়া প্রয়োজন।’
প্রজ্ঞাপন জারির এই ধীর গতির বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সাখাওয়াত হোসেনের এর কাছে জানতে চাইলে তিনি নিয়োগ, পদোন্নতি ও প্রেষণ অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আকনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। কিন্তু ফোন ও মেসেজ দিয়েও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।