Image description

যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগ। শিশুরা এগুলো শেখে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আঙুলের কড় গুনে, মুখে বলে, মুখস্থ করে, অনুমান করে শিশুরা যোগ, বিয়োগ, গুণ, ভাগে দক্ষ হয়ে ওঠে। এটাই পাটিগণিত। নেদারল্যান্ডসের গবেষকেরা বলছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশুদের পাটিগণিতের দক্ষতা বাড়াতে পারে।

বাংলাদেশের মতো দেশগুলোয় বয়স্করা এআই ব্যবহার করবেন কি করবেন না, তা নিয়ে সংশয় দূর হচ্ছে না। এ দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এআই নিয়ে চিন্তাভাবনার প্রাথমিক স্তর পার করতে পারেনি। সংবাদমাধ্যমে এআই আত্মস্থ করা নিয়ে বিতর্ক চলছে। অন্যদিকে শিশু বয়সে এআই কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে গবেষকেরা কাজ করে বসে আছেন। কাজটা শুরু হয়েছিল ১২ বছর আগে। ২০১৪ সালে।

গবেষণাটি হয়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে। তিন বছরে ৭ হাজার ৮৮৫ শিশুকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৬০৩ বা ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুকে শ্রেণিক্ষকে এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

পাটিগণিতে দক্ষতা বাড়াতে হলে চর্চার দরকার। বারবার অনুশীলন করতে হয়। শিশুদের অনুপ্রেরণা দরকার। শিশুরা পাটিগণিতে দক্ষ হয়ে উঠবে কি না তা শিক্ষক, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষা সরঞ্জাম ও বিদ্যালয়ের ওপরও নির্ভর করে। নেদারল্যান্ডসের রাডবাউড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছয় গবেষক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তি ব্যবহার করলে শিশুদের পাটিগণিতে দক্ষতা বাড়ে কি না, তা দেখতে চেয়েছিলেন।

গবেষণাটি হয়েছিল ২০১৪ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে। তিন বছরে ৭ হাজার ৮৮৫ শিশুকে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৬০৩ বা ৫৮ দশমিক ৪ শতাংশ শিশুকে শ্রেণিক্ষকে এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। বাকি ৩ হাজার ২৮২ বা ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ শিশু প্রচলিত সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল। এসব শিশু ছিল ১ থেকে ৪ গ্রেড বা শ্রেণির শিক্ষার্থী। গবেষণায় ছোট ছোট বিদ্যালয়ের পাশাপাশি কিছু বড় বিদ্যালয়ও বেছে নেওয়া হয়েছিল। ছোট বিদ্যালয়ের প্রতিটি শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী কম থাকে, বড় বিদ্যালয়ে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি।

গবেষণার জন্য আলাদা পাঠ্যবই (টেক্সটবুক) ব্যবহার করা হয়নি। শিশুরা বরাবরের মতো শ্রেণিকক্ষে ট্যাবলেট কম্পিউটার ব্যবহার করেছে। কিছু কম্পিউটারে এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তি ছিল। শিশুদের দক্ষতা ও চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তির সংযোগ দেওয়া হয়েছিল।

গবেষকেরা দেখেছেন, শিশুরা যত বেশি এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুশীলন ঠিকভাবে শেষ করেছে, তত বেশি কঠিন বা জটিল অঙ্ক তার সামনে এসেছে। অন্যদিকে যে শিক্ষার্থী কোনো ভুল করেছে, তার সামনে সহজতর অঙ্ক বা অনুশীলন এসেছে। শিক্ষকেরা শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি ড্যাশবোর্ডে দেখতে পান। তার ভিত্তিতে তিনি শিক্ষার্থীকে পরামর্শ দেন।

গবেষণায় কী পাওয়া গেল

গবেষকেরা বলছেন, প্রাথমিক স্তরে পাটিগণিতে উন্নতির জন্য সাধারণ পাঠদানের পদ্ধতির চেয়ে এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তির মাধ্যমে পাঠদান বেশি ভালো ফল দেয়। দুই ধরনের শিক্ষার্থীদের পাটিগণিতে উন্নতির পরিসংখ্যানগত পার্থক্য খুব বড় না হলেও এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তি ব্যবহারের ইতিবাচক প্রবণতা সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণিতে পৌঁছানোর পর দুই ধরনের শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি কিছুটা ধীর হলেও সামগ্রিকভাবে এআই ব্যবহারকারীদের অগ্রগতি বেশি ছিল।

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব বিদ্যালয়ে আর্থ-সামাজিকভাবে পিছিয়ে পড়া শিশুদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেশি, সেসব বিদ্যালয়ে এআই-যুক্ত শিখন প্রযুক্তির ব্যবহারে গণিত শেখার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এর অর্থ এই প্রযুক্তি বৈষম্য দূর করতে সহায়তা করেছে। অন্যদিকে বড় বিদ্যালয়গুলোয় এর সুফল বেশি। বড় বিদ্যালয়গুলোয় এক শ্রেণিকক্ষে একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থীর সবাইকে সমানভাবে শেখানো শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব নয়। এআই পযুক্তি ব্যবহারের ফলে বড় বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ছোট বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতো সমান অগ্রগতি অর্জন করেছে।

গবেষকেরা দেখেছেন, শিশুরা যত বেশি এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তির মাধ্যমে অনুশীলন ঠিকভাবে শেষ করেছে, তত বেশি কঠিন বা জটিল অঙ্ক তার সামনে এসেছে। অন্যদিকে যে শিক্ষার্থী কোনো ভুল করেছে, তার সামনে সহজতর অঙ্ক বা অনুশীলন এসেছে।

তবে গবেষকেরা বলছেন, এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তি কখনো শিক্ষকের বিকল্প হতে পারে না। নিয়ন্ত্রণ থাকবে শিক্ষকের হাতে। এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তি কেবল ডেটাবেজে থাকা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে। কিন্তু একজন শিক্ষক শ্রেণিকক্ষের বাস্তব পরিস্থিতি ও শিক্ষার্থীর মানসিক অবস্থা বুঝতে পারেন। সুবিধা হচ্ছে এই যে একজন শিক্ষক ড্যাশবোর্ডের সাহায্যে শিক্ষার্থীদের অগ্রগতির রিয়েল-টাইম ডেটা দেখে দুর্বল শিক্ষার্থীদের দিকে আলাদা নজর দিতে পারেন। এই প্রযুক্তি শুধু সহায়তা করার জন্য। এর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ খুবই জরুরি।

 

এই পুরো গবেষণার ফলাফল গত মাসে বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা এলসিভিয়ারের লার্নিং অ্যান্ড ইনস্ট্রাকশন নামের জার্নালে প্রবন্ধ প্রকাশ করা হয়েছে। প্রবন্ধের উপসংহারে বলা হয়েছে, এআই–প্রযুক্তি প্রাথমিক স্তরে গণিত শিক্ষায় নির্ভরযোগ্য সহযোগী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারলে সার্বিকভাবে শিক্ষার মান উন্নয়নে ও সমাজে বৈষম্য দূর করতে সহায়তা করবে এই প্রযুক্তি।

দুই ধরনের শিক্ষার্থীদের পাটিগণিতে উন্নতির পরিসংখ্যানগত পার্থক্য খুব বড় না হলেও এআইযুক্ত শিখন–প্রযুক্তি ব্যবহারের ইতিবাচক প্রবণতা সুস্পষ্টভাবে দেখা গেছে। বিশেষ করে চতুর্থ শ্রেণিতে পৌঁছানোর পর দুই ধরনের শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি কিছুটা ধীর হলেও সামগ্রিকভাবে এআই ব্যবহারকারীদের অগ্রগতি বেশি ছিল।