Image description

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) যন্ত্রকৌশল বিভাগের নকশা করা ব্যাটারিচালিত নিরাপদ রিকশা (ই-রিকশা) উৎপাদনে বড় অংকের অর্থ বিনিয়োগ করেছে পাঁচ কোম্পানি, যার মোট অনুমিত পরিমাণ অন্তত শতকোটি টাকা। যদিও এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়ায় থমকে গেছে এসব রিকশার নিবন্ধন প্রক্রিয়া। বৈধভাবে নামানোর সুযোগ না থাকায় উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে কোম্পানিগুলোর কয়েকটি।

সড়কে গুণগত মানসম্পন্ন ও নিরাপদ ই-রিকশা নামানোর উদ্দেশ্য থেকে বুয়েটের প্রকৌশলীরা একটি নকশা চূড়ান্ত করে সরকারকে জমা দিয়েছিলেন ২০২২ সালে। পরে পাইলট প্রকল্প হিসেবে পাঁচ কোম্পানিকে এ নকশা অনুযায়ী বাণিজ্যিকভিত্তিতে ই-রিকশা উৎপাদনের অনুমোদন দেয় স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। কোম্পানিগুলো হলো— আকিজ মোটরস, ডাইস্টার হাই-টেক পাওয়ার অটো-মোবাইলস লিমিটেড, মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিং, নিউ গ্রামীণ মোটরস লিমিটেড ও ডায়নামিক কারস পিএলসি।

কোম্পানিগুলো বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে আধুনিক কারখানা গড়ে তুললেও আকস্মিকভাবেই বন্ধ হয়ে যায় এ নিবন্ধন প্রক্রিয়া। এ অবস্থায় বর্তমানে বাধ্য হয়েই উৎপাদন বন্ধ রেখেছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান। অলস পড়ে রয়েছে কোম্পানিগুলোর বিপুল অংকের বিনিয়োগ। আর ঢাকার রাস্তাঘাট রয়ে গেছে ব্যাটারিচালিত অনুমোদনহীন ও অনিরাপদ রিকশার দখলে।

এ বিষয়ে নকশাকারী প্রকৌশলীদের নেতৃত্ব দেয়া বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসান স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা ২০২২ সালের দিকেই সরকারকে নতুন রিকশার নকশা বুঝিয়ে দিয়েছি। গত বছরের ডিসেম্বর মাসে এ নিয়ে একটা প্রজ্ঞাপন জারি হয়। কিন্তু এটি এখনও বাস্তবায়ন হয়নি। সরকারের নীতিমালা হয়েছে। যারা বানাতে চেয়েছিলো, তারা অনুমোদনও পেয়েছে। কিন্তু নিবন্ধন প্রক্রিয়া আর হচ্ছে না। এতে কোম্পানীগুলো তৈরিকৃত ই-রিকশাও নামাতে পারছে না।’

সংবেদনশীল ব্যবসায়িক তথ্য বিবেচনায় নিরাপদ ই-রিকশায় বিনিয়োগের আর্থিক তথ্য প্রকাশে রাজি হয়নি এ পাঁচ কোম্পানির বেশিরভাগই। তবে কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপদ ই-রিকশা উৎপাদনে এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগ শতকোটি টাকার বেশি।

অনুমোদন পাওয়া পাঁচ কোম্পানির অন্যতম মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিং। এখন পর্যন্ত ‘তড়িৎ’ ব্র্যান্ডের আওতায় ৭০টির মতো রিকশা বিক্রি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এগুলো চলাচল করছে মূলত মির হাজীরবাগ ও কমলাপুরে। এছাড়া প্রতিষ্ঠানটির কারখানায় অবিক্রিত পড়ে আছে আরো ২০০টির মতো রিকশা।

সংবেদনশীল ব্যবসায়িক তথ্য বিবেচনায় নিরাপদ ই-রিকশায় বিনিয়োগের আর্থিক তথ্য প্রকাশে রাজি হয়নি এ পাঁচ কোম্পানির বেশিরভাগই। তবে কোম্পানিগুলোর সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপদ ই-রিকশা উৎপাদনে এখন পর্যন্ত কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত বিনিয়োগ শতকোটি টাকার বেশি।

কোম্পানির স্বত্তাধিকারী মনির হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের উত্তর সিটির পাইলট প্রজেক্টে ৫০টি ব্যাটারিচালিত রিকশার অনুমোদন দিয়েছিলো। কিন্তু আমরা তো ৫০টি ই-রিকশার জন্য ফ্যাক্টরি করিনি। আমরা ৫০ হাজার ই-রিকশা তৈরি করার জন্য ফ্যাক্টরি করেছি। আমাদের লোকবল নিয়োগ দিতে হয়েছে। এতদিনে আমরা ২ হাজার রিকশা বানিয়ে ফেলতে পারতাম। কিন্তু রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় বানাতে পারছি না। ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি। আমার এখানে প্রায় ১৫ কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। কিন্তু আমি লোকবল নিয়ে, জায়গা ভাড়া নিয়ে, কর্মচারী নিয়েও উৎপাদন বাড়াতে পারছি না। কারন, একটা মানুষ যখন ৪ লাখ টাকা খরচ করে আমার রিকশাটা কিনবে তখন সে প্রথমে রেজিস্ট্রেশন চাইবে। এজন্য আমরা রেজিস্ট্রেশন শুরুর আগে আর কোনো রিকশা বানাবো না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

একই বক্তব্য ডাইস্টার হাই-টেক পাওয়ার অটোমোবাইলস লিমিটেডের এডিশনাল ডিরেক্টর (হেড অব মার্কেটিং) মোহাম্মদ মইদুল ইসলামের। তিনি বলেন, ‘এ প্রকল্পের জন্য আমাদের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে হয়েছে। এখনো প্রতিনিয়ত করতে হচ্ছে। ফলে আমরা চাইলেও এটা বন্ধ করতে পারবো না। এটা বন্ধ করার কোনো পরিস্থিতিই নেই।’

‘হাই-টেক’ ব্র্যান্ডের আওতায় বুয়েটের নকশাকৃত ৬০টির মতো ই-রিকশা বিক্রি করেছে কোম্পানিটি। ডিএনসিসি কাছ থেকে এ ধরনের ২৫টির মতো রিকশার অনুমোদন পেয়েছিল ডাইস্টার। যদিও সে সময় তারা উৎপাদন করে ৩০০টির মতো। পরে সেখান থেকে ৩০টির মতো ই-রিকশা বিক্রির অনুমোদন পাওয়া যায়। মিরপুর ও পলাশীর দিকে এসব রিকশা চলছে। বর্তমানে ডাইস্টার হাই-টেক পাওয়ারের কারখানায় বুয়েটের নকশা করা ই-রিকশার উৎপাদন হচ্ছে না। রেজিস্ট্রেশন চালু হলে সেগুলো বিক্রি ও নতুন করে বানানো শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন মোহাম্মদ মইদুল ইসলাম।

কোম্পানিগুলোর মধ্যে বুয়েটের নকশায় ই-রিকশা উৎপাদন চালু রেখেছে শুধু আকিজ মটরস। এসব রিকশা বিক্রিও হচ্ছে বলে জানিয়েছেন কোম্পানিটির ব্যাটারিচালিত রিকশা প্রকল্প ‘পথিকের’ ম্যানেজার ইয়াসিন আরাফাত। স্ট্রিমকে তিনি জানান, এরই মধ্যে এ নকশার দুই শতাধিক ই-রিকশা বিক্রি করেছে কোম্পানিটি। গাজিপুরের কারখানায় এ রিকশার উৎপাদন অব্যাহতও আছে। এসব রিকশা মিরপুর, ওয়ারী ও মগবাজার এলাকায় চলাচল করছে।

সরকারের নিবন্ধন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে পড়ার পরও এগুলোর চলাচল ও উৎপাদন অব্যাহত থাকা নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন যখন রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া শুরু করবে, তখন আমাদের সব ক্রেতা নিবন্ধন করে নিতে পারবেন। যখন সিটি করপোরেশন নিবন্ধন দেবে, তখন আমরা তা প্রক্রিয়া করে দেব, ক্রেতারা নিবন্ধন করে নিতে পারবেন।’

আকিজ, মনির অটো ও ডাইস্টার বেশ কিছু ই-রিকশা বিক্রি করলেও নিউ গ্রামীণ মোটরস লিমিটেড এবং ডায়নামিক কারস পিএলসি এখনো বুয়েটের নকশাকৃত একটি রিকশাও বিক্রি করতে পারেনি।

এ বিষয়ে নিউ গ্রামীণ মোটরস লিমিটেডের ম্যানেজার শফিকুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা পাইলট প্রকল্পের সময় ৫০টি রিকশার নিবন্ধন পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা একটিও বিক্রি করিনি। আমাদের ক্রেতা ছিলো, তবুও আমরা বিক্রি করিনি। কারণ আমরা সব অস্থায়ী রেজিস্ট্রেশন পেয়েছি। আর অস্থায়ীগুলো রাস্তাঘাটে পুলিশে ধরে, হয়রানি করে। এজন্য আমরা অস্থায়ীগুলো বিক্রি করিনি। যখন আমরা ডিজিটাল নাম্বার প্লেট পাবো, তখন আমরা বিক্রি করবো। তার ওপর উৎপাদনে গেলে ১০-২০ বা ৫০টি গাড়ির মালামাল আমদানি করা যায় না। করলে বড় পরিমাণে মালামাল আমদানি করতে হবে। আমাদেরও সেটি করতে হয়েছে। ফলে এখানে বড় ধরনের বিনিয়োগ করতে হয়েছে। বিনিয়োগ কম হওয়ার কোন সুযোগই ছিলো না। এখন বছর দুই ধরে এই বিনিয়োগটা পড়ে আছে, তাহলে তো ক্ষতি হবেই।’

 

 

আকিজ, মনির অটো ও ডাইস্টার বেশ কিছু ই-রিকশা বিক্রি করলেও নিউ গ্রামীণ মোটরস লিমিটেড এবং ডায়নামিক কারস পিএলসি এখনো বুয়েটের নকশাকৃত একটি রিকশাও বিক্রি করতে পারেনি।

 

 

একই কথা জানিয়ে ডায়নামিক কারস পিএলসির ম্যানেজার খোরশেদ আলম রানা স্ট্রিমকে বলেন, ‘বুয়েটের নকশাকৃত রিকশা যখন সরকার নিবন্ধন শুরু করবে, তখন আমরা উৎপাদনে যাবো। যেহেতু এখন বাজারে চাহিদা নেই, আপাতত আমরা উৎপাদন করছি না। যখন আবার হবে, তখন শুরু করবো। কিছু বানিয়েছিলাম তা কারখানায় রয়ে গেছে।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা জোনায়েদ কবীর সোহাগ স্ট্রিমকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে কোনো চূড়ান্ত নীতিমালা না আসায় এই প্রক্রিয়া শুরু করা যাচ্ছে না। আমরা এখনো কোনো নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করিনি। কারণ এর চূড়ান্ত নীতিমালা আমরা মন্ত্রণালয় থেকে পাইনি। চূড়ান্ত নীতিমালা আসার পর এ নিয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (উপসচিব) মুহাম্মদ হাবিবুল আলমের সঙ্গে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে এ দপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে জানান, ‘ঢাকার উত্তর সিটিতে পাইলট প্রজেক্টের পর আর কোনো নিবন্ধন হয়নি। কবে হবে তাও নিশ্চিত নয়।’

একই ধরনের যন্ত্রাংশ, তবু দামে বড় ব্যবধান

কোম্পানিগুলোর কর্মকর্তাদের দাবি, বুয়েট প্রকৌশলীদের নকশা পরিপূর্ণভাবে অনুসরণ করেই রিকশাগুলো তৈরি করা হচ্ছে। তৈরির পর এগুলো সেই নকশাকারীদের দিয়েই পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হয়। এসব রিকশায় দেড় থেকে দুই হাজার ওয়াট মোটর কন্ট্রোলার, ৪৮-৬০ ভোল্ট সক্ষমতার ১২০ অ্যাম্পিয়ার ব্যাটারি ও লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। ই-রিকশা প্রস্তুতে কোম্পানিগুলো একই ধরনের যন্ত্রাংশ ব্যবহার করলেও দামের ক্ষেত্রে দেখা গেছে বড় ব্যবধান।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দাম মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ‘তড়িৎ’ রিকশার। কোম্পানিটি বুয়েট প্রকৌশলীদের নকশা করা ব্যাটারি ছাড়া প্রতিটি ই-রিকশার দাম ধরেছে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। আর ব্যাটারির দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মনির অটো প্রতিটি ই-রিকশার দাম পড়ে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা থেকে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

আকিজ মটরসের প্রতিটি ‘পথিক’ রিকশা বিক্রি হচ্ছে ব্যাটারিসহ ৩ লাখ ৭২ হাজার ৩৮০ টাকায়। আর ব্যাটারি ছাড়া বিক্রি হচ্ছে ২ লাখ ৪৭ হাজার ৩৮০ টাকায়।

ডাইস্টার হাই-টেক পাওয়ার অটো-মোবাইলস লিমিটেড ‘হাই-টেক’ রিকশা ব্যাটারি ছাড়া ১ লাখ ৯৯ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করেছে।

দাম বেশি হওয়ার কারণ জানতে চাইলে মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের স্বত্তাধিকারী মনির হোসেন স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমরা বুয়েটের অনুমোদন নিয়েই রিকশায় নিরাপত্তার জন্য পিছনে শকের জাম্পার দিয়েছি, সাসপেনশন দেয়া আছে। রিকশার সামনে ডাবল শকের জাম্পার দেয়া আছে। তারপর ব্রেক হাইড্রোলিক করা আছে। এছাড়া নিরাপত্তার জন্য স্টিলের ছাদ, স্টিলের বডি ও দরজা দেয়া আছে। সবদিক থেকেই নিরাপদ করা হয়েছে। আমাদের রিকশাটা হল একেবারে অবিকল সিএনজি। শুধু মাপে ছোট। এজন্য দামটা একটু বেশি।’

 

 

দাম সবচেয়ে বেশি মনির অটো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ‘তড়িৎ’ রিকশার। কোম্পানিটি বুয়েট প্রকৌশলীদের নকশা করা ব্যাটারি ছাড়া প্রতিটি ই-রিকশার দাম ধরেছে ২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। আর ব্যাটারির দাম ধরা হয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে মনির অটো প্রতিটি ই-রিকশার দাম পড়ে ৩ লাখ ৯৫ হাজার টাকা থেকে ৪ লাখ ১৫ হাজার টাকা।

 

 

একই কথা জানিয়ে আকিজ মোটরসের পথিক প্রজেক্টের ম্যানেজার ইয়াসিন আরাফাত স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের তিন চাকার সবগুলোয়ই হাইড্রলিক ব্রেক দেওয়া। ক্রেতারা নিশ্চিন্তায় নিতে পারবে। এছাড়া বাইরে পাউডার ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। কিন্তু সরকার পাউডার ব্যাটারি নিষিদ্ধ করে লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করতে বলেছে। এখন লিথিয়াম ব্যাটারির দাম অনেক বেশি। এজন্য আমাদের মূল্যও একটু বেশি।

অন্য দুই কোম্পানি নিউ গ্রামীণ মোটরস লিমিটেড এবং ডায়নামিক কারস পিএলসি রিকশার কোনো মূল্য ঠিক করেনি। প্রতিষ্ঠান দুটির কর্মকর্তারা জানান, যেহেতু তারা কোনো রিকশা বাজারে বিক্রি করেনি, সেহেতু দামও নির্ধারণ হয়নি। রিকশা বাজারে ছাড়ার সময় তখনকার বাজারমূল্যের ওপর দাম নির্ধারণ করা হবে।

তবে দামের এতটা পার্থক্য হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. এহসান। স্ট্রিমকে তিনি বলেন, ‘আমরা ২০২২ যখন সরকারকে নকশা বুঝিয়ে দেই তখন এর দাম ধরা হয়েছিলো ১ লাখ টাকার মতো। আর যদি এটাতে লেড-অ্যাসিড ব্যাটারি দেয় তাহলে দাম হবে দেড় লাখ টাকার মতো। আর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি দিলে দাম ২ লাখ টাকার কাছাকাছি পড়বে। শুনলাম কোম্পানীগুলো লিথিয়াম ব্যাটারি ব্যবহার করছে তবুও ৩ বছরে দাম আড়াই লাখের বেশি হওয়া সম্ভব নয়।’

এখনই গ্রহণে প্রস্তুত না চালকরা

সরকারের পক্ষ থেকে নিরাপদ হিসেবে স্বীকৃতি ও অনুমোদন দিলেও এসব যান এখন গ্রহণে রাজি না ব্যাটারিচালিত রিকশা চালকরা। তারা বলছেন, বুয়েটের নকশাকৃত রিকশার মূল্য অন্যগুলোর তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণের বেশি। আবার এখন যেসব ব্যাটারিচালিত রিকশা সড়কে চলছে, সেগুলোও অনেকে কিনেছেন ধার-দেনা করে। ফলে আরো অন্তত ৩-৪ বছর এসব রিকশাই চালাতে হবে বলে জানিয়েছেন চালকরা।

এ বিষয়ে অটো রিক্সা মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ দেলোয়ার স্ট্রিমকে বলেন, ‘সরকার আমাদের যে রিকশা চালাতে দিবে সেটিই আমাদের চালাতে হবে। তবে আমাদেরও কিছু দাবিদাওয়া আছে। আমরা যে রিকশা এতোদিন ধরে ব্যবহার করে আসছি সেগুলো আমাদের অন্তত আরো ৩৬ থেকে ৪৮ মাস ব্যবহার সুযোগ দিতে হবে। তারপর হয়তো আমরা রিকশাটা ভাংচুর করে বিক্রি করে দিলাম। কিন্তু তার আগে সম্ভব না। তাছাড়া বুয়েটের নকশা করা রিকশা আমাদের কিনতে হবে অন্তত ২ লাখ টাকায়। সেটা নেয়া তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না। এ কারণে আমাদের দ্বিমত আছে।’

বিষয়টিতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন উল্লেখ করে অটো রিক্সা মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি আবু বকর বলেন, ‘আমাদের শহরে অধিক পরিমাণে অটোরিকশা চলে। এগুলোকে কি করবে, পরিকল্পনা কি, তা প্রকাশ না করে যদি নতুন করে অটোরিকশা নামানোর অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে সেগুলো চালাবে কোথায়? কিন্তু আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ না করেই দেখলাম নতুন রিকশা নামানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলো। কিন্তু আগের যে রিকশাগুলো এখন চলছে, সেগুলোর তো একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের দাবি হলো সড়কে চলমান রিকশাগুলো নিয়ে তারা কি করতে চাচ্ছে, জানানোর পাশাপাইশ আরো দুই-তিন বছর এগুলো চালানোর সুযোগ দিতে হবে। এছাড়া বাড়তি মূল্যের বুয়েট নকশাকৃত রিকশা কিনতে সরকার আমাদের ঋণ সুবিধা দেবে কিনা, সেটিও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।’

সম্প্রতি সড়কে বিশৃঙ্খলার অভিযোগে অবৈধ ব্যাটারিচালিত রিকশা উচ্ছেদে অভিযান শুরু করে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। এ অভিযানকে বড় পুঁজি আনার অভিযান উল্লেখ করে লেখক ও গবেষক মাহা মির্জা স্ট্রিমকে বলেন, ‘ব্যাটারি চালিত রিকশার ব্যবসায় যে পাঁচটা কোম্পানি এসেছে, তারা কিন্তু কোনো ছোট কোম্পানি না। ডাইনামিক বা আকিজ মটর বড় কোম্পানি। এখানে আমরা একটা খুব ক্লাসিক উদাহরণ দেখতে পাচ্ছি, সেটি হলো বড় পুঁজি ছোট পুঁজিকে খেয়ে ফেলা। অর্থাৎ ব্যাটারি চালিত রিকশায় যে ছোট ছোট বিনিয়োগ তৈরি হয়েছিলো, সেটিকে ধ্বংস করে বড় বিনিয়োগের সৃষ্টি হচ্ছে। এসব রিকশা ঢাকার রাস্তায় চলছে ২০১৪-১৫ সাল থেকে। আগে কখনোই কেউ বলেনি অটোরিকশা অবৈধ। এখন হঠাৎ করে এক মাসের নোটিসে তা বলে দেয়া হচ্ছে অবৈধ। রাষ্ট্র এতদিন ধরে বিষয়টিকে বড় হতে দিয়েছে, সম্প্রসারিত হতে দিয়েছে। বিষয়টিকে নীতিমালার আওতায় আগেই আনা উচিত ছিল। এখন হঠাৎ করে তড়িঘড়ি করে বলা হচ্ছে এক মাসের মধ্যে রাস্তা পরিষ্কার করতে হবে, এর কোনো মানে নেই। আবার এর সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন কোম্পানির বিজ্ঞাপন আর বাজার জড়িয়ে গেছে। দেখে মনে হচ্ছে যে বিষয়টি আরো কাঠামোবদ্ধ জায়গায় চলে আসছে।’