Image description

করোনাভাইরাস মহামারির সময় হাত ধোয়ার গুরুত্ব নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালানো হয়েছিল। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন স্থানে হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করা হয় এবং বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে নেওয়া হয় নানা কর্মসূচি। কিন্তু মহামারির পর এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতা অনেকটাই কমেছে। কোথাও বেসিন অকার্যকর, কোথাও সাবান নেই, আবার কোথাও নিয়মিত তদারকির অভাবে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলেও তা স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত করা যাচ্ছে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাত ধোয়ার অভ্যাসকে টেকসই করতে শুধু দিবসভিত্তিক প্রচার বা অবকাঠামো নির্মাণ যথেষ্ট নয়। বিদ্যালয় ও হাসপাতালে সাবান-পানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, অকার্যকর বেসিন দ্রুত মেরামত, পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। সচেতনতার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা গেলেই হাত ধোয়ার অভ্যাসকে দৈনন্দিন জীবনের অংশ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (এমআইসিএস) ২০২৫-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬৮ শতাংশ পরিবারের হাত ধোয়ার স্থানে সাবান ও পানির ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৩২ শতাংশ পরিবারের এই মৌলিক সুবিধাটি নেই। ফলে এসব পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ বেশ সীমিত।

করোনাকালের পর দেশে হাত ধোয়ার বেসিন ও তদারকির অভাব দেখা দিয়েছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ৩২ শতাংশ পরিবারে এখনও সাবান-পানির ব্যবস্থা নেই। পাশাপাশি ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোর ৩০ শতাংশ বেসিন অকার্যকর এবং দেশের ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে মৌলিক হাত ধোয়ার সুবিধা অনুপস্থিত। ফলে হাত ধোয়ার অভ্যাস টেকসই করা চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাত ধোয়ার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করার পাশাপাশি সাবান ও পানির সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সাবানের সরবরাহ এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

মহামারি পরবর্তী সময়ে তদারকি ও সুবিধার অভাবে হাত ধোয়ার অভ্যাসে ঘাটতি দেখা দিয়েছে / ছবি- সংগৃহীত

হাসপাতাল ও বিদ্যালয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ সীমিত

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)-এর এক গবেষণায় ঢাকার ১৩টি বড় হাসপাতালের হাত ধোয়ার অবকাঠামো ও সাবানের প্রাপ্যতা পর্যবেক্ষণ করা হয়। আড়াই হাজারের বেশি বেসিন পরিদর্শন করে দেখা যায়, প্রায় ৩০ শতাংশ বেসিন অকার্যকর এবং প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিচ্ছন্ন। বহির্বিভাগের বেসিনগুলোর মাত্র ১৩ শতাংশে এবং অন্যান্য যৌথভাবে ব্যবহৃত বেসিনের মাত্র ৩ শতাংশে সাবান পাওয়া গেছে।

সাবানের প্রাপ্যতা বাড়াতে আইসিডিডিআর,বি ডিটারজেন্ট দিয়ে তৈরি সাশ্রয়ী ‘সাবান-পানি’ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছে, যা পরীক্ষায় ব্যাপক সাফল্য পেয়েছে। অন্যদিকে, হাত ধোয়াকে স্থায়ীকরণ করতে পাঠ্যপুস্তকে বিষয়টি অন্তর্ভুক্তিকরণ এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগে মাসে পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দের একটি নতুন প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে

এদিকে, বিদ্যালয়ের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও ইউনিসেফের ২০২২ সালের যৌথ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৪৪ শতাংশ বিদ্যালয়ে মৌলিক হাত ধোয়ার সুবিধা ছিল না। ফলে শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ বিদ্যালয়ে অবস্থানকালে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল।

অপরিচ্ছন্ন হাতের মাধ্যমে রোগজীবাণু খাবার ও পানির সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। টয়লেট ব্যবহারের পর, খাবার তৈরি ও গ্রহণের আগে এবং শিশুকে খাওয়ানোর আগে সাবান দিয়ে হাত না ধুলে ডায়রিয়া ও অন্যান্য অন্ত্রের সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। শিশুদের বারবার ডায়রিয়া হলে পানিশূন্যতা ও অপুষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই পরিবার, বিদ্যালয় ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার সুব্যবস্থা নিশ্চিত করা জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকার বড় হাসপাতালগুলোর ৩০ শতাংশ বেসিন নষ্ট এবং বেশিরভাগেই নেই সাবানের সুব্যবস্থা / ঢাকা পোস্ট

অবকাঠামো নির্মাণের পর রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের গবেষণা ও উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. সুশান্ত রায় বলেন, কোভিডের সময় হাটবাজার, মসজিদ, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানে তিন থেকে পাঁচটি আউটলেটবিশিষ্ট হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করা হয়েছিল। বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে বিদ্যালয়েও ওয়াশ ব্লক ও বেসিন তৈরি করা হয়। কিন্তু যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেসব বেসিন এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।

তিনি জানান, বর্তমানে এই অভ্যাসকে স্থায়ীকরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে শিক্ষা কারিকুলাম ও পাঠ্যপুস্তকে হাত ধোয়ার বিষয়টি অন্তর্ভুক্তির কাজ চলছে। পাশাপাশি স্কুলের ওয়াশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করে স্কুলে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে শিক্ষার্থীরা ছোটবেলা থেকেই সঠিক অভ্যাসে গড়ে উঠতে পারে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি ৬.১) অর্জনে ২০৩০ সালের মধ্যে হাত ধোয়ার সার্বিক অগ্রগতি ৭০% থেকে আরও বাড়াতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সচেতনতা বৃদ্ধির জোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। তবে, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেগুলোর পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে এখনও দুর্বলতা রয়ে গেছে।

নিয়মিত সাবানের অভাব মেটাতে আইসিডিডিআর,বি উদ্ভাবন করেছে সাশ্রয়ী ‘সাবান-পানি’ পরিচ্ছন্নতা ব্যবস্থা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল সেবা ব্যবস্থাপনা বিভাগের সাবেক লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. জয়নাল আবেদীন টিটো বলেন, ‘স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা বিষয়ে মানুষের মধ্যে এখনও জ্ঞানের ঘাটতি রয়েছে। করোনাকালে মাস্ক পরা ও নিয়মিত হাত ধোয়ার চর্চা জোরদার থাকায় সংক্রমণ প্রতিরোধে এসব অভ্যাসের গুরুত্ব সামনে এসেছিল। কিন্তু বর্তমানে মানুষ আগের মতো নিয়মিত হাত ধোয়া ও স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।’

তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতেও যথাযথ নিয়ম, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা থাকলে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা সম্ভব। তবে, এ ক্ষেত্রে মূল বাধা হলো জনবল ও পর্যাপ্ত বাজেটের ঘাটতি। হাসপাতালভেদে রোগীর সংখ্যা ও প্রয়োজন আলাদা হওয়ায় বাজেট ব্যবহারে কিছুটা নমনীয়তা থাকা প্রয়োজন। এতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন অনুযায়ী পরিচ্ছন্নতা ও চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবস্থা করতে পারবে।

সাবানের সহজলভ্যতায় সাশ্রয়ী উদ্যোগ

হাত ধোয়ার স্থানে সাবানের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে আইসিডিডিআর,বি উদ্ভাবন করেছে ‘সাবান-পানি’ এবং একটি সাশ্রয়ী সাবান সরবরাহব্যবস্থা। এতে স্বল্পমূল্যের সাবান-পানির দ্রবণ এবং ৫ থেকে ৭ লিটার ধারণক্ষমতার পুনরায় ব্যবহারযোগ্য পাত্র ব্যবহার করা হয়। ফলে ছোট বোতলে বারবার সাবান ভরার ঝামেলা কমে যায়।

কোথাও ভাঙা বেসিন, কোথাও সাবানের অভাব—নিয়মিত তদারকি না থাকায় বিদ্যালয়ের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়েছে / ঢাকা পোস্ট

আইসিডিডিআর,বি-এর পরিবেশগত স্বাস্থ্য এবং পানি, পয়োনিষ্কাশন ও পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক গবেষণা দলের সহযোগী বিজ্ঞানী ডা. মো. নুহু আমিন বলেন, মহামারির সময় সচেতনতা তৈরি হলেও বাস্তবে সব জায়গায় সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার সুযোগ নিশ্চিত হয়নি। ঢাকার ১৩টি বড় হাসপাতালে পরিচালিত গবেষণায় বেসিন অকার্যকর থাকা এবং সাবানের ঘাটতির বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।

তিনি জানান, ৩০ গ্রাম গুঁড়া ডিটারজেন্টের সঙ্গে দেড় লিটার পানি মিশিয়ে খুব সহজেই সাশ্রয়ী ‘সাবান-পানি’ তৈরি করা যায়। এই ব্যবস্থায় দ্রবণটি বড় পাত্রে রাখা হয়, যাতে কম খরচে দীর্ঘ সময় সাবানের প্রাপ্যতা বজায় রাখা সম্ভব হয়।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ ১৮টি প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলকভাবে এই ব্যবস্থাটি চালু করা হয়। প্রকল্পের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, হাত ধোয়ার স্থানে সাবান পাওয়ার হার শুরুতে ৩৫ শতাংশ থাকলেও শেষ পর্যায়ে তা ৯৫ শতাংশের বেশি হয়েছে। একজন কর্মীর মাধ্যমে প্রতি সপ্তাহে পাত্রগুলো পুনরায় সাবান-পানিতে পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছিল।

তবে সাবানের প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পাওয়া এবং সংক্রামক রোগের হার কমে যাওয়া এক বিষয় নয়। এই ব্যবস্থায় ডায়রিয়া বা অন্যান্য সংক্রমণ কতটা কমে, তা জানতে পৃথক স্বাস্থ্যগত মূল্যায়ন প্রয়োজন। ডা. নুহু আমিন যোগ করেন, শুধু সাশ্রয়ী সাবান উদ্ভাবন করলেই হবে না, তা মানুষের কাছে নিয়মিত সহজলভ্য রাখাও জরুরি। বিদ্যালয়, হাসপাতাল ও জনসমাগমস্থলে সারা বছর সাবান ও পানির সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

বিদ্যালয়ে নিয়মিত তদারকির প্রয়োজন

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের শিক্ষা কর্মকর্তা (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মোহাম্মদ জিয়া উল হক শিকদার বলেন, করোনাকালে বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়ার বিষয়টি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হতো। খাবার খাওয়ার আগে ও টয়লেট ব্যবহারের পর হাত ধোয়ার বিষয়টি তদারক করা হতো। জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, উপজেলা ও জেলা পরিষদের সহযোগিতায় বিদ্যালয়ে বেসিন স্থাপন করা হয়। ইউনিসেফের সহায়তায় হ্যান্ডওয়াশ, ব্লিচিং পাউডার ও হ্যান্ড স্যানিটাইজারসহ বিভিন্ন উপকরণও সরবরাহ করা হয়েছিল।

তবে তার ভাষ্য অনুযায়ী, করোনাকালের তুলনায় বর্তমানে হাত ধোয়ার কার্যক্রম ও নিয়মিত তদারকি কিছুটা কমেছে। হাত ধোয়া শুধু করোনাভাইরাস প্রতিরোধের জন্য নয়; ডায়রিয়া, আমাশয়সহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাত না ধোয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হলে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিতি বাড়ে, যা তাদের পড়াশোনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

জিয়া উল হক শিকদার বলেন, বিদ্যালয়গুলোতে হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতাসংক্রান্ত কার্যক্রমের জন্য একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ড তৈরির কাজ চলছে। এ ক্ষেত্রে শহর ও গ্রামের বিদ্যালয় এবং বিভিন্ন অঞ্চলের অগ্রগতির পার্থক্য বিবেচনায় নেওয়া হবে। পিডিপি-৫ প্রকল্পের আওতায় প্রতিটি বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য মাসে পাঁচ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, প্রকল্পটি এখনও অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।