Image description

শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন করপোরেশন ও সংস্থার নিয়ন্ত্রণাধীন উৎপাদনমুখী ৩৭টি কারখানা ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ৩০টিই লোকসানে জর্জরিত। নামমাত্র লাভে বাকি সাতটি প্রতিষ্ঠান। মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে, সর্বশেষ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিট লোকসানের পরিমাণ ৭৫৩ কোটি, যার বিপরীতে নিট লাভ ছিল ৩৬৪ কোটি টাকা।

আয়ুষ্কাল কমে যাওয়া, গ্যাস সংকট, কাঁচামাল প্রাপ্তির অনিশ্চয়তাসহ বেশ কিছু কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের অধীনে থাকা কারখানাগুলো। অবশ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোর আর্থিক দুর্বলতা শুধু ঝুঁকির বিষয় নয়, এটি বাজেট ও করদাতাদের অর্থ ব্যবহারের দক্ষতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। এ কারণে বছরের পর বছর বাজেটে সৃষ্টি হচ্ছে বড় ধরনের চাপ।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্থায়ী কমিটিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের দেওয়া প্রতিবেদনে আর্থিক অবস্থার এ ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। এতে ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরের চূড়ান্ত এবং চলমান অডিট রিপোর্ট পর্যালোচনা করে তুলে ধরা হয়েছে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পৃথক আয় ও ব্যয়ের সুনির্দিষ্ট হিসাব। শিল্প মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালামের সভাপতিত্বে গত মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত হয় বৈঠক। বৈঠকে দেওয়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) অধীনে চালু থাকা ৯টি চিনিকলের মধ্যে একমাত্র কেরু অ্যান্ড কোং (বাংলাদেশ) লাভজনক ধারায় রয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এর আয় ছিল ৫২৮ কোটি ২২ লাখ ৯৭ হাজার এবং ব্যয় ৪১৫ কোটি ৫ লাখ ৩৭ হাজার টাকা। কর-পরবর্তী ও ব্যাংক ঋণের সুদ বাদ দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির লাভ হয়েছে ১৩২ কোটি ৩১ লাখ ৭৬ হাজার টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও প্রতিষ্ঠানটির আয়ের ধারা ঊর্ধ্বমুখী ছিল। এই অর্থবছরে ব্যাংক ঋণের সুদ ও কর-পরবর্তী আয় দাঁড়ায় ২০৪ কোটি ৪ লাখ ২ হাজার টাকায়।

অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ঠাকুরগাঁও চিনিকল ২১ কোটি ৭৭ লাখ ৯৩ হাজার ও তার আগের বছর ১৬ কোটি ১৫ লাখ ৮৫ হাজার, রাজশাহী চিনিকল ৩৪ কোটি ২৬ লাখ ৪৮ হাজার ও তার আগের বছর ২৮ কোটি ৫৮ লাখ ৭৫ হাজার, নর্থ বেঙ্গল চিনিকল ৩১ কোটি ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ও তার আগের বছর ৮ কোটি ১০ লাখ ২ হাজার, নাটোর চিনিকল ২৭ কোটি ৭০ লাখ ৪৪ হাজার এবং তার আগের বছর ১০ কোটি ৬৮ লাখ ৪৫ হাজার, জয়পুরহাট চিনিকল ৩৫ কোটি ১৭ লাখ ৩৫ হাজার ও তার আগের বছর ২৮ কোটি ৪৭ লাখ ১১ হাজার, মোবারকগঞ্জ চিনিকল ৪১ কোটি ৫৯ লাখ ২৩ হাজার ও তার আগের বছর ৩৮ কোটি ২৪ লাখ ২৩ হাজার, ফরিদপুর চিনিকল ২৮ কোটি ৯৫ লাখ ৮৩ হাজার ও তার আগের বছর ২০ কোটি ৫৯ লাখ ৫ হাজার এবং জিলবাংলা চিনিকল ১৭ কোটি ৬৯ লাখ ৫৫ হাজার ও তার আগের বছর ১৫ কোটি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা লোকসান দেয়।

এ ছাড়া মাড়াই শুরু না হওয়া ছয়টি চিনিকলের প্রায় প্রতিটিই বিপুল পরিমাণ লোকসানের মুখে রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পঞ্চগড় চিনিকল ৫১ কোটি ৬ লাখ ৯৩ হাজার ও তার আগের বছর ৪৭ কোটি ৯ লাখ ৫৬ হাজার, সেতাবগঞ্জ চিনিকল ৭ কোটি ১৬ লাখ ৬৩ হাজার ও তার আগের বছর ৯ কোটি ৯৮ লাখ ৯৬ হাজার, রংপুর চিনিকল ২ কোটি ৪৮ লাখ ৪২ হাজার ও তার আগের বছর ২ কোটি ২৭ লাখ ৮৭ হাজার, শ্যামপুর চিনিকল ৩ কোটি ৪২ লাখ ৭৪ হাজার ও তার আগের বছর ৩ কোটি ৪২ লাখ ২৭ হাজার, পাবনা চিনিকল ২ কোটি ৭১ লাখ ২৭ হাজার ও তার আগের বছর ২ কোটি ২৮ লাখ ৭২ হাজার টাকা লোকসান করে। কুষ্টিয়া চিনিকলের অডিট চলমান থাকায় চূড়ান্ত হিসাব না দেওয়া হলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২৭ কোটি ৫৪ লাখ ৮৭ হাজার ব্যয় করে মাত্র ৪৪ লাখ ৬১ হাজার টাকা কর-পূর্ববর্তী আয় করে প্রতিষ্ঠানটি। আগের বছর ৩ কোটি ৪৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা লোকসান করে চিনিকলটি।

এ ছাড়া রেনউইক যজ্ঞেশ্বর অ্যান্ড কোং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১ কোটি ৯০ লাখ ৯৪ হাজার এবং তার আগের বছর ১ কোটি ৪৩ লাখ ৪২ হাজার টাকা লোকসান করে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের (বিএসইসি) অধীন ৯টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড, জিইএম কোং লিমিটেড ও ঢাকা স্টিল ওয়ার্কস লিমিটেড লাভের মুখ দেখলেও বাকিগুলো রয়েছে লোকসানে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রগতি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড করপূর্ব ৬৩ কোটি ৩ লাখ ২ হাজার ও তার আগের বছর ৪৮ কোটি ৪৮ লাখ ৪৯ হাজার, জিইএম কোং লিমিটেড ৬ কোটি ৮৬ লাখ ২৪ হাজার ও তার আগের বছর ৮ কোটি ৪ লাখ ১৭ হাজার এবং ঢাকা স্টিল ওয়ার্কস ৩ কোটি ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার টাকা লাভ করে।

অন্যদিকে ন্যাশনাল টিউবস লিমিটেড ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৭ কোটি ৩৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা লাভ করলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এটি আবার লোকসানে পড়ে যায়। এ বছর প্রতিষ্ঠানটির লোকসান ৬ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।

এই করপোরেশনের অধীনে থাকা বাংলাদেশ ব্লেড ফ্যাক্টরি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৪ কোটি ৭৪ লাখ ২০ হাজার ও তার আগের বছর ৫ কোটি ৮৯ লাখ ৩৮ হাজার, এটলাস বাংলাদেশ ৩ কোটি ২৭ লাখ ও তার আগের বছর ৩ কোটি ২৫ লাখ, ইস্টার্ন টিউবস ৫ কোটি ৮ লাখ ৩৬ হাজার ও তার আগের বছর ৪ কোটি ১ লাখ ২ হাজার, ইস্টার্ন কেবলস ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৬২ হাজার ও তার আগের বছর ১০ কোটি ৯৭ লাখ ৩৬ হাজার এবং গাজী ওয়্যারস ৩ কোটি ২০ লাখ ৭ হাজার ও তার আগের বছর ৪ কোটি ৬৮ লাখ ৬২ হাজার টাকা লোকসান করে।

বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে থাকা ১৪টি সার ও অন্যান্য কারখানার মধ্যে শুধু গাজীপুর ইউরিয়া ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জিপিএফপিএলসি) ও টিএসপি কমপ্লেক্স লিমিটেড (টিএসপিসিএল) আছে লাভজনক অবস্থানে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে জিপিএফপিএলসি ৩৬৮ কোটি ৬১ লাখ ও তার আগের বছর ২৩২ কোটি ৬৮ লাখ এবং টিএসপিসিএল ২৬ কোটি ৪১ লাখ ও তার আগের বছর ৩২ কোটি ৮৬ লাখ টাকা লাভ করে।

চিটাগাং ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল) ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২২০ কোটি ৯৪ লাখ টাকা লাভ করলেও চলতি বছর লোকসানের মুখে পড়ে যায় প্রতিষ্ঠনটি। এ বছর তাদের লোকসান ১৫৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

এ ছাড়া যমুনা ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (জেএফসিএল) ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৮৭ কোটি ৮২ লাখ ও তার আগের বছর ১৪০ কোটি ৫০ লাখ, আশুগঞ্জ ফার্টিলাইজার অ্যান্ড কেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেড (এএফসিসিএল) ১২১ কোটি ৩৫ লাখ ও তার আগের বছর ১৯০ কোটি ৬১ লাখ, বাংলাদেশ ইনসুলেটর অ্যান্ড স্যানিটারি ওয়্যার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (বিআইএসএফএল) ১৯ কোটি ১৪ লাখ ও তার আগের বছর ২১ কোটি, শাহজালাল ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (এসএফসিএল) ২৫৮ কোটি ৩৯ লাখ ও তার আগের বছর ১৩৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকা লোকসান করে। ছাতক সিমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (সিসিসিএল) ৪৩ কোটি ২৪ লাখ ও তার আগের বছর ৪০ কোটি ৭ লাখ, টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্প (টিএলএমপি) ৮ লাখ ও তার আগের বছর ৮ লাখ, ঢাকা লেদার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএলসিএল) ১ কোটি ৯৬ লাখ ও তার আগের বছর ১ কোটি ৪২ লাখ এবং উসমানিয়া গ্লাস শিট ফ্যাক্টরি পিএলসি (ইউজিএসএফএল) ৮ কোটি ৩১ লাখ ও তার আগের বছর ৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা লোকসান করে।

এ ছাড়া ট্রেনিং ইনস্টিটিউট ফর কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ (টিআইসিআই), ডিএপি ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড (ডিএপিসিএল) ও কর্ণফুলী পেপার মিলস লিমিটেডের (কেপিএমএল) চূড়ান্ত হিসাব দেখানো হয়নি।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন এই ৩৭টি প্রতিষ্ঠানের বড় একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে কাঠামোগত সমস্যা, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে লোকসানের শিকার হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সংসদীয় কমিটিকে জানানো হয়েছে, কারখানাগুলোতে ডিজাইন অনুযায়ী নির্ধারিত চাপে এবং পরিমাণে গ্যাস না পাওয়া, কারখানাগুলোর আয়ুষ্কাল কমে যাওয়া, পুরনো যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা ও মূল্যবৃদ্ধি কারখানাগুলোর উৎপাদিত পণ্যের বিক্রয়মূল্য উৎপাদন খরচের তুলনায় কম নির্ধারণ করায় কমে গেছে রাজস্ব আয়।   

শিল্প খাতের এ স্থবিরতা কাটিয়ে তুলতে এবং লোকসানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক করতে নিয়মিত মনিটরিং ও উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের ওপর জোর দিয়েছে স্থায়ী কমিটি।

এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার আর্থিক দুর্বলতা শুধু ঝুঁকির বিষয় নয়, এটি বাজেট ও করদাতাদের অর্থ ব্যবহারের দক্ষতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। বছরের পর বছর লোকসান ও ঋণের বোঝা বহনকারী এসব প্রতিষ্ঠানের দায় শেষ পর্যন্ত সরকারকেই নিতে হচ্ছে। ফলে বাজেটে সৃষ্টি হচ্ছে বড় ধরনের চাপ।

তার মতে, কোন কোন প্রতিষ্ঠান বেসরকারি খাতে হস্তান্তর করা যাবে; কোনটি পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের আওতায় পরিচালিত হবে, কোনটির শেয়ার পুঁজিবাজারে ছাড়ার সুযোগ রয়েছে এবং সরকারি মালিকানা রেখেই ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বেসরকারি খাতে দেওয়া যায়— এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট সংস্কার কর্মসূচি প্রয়োজন।