ভালমোন্ট গ্রুপের ভালমোন্ট ফ্যাশনস বন্ডেড সুবিধায় পোশাকশিল্পের প্রায় ৬১৬ টন কাঁচামাল আমদানি করে। আমদানিকৃত সেই কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরি না করে অবৈধভাবে দেশের খোলাবাজারে বিক্রি করেছে। আর শুল্ক সুবিধায় আনা কাঁচামাল খোলাবাজারে বিক্রি করার মধ্য দিয়ে সরকারের প্রায় ১৮০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে এসব অনিয়ম চালিয়ে আসছে প্রতিষ্ঠানটি। ভালমোন্ট ফ্যাশনসে অভিযান চালিয়ে শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট। শুধু তাই নয়, প্রতিষ্ঠানটি তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড লুকাতে ভুয়া রপ্তানি দেখানোরও প্রমাণ পেয়েছেন বন্ডের কর্মকর্তারা। তিন ধাপে প্রতিষ্ঠানটির নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ে এমন চিত্র উঠে এসেছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছে বন্ড কমিশনারেট। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সূত্র জানায়, তৈরি পোশাক খাতের ভালমোন্ট গ্রুপের ভালমোন্ট ফ্যাশনসের তিন দফায় অভিযান পরিচালনা করে সরকারের এই বিশাল অঙ্কের শুল্ক ফাঁকির চিত্র উদ্ঘাটন করেন বন্ডের কর্মকর্তারা। অভিযানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির আমদানি করা পণ্যের সঙ্গে রপ্তানি এবং ওয়্যারহাউসের মজুত ঠিক নেই। প্রতিষ্ঠানটিতে সরেজমিন কর্মকর্তারা এই চিত্র দেখতে পান। প্রথম দফায় প্রতিষ্ঠানটির কিছু পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির প্রমাণ পাওয়ার পর ৫ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির জন্য ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেট থেকে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করা হয়। পরে বেরিয়ে আসে আরও ভয়াবহ চিত্র। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা প্রতিষ্ঠানটির ওয়্যারহাউসে অভিযান পরিচালনা করেন। এতে আমদানির সঙ্গে রপ্তানি এবং মজুতের কোনো মিল পাননি তারা।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআরের) এমআইএস ডাটা থেকে প্রাপ্ত আমদানি তথ্য অনুযায়ী, ভালমোন্ট ফ্যাশনস ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে বন্ড সুবিধায় (রপ্তানির উদ্দেশ্যে) ৪ লাখ ২৪ হাজার ৫৩৮ কেজি ফেব্রিক্স ও অ্যাক্সেসরিজ আমদানি করে। এ ছাড়া ১৮টি চালানের মাধ্যমে এফওসি বা ফ্রি অব কস্টে আরও ১ লাখ ৯১ হাজার ৭০৪ কেজি ফেব্রিক্স ও এক্সেসরিজ আমদানি করে। বন্ড সুবিধায় আনা এসব কাঁচামাল দিয়ে পণ্য তৈরির পর তা বিদেশে রপ্তানির শর্ত ছিল। কিন্তু প্রতিষ্ঠানটি বন্ডেড সুবিধায় আনা মোট ৬ লাখ ১৬ হাজার ২৪২ কেজি বা ৬১৬ টন আমদানিকৃত পোশাকশিল্পের কাঁচামাল দিয়ে রপ্তানি পণ্য তৈরি না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেয়।
যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য দাঁড়িয়েছে ১৮২ কোটি ১৫ লাখ ৪৫ হাজার ৭৮৮ টাকা। যা থেকে সরকারের কাস্টমস ডিউটি বা সিডি আসে ৪৪ কোটি ২৯ লাখ ৬৪ হাজার ১৮৬ টাকা। এর সঙ্গে রেগুলেটরি ডিউটি হবে ৫ কোটি ৬৬ লাখ ১৪ হাজার ১৬৪ টাকা, সাপ্লিমেন্টরি ডিউটি (এসডি) ৩১ কোটি ৪১ লাখ ৯৩ হাজার ৩৮৩ টাকা, ভ্যাট ৩৯ কোটি ৫৩ লাখ ৩৫ হাজার ৪০১ টাকা, এআইটি ৯ কোটি ১০ লাখ ৬৪ হাজার ১৬২ টাকা, এটি হবে ১৫ কোটি ৫০ লাখ ৫৪ হাজার ৫৮৮ টাকা। সব মিলিয়ে শুল্ক সুবিধায় শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে আমদানি করা পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির কারণে সরকারের শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে মোট ১৪৫ কোটি ৫২ লাখ ২৫ হাজার ৮৮৫ টাকা। দ্বিতীয় দফায় ভালমোন্ট ফ্যাশনসের ওয়্যারহাউসে অভিযান পরিচালনা করে প্রায় দেড়শ কোটি টাকার বেশি শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছেন ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের কর্মকর্তারা।
সূত্র জানায়, দুই দফার অভিযানে বিশাল অংকের শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম মনিটরিং করতে শুরু করেন কর্মকর্তারা। এবার ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) ফাঁকির চিত্রও বেরিয়ে আসে। ওই প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা যায়, বন্ড সুবিধায় পণ্য আমদানি করে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করেছে। এক্ষেত্রেও সরকারের ২৯ কোটি ৬৪ লাখ ৭৩ হাজার ২৩২ টাকার ভ্যাট ফাঁকি দিয়েছে ভালমোন্ট ফ্যাশনস লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটি স্থানীয় বাজারে প্রায় ৩৯৫ কোটি ২৯ লাখ ৭৬ হাজার ৩০৪ টাকার পণ্য অবৈধভাবে বিক্রি করেছে। এতে সরকার বিশাল পরিমাণের ভ্যাট থেকেও বঞ্চিত হয়েছে। আর এসব ঘটনা ঘটেছে বন্ড কমিশনারেটের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে। দীর্ঘদিন ধরে সরকারের শুল্ক ফাঁকির উৎসব চালিয়ে যাচ্ছে ভালমোন্ট ফ্যাশনস। বিষয়টি জেনেও কোনো উদ্যোগ নেননি তৎকালীন কর্মকর্তারা।
যার কারণে শুল্ক সুবিধায় পণ্য আমদানি করে অবাধে খোলাবাজারে বিক্রি করলেও কারও কোনো তৎপরতা ছিল না। শুল্ক সুবিধায় আমদানি করা পণ্য শুধু খোলাবাজারেই বিক্রি করেনি, এর আগে ভুয়া রপ্তানি দেখানোর প্রমাণ পেয়েছেন শুল্ক কর্মকর্তারা। গত সেপ্টেম্বর মাসে বন্ডের কর্মকর্তারা সরেজমিন প্রতিষ্ঠানটি পরিদর্শন করেন। সাতটি বিল অব এক্সপোর্টের বিপরীতে কোনো নথিপত্রই দেখাতে পারেনি। অর্থাৎ ভুয়া রপ্তানি দেখানোর চেষ্টা করে হাতেনাতে ধরা খেয়েছেন ভালমোন্ট ফ্যাশনসের কর্মকর্তারা। আলোচ্য সময়ে শুল্ক কর্মকর্তারা বন্ডেড সুবিধায় আমদানি করা ১ লাখ ২৯ হাজার ৩৯০ কেজি ফেব্রিক্স অবৈধভাবে অপসারণ করেছে। যার শুল্কায়নযোগ্য মূল্য হচ্ছে ৭ কোটি ৫৩ লাখ ৯৩ হাজার ৮২৬ টাকা। আর এই পরিমাণে ফেব্রিক্সে শুল্ক হবে ৫ কোটি ৫ লাখ ৮৮ হাজার ২০ টাকা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর বন্ড কমিশনারেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত কমিশনার ড. নাহিদা ফরিদী কালবেলাকে বলেন, ভালমোন্ট ফ্যাশনসের ওয়্যারহাউসে অভিযান পরিচালনা করে মোটা অংকের শুল্ক ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে। এরই মধ্যে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশও পাঠানো হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি বন্ড সুবিধায় কাঁচামাল আমদানি করে পণ্য রপ্তানি না করে খোলাবাজারে বিক্রি করে দিয়েছে, যার কারণে সরকারের প্রায় ১৮০ কোটি টাকা শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অনিয়ম করে শুল্ক ফাঁকি দেবে, সবার বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন এই কমিশনার।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ভালমোন্ট ফ্যাশনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আজিজুল হাসান বাজমীর মুঠোফোনে বারবার ফোন দিয়েও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময় তার মুঠোফোনে বিষয়টি উল্লেখ করে খুদেবার্তা পাঠালেও তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।