গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি নবায়নের আলোচনা শুরু করতে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানালেও তাতে সাড়া দিচ্ছে না ভারত। দিল্লির এই নীরবতা দুই দেশের মধ্যকার অন্যতম স্পর্শকাতর এই ইস্যুর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, চুক্তি নবায়নের জন্য আলোচনা শুরুর আহ্বান জানিয়ে গত জুন মাসে ভারতকে চিঠি পাঠায় বাংলাদেশ। কিন্তু দিল্লি এখন পর্যন্ত সেই চিঠির কোনো জবাব দেয়নি।
আগামী ডিসেম্বরে ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। তাই এই বিলম্ব এখন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। চুক্তি নবায়ন প্রক্রিয়ার প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশ এরই মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনীতি ও পরিকল্পনা বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরকে প্রধান করে ১০ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে গুছিয়ে নেওয়ার যে ইচ্ছা ঢাকা প্রকাশ করেছে, সেই প্রেক্ষাপটে এই বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহবুব হাসান সালেহ মনে করেন, দুই দেশের সম্পর্ক আরও গঠনমূলক করার যে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, গঙ্গা চুক্তির নবায়ন হবে তার একটি বড় পরীক্ষা।
টাইমসকে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ক্ষেত্রে গঙ্গা চুক্তি একটি মূল পরীক্ষার জায়গা হিসেবে কাজ করবে। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। কিন্তু ঢাকার অনুরোধে দিল্লির সাড়া না দেওয়ার এই নেতিবাচক মনোভাব দুই প্রতিবেশীর পারস্পরিক আস্থা ফেরাতে কোনো সাহায্য করবে না।’
মাহবুব হাসান সালেহ আরও বলেন, ভারতকে কেবল মুখে সদিচ্ছা দেখালেই চলবে না, বরং বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে—যাতে দু দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা হয় এবং একটি ভবিষ্যৎমুখী সম্পর্কের সূচনা ঘটে। এজন্য দিল্লিকে এগিয়ে আসতে হবে এবং কথাকে কাজে রূপ দিতে হবে।
দিল্লিতে দায়িত্ব পালন করা বাংলাদেশের এক সাবেক হাইকমিশনার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন কোনো চুক্তি বা বিকল্প ব্যবস্থা না হলে গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
তিনি বলেন, চুক্তি না থাকলে ভারত নিজের মতো পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ পাবে। ফলে চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে তা কেবল পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, আরও বড় প্রভাব ফেলবে।
তার মতে, ঢাকা ও দিল্লি যখন সম্পর্কের উন্নতি চাইছে, তখন এই ধরনের মৌলিক বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়া দুই পক্ষের আস্থায় ফাটল ধরাতে পারে। ভারত যদি বাংলাদেশের চিঠির উত্তর না দেয়, তবে তা দুই দেশের সম্পর্কে নিশ্চিতভাবেই টানাপোড়েন বাড়াবে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইস্যুটি অত্যন্ত সংবেদনশীল। কারণ, ভারত সব সময়ই বাংলাদেশের সঙ্গে ভালো প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক রাখার কথা বলে আসছে। অথচ একদিকে তারা ভালো প্রতিবেশীর কথা বলছে, অন্যদিকে বাস্তবে সেই প্রতিশ্রুতির কোনো প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না।
তিনি মনে করেন, সময়মতো চুক্তির আলোচনা শুরু হলে দু দেশই প্রমাণ করতে পারবে যে, সম্পর্ক উন্নতির কথাটি কেবল মুখের কথা নয়—এর পেছনে প্রকৃত কূটনৈতিক ইচ্ছাও আছে।
১৯৯৬ সালের এই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা পয়েন্টে গঙ্গার পানিবণ্টন করা হয় এবং দুই দেশের মধ্যে পানি ভাগাভাগির একটি নিয়ম নির্ধারিত আছে। চুক্তি অনুসারে অধীনে ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত প্রতি ১০ দিনের পর পর বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেওয়ার নিশ্চয়তা রয়েছে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর ৩০ বছরের জন্য এই চুক্তি সই হয়, যার মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে।
তিন দশক আগের তুলনায় গঙ্গা অববাহিকায় পানির পরিমাণ, আবহাওয়া ও সার্বিক নদীর অবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে। ফলে এই চুক্তির গুরুত্ব এখন আরও অনেক বেশি।
বাংলাদেশ ও ভারতের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নদীর পানি ব্যবস্থাপনায় এখন কেবল একটি পয়েন্ট না দেখে পুরো নদী অববাহিকাভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। ভারতের সংস্থাও উল্লেখ করেছে, জলবায়ু পরিবর্তন ও নদীর পানি প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে চুক্তি নবায়নের বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অবশ্য ভারত আগেই জানিয়েছিল, গঙ্গা চুক্তি নিয়ে আলোচনা দুই দেশের যৌথ নদী কমিশনের (জেআরসি) মাধ্যমেই হবে। জেআরসি দুই দেশের ৫৪টি অভিন্ন নদী নিয়ে কাজ করে।
গত আগস্টে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, বিদ্যমান কাঠামো ব্যবহার করেই বাংলাদেশ ও ভারত এ বিষয়ে কথা বলবে।
জেআরসি কারিগরি বিষয়গুলো নিয়ে কাজও করছে। মে মাসে দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা ফারাক্কা পরিদর্শন করে আলোচনা করেছেন।
২০২৪ সালের আগস্টে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়। এই বিলম্বের ঘটনাটি ঘটছে সেই পটভূমিতেই। শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে আছেন এবং ঢাকা তাকে ফেরত চাইছে।
তাছাড়া সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, বাণিজ্য, ভিসা বিধিনিষেধসহ অন্যান্য বিষয় নিয়েও দু দেশের মধ্যে দ্বিমত রয়েছে।
একই সময়ে বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে সম্পর্ক আবার নতুন করে শুরু করার কথা প্রকাশ্যেই বলেছে।