সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি কনফারেন্সে বক্তব্য দেয়ার সময় প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমান অভিযোগ করেছেন যে, ড. ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে তারা নাকি চাপে ছিলেন, নানাভাবে নিগৃহীতও হয়েছেন। প্রথম আলোর সম্পাদকের এই ভূমিকাকে আমার কাছে নতুন কিছু মনে হয়নি। আমি আগেও দেখেছি- যারাই ওনাদের মাথায় ওঠান, তাদের বিপক্ষেই একটা সময় গিয়ে তারা আবার অবস্থান নেন।
উদাহরণ দিয়ে বলি। ২০০৬-৭ সালের জরুরি অবস্থা সরকারের সময় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সুবিধাজনক অবস্থায় ছিল। এই দুই পত্রিকার সম্পাদকই নাকি আলোচিত মাইনাস টু ফর্মুলার মাস্টারমাইন্ড ছিলেন এমনও শোনা যায়। অথচ সেই জরুরি পরিস্থিতির সরকার বিদায় নেয়ার পর মাহফুজ আনাম সাহেব একাধিক সাক্ষাৎকারে বললেন, সেই সময় তারা গোয়েন্দা সংস্থার চাপে অনেক কিছু করেছিলেন যা ঠিক হয়নি। এটাকে তিনি পেশা জীবনের অন্যতম সেরা ভুল হিসেবেও ঘোষণা দিলেন। কী অদ্ভুত!
আওয়ামী লীগ আমল প্রথম আলো নরমে গরমে পার করেছে। কালেভদ্রে একটা কড়া রিপোর্ট করলেও পরে উপসম্পাদক আনিসুল হক সাহেব আবার আওয়ামী তোষণে ফেসবুক লাইভ করে তা পুষিয়ে দিয়েছেন। হাসিনা বিরোধী আন্দোলনের সময়ও তারা ব্যালেন্স করেছেন। হাসিনার পলায়নকেও হাসিনার বিদায় বলেছেন।
স্বাভাবিকভাবেই প্রথম আলোর বিরুদ্ধে অনেকের ক্ষোভ ছিল। জুলাই যোদ্ধারা যেমন সমালোচনামুখর ছিলেন তেমনি দেশি বিদেশি অনলাইন এ্যাক্টিভিস্টরাও প্রথম আলোর বিরুদ্ধে সরব ছিলেন। কিন্তু আবারও প্রথম আলোর পক্ষে ঢাল হয়ে দাঁড়ালো অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। স্বয়ং প্রধান উপদেষ্টা তার এক্সক্লুসিভ ইন্টারভিউ দেয়ার জন্য বেছে নিলেন প্রথম আলোকে। সম্পাদক সাহেব নিজেই ড. ইউনুসের সাক্ষাৎকার নিলেন। প্রধান উপদেষ্টা এভাবে অবস্থান নিলে কার সাধ্য আছে এর বিপরীতে যাওয়ার!
অথচ ইউনুস সরকার বিদায় নেয়ার পর প্রথম আলো তার আমলের সমালোচনায় সরব। ঠিক যেভাবে তারা ওয়ান এলিভেন সরকারের বিদায়ের পর পাল্টে গিয়েছিল আবারও যেন তারই পুনরাবৃত্তি দেখলাম।
বর্তমান রাষ্ট্রপতি যখন দলের মহাসচিব ছিলেন তখন তিনিও প্রথম আলোর ভ্যানগার্ড হিসেবে কাজ করেছেন। সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য তিনিও প্রথম আলোকেই সবচেয়ে বেশি সুযোগ দিয়েছেন। এর বাইরেও একাধিকবার তিনি প্রথম আলোর পক্ষে কথা বলেছেন। এখন বিএনপিও সেই দৃষ্টিভঙ্গি লালন করছে। তবে প্রথম আলোর চরিত্র ও ইতিহাস বিশ্লেষণ করে আমি মোটামুটি নিশ্চিত করেই বলতে পারি, বিএনপি সরকার যখন থাকবে না, তখন বিএনপি আমলেও কতভাবে তারা নিষ্পেষিত হয়েছে সেই বয়ান নিয়ে প্রথম আলো আবারও হাজির হবে।
ইতিহাসের এত এত পুনরাবৃত্তি হওয়ার পরও আমাদের কেন যেন হুঁশ হয় না।