Image description

‎‎চূড়ান্ত ফলাফলের তালিকায় নিজের রোল নম্বর খুঁজে পাওয়ার মুহূর্তটি এখনো ভুলতে পারেন না মো. মাহাবুবুর রহমান সাঈদী। ফলাফল দেখার সময় টেনশনে আক্ষরিক অর্থেই কাঁপছিলেন তিনি। কাঙ্ক্ষিত রোল নম্বরটি খুঁজে পাওয়ার পর আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন। দীর্ঘদিনের লালন করা স্বপ্ন যে এবার বাস্তবতা পেয়েছে, তখনই তা উপলব্ধি করেন তিনি।

‎‎বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের (বিজেএস) পরীক্ষায় প্রথমবার ভাইভা দিয়েই সিভিল জজ বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) ৪৬তম আবর্তনের শিক্ষার্থী মো. মাহাবুবুর রহমান সাঈদী। ‎জামালপুরের ইসলামপুর উপজেলায় সাঈদীর স্থায়ী ঠিকানা। তবে তার শৈশব কেটেছে মেহেরপুরে। 

বাবার চাকরির সুবাদে কৈশোর কেটেছে জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায়। এরপর পড়াশোনার জন্য ময়মনসিংহ শহরে আসেন। জীবনের দীর্ঘ একটি সময় কেটেছে এই শহরেই। ময়মনসিংহের মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন তিনি। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে পড়াশোনা করেছেন।

‎‎‎‎বিচারক হওয়ার স্বপ্ন মা-বাবাকে ঘিরে
‎সাঈদীর বিচারক হওয়ার স্বপ্নের শুরুটা মূলত তার মা-বাবাকে ঘিরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, মা-বাবা কখনো কারও সঙ্গে অন্যায় বা অবিচার করেননি। বিশেষ করে তার মা সবসময় ন্যায়বিচার করার শিক্ষা দিতেন।

‎‎সমাজের চারপাশে নানা ধরনের অন্যায়-অবিচার দেখেও মানুষের কাছে সঠিক বিচার পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ অনুভব করতেন সাঈদী। সেখান থেকেই বিচারক হওয়ার ইচ্ছার সূত্রপাত। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর সেই স্বপ্ন আরও দৃঢ় হয়।

‎বিচারক হওয়ার পেছনে মায়ের অবদান সবচেয়ে বেশি বলে মনে করেন সাঈদী। মায়ের দেওয়া ন্যায়বোধ, অনুপ্রেরণা এবং স্বপ্নের প্রতি বিশ্বাস তাকে লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করেছে।

সাঈদীর বিচারক হওয়ার স্বপ্নের শুরুটা মূলত তার মা-বাবাকে ঘিরে। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন, মা-বাবা কখনো কারও সঙ্গে অন্যায় বা অবিচার করেননি। বিশেষ করে তার মা সবসময় ন্যায়বিচার করার শিক্ষা দিতেন।

‎‎‘হার না মানার মানসিকতা এগিয়ে নিয়েছে’
‎‎সাঈদীর মতে, তার সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে হার না মানার মানসিকতা, সফল হওয়ার জেদ ও তীব্র আকাঙ্ক্ষা, একাগ্রতা, সর্বাবস্থায় আল্লাহর ওপর ভরসা, নিজের ওপর বিশ্বাস এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা ও পরিশ্রম।

‎‎বিজেএসের প্রস্তুতির সময় দিনে নির্দিষ্ট কত ঘণ্টা পড়েছেন—এমন কোনো হিসাব রাখেননি তিনি। সুস্থ থাকার জন্য প্রয়োজনীয় ঘুম এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজের সময় বাদ দিয়ে বাকি সময়টুকু পড়াশোনায় দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

‎‎প্রতিটি বিষয় আলাদাভাবে নোট করে পড়েছেন, বারবার রিভিশন দিয়েছেন। নিজের দুর্বলতাগুলো খুঁজে বের করে সেগুলোর ওপর আলাদাভাবে কাজ করেছেন। পাশাপাশি পড়াশোনার ধারাবাহিকতাও ধরে রেখেছেন। ‎

প্রস্তুতির সময়ে হতাশা এসেছে অনেকবার। তবে প্রতিবারই নিজেকে নিজে অনুপ্রাণিত করে আবার পড়ার টেবিলে ফিরেছেন। ‎‎তার পরামর্শ, ‘এত ঘণ্টা পড়ব’—এমন নির্দিষ্ট লক্ষ্য না রেখে প্রতিদিন যতটা সম্ভব পড়া এবং পড়ার টেবিলে লেগে থাকা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

‎‎প্রথম ভাইভাতেই সাফল্য
‎‎বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে এটিই ছিল সাঈদীর প্রথম ভাইভা। প্রথমবারেই সাফল্য পাওয়াকে তিনি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ হিসেবে দেখছেন। ‎ভাইভা অভিজ্ঞতা থেকে তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়েছে আত্মবিশ্বাস। 

ভাইভা বোর্ডের সামনে আত্মবিশ্বাসী থাকার পাশাপাশি প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষার আগে পড়া বিষয়গুলো ভালোভাবে রিভিশন দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ‎এ ছাড়া সময় থাকলে নতুন ও প্রাসঙ্গিক বিষয়বস্তু সম্পর্কে পড়াশোনা করার পরামর্শ দিয়েছেন সাঈদী।

‎‎স্বপ্ন পূরণে থামা যাবে না
‎‎যারা বিচারক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন, তাদের উদ্দেশ্যে সাঈদীর পরামর্শ—প্রথমেই নিজের মনকে স্বপ্ন পূরণের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা রাখতে হবে এবং নিজের রিজিকের ওপর আস্থা রাখতে হবে। ‎স্বপ্ন পূরণ না হওয়া পর্যন্ত চেষ্টা ও পরিশ্রমে কোনো কমতি রাখা যাবে না। পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক, হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।

‎‎সাঈদীর গল্পে তাই একসঙ্গে মিশে আছে মা-বাবার স্বপ্ন, ন্যায়বিচারের প্রতি শৈশবের আকর্ষণ, আইন পড়ার সিদ্ধান্ত, দীর্ঘ প্রস্তুতি, হতাশার সঙ্গে লড়াই এবং নিজের ওপর বিশ্বাস। আর সেই পথচলার প্রথম বড় সাফল্য—প্রথম ভাইভাতেই সিভিল জজ বা জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়া।