চাঁদাবাজি, মারধর, সাংবাদিককে হুমকিসহ নানা অভিযোগে আগেও ছাত্রদল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার দুই নেতা আহসান হাবীব ও হাসিবুল ইসলাম। পরে তাঁদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে বিশ্ববিদ্যালয় শাখার পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে গুরুত্বপূর্ণ পদ দেওয়া হয়।
পদ ফিরে পাওয়ার পরও তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মারধর ও শিক্ষার্থীকে হুমকির অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ গত রোববার রাতে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তাঁদের আবারও ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।
ওই হামলায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১০ জন আহত হন। হামলায় আহসান হাবীব ও হাসিবুল ইসলামের নেতৃত্বে ছাত্রদলের অন্তত ১০ নেতা-কর্মী অংশ নেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজেও তাঁদের কয়েকজনকে হামলায় অংশ নিতে দেখা গেছে।
হামলার ঘটনায় আহসান হাবীব, হাসিবুল ইসলাম ও বিশাল চক্রবর্তীকে ছাত্রদল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। আরও ছয়জনকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে। একই ঘটনায় শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমানকে অব্যাহতি দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। হামলার ঘটনা তদন্তে কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
আগে বহিষ্কার, পরে গুরুত্বপূর্ণ পদ
আহসান হাবীব ও হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে এর আগেও সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিয়েছিল ছাত্রদল। তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠার পর ২০২৪ সালের অক্টোবরে দুজনকেই সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। পরে তাঁদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করে ২০২৫ সালের ১৬ আগস্ট ঘোষিত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের পূর্ণাঙ্গ কমিটিতে পদ দেওয়া হয়।
আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধঘোষিত ছাত্রলীগের এক কর্মীর সঙ্গে ফোনালাপ ফাঁস হয়। ওই ফোনালাপে মামলা দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা চাওয়ার অভিযোগ ওঠে। তখন তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। ফোনালাপ ফাঁসের পর তাঁকে অব্যাহতি দেয় কেন্দ্রীয় ছাত্রদল।
এরপর ২০২৫ সালের জুনে এক শিক্ষার্থীকে পথরোধ করে দুই হাজার টাকা দাবি ও মারধর করে দেড় হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ ওঠে আহসান হাবীবের বিরুদ্ধে। ওই শিক্ষার্থীকে ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও করা হয়। ওই ঘটনায় শিক্ষার্থী প্রক্টরের কাছে অভিযোগ করেন এবং মতিহার থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধেও আগে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক সদস্যের সঙ্গে তাঁর একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। এরপর তাঁকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
পরে আহসান হাবীবের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নতুন কমিটিতে তাঁকে সহসভাপতি করা হয়।
হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধেও আগে চাঁদাবাজির অভিযোগ ওঠে। ২০২৪ সালের অক্টোবরে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের এক সদস্যের সঙ্গে তাঁর একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়। এরপর তাঁকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। ২০২৫ সালের জুনে এক শিক্ষার্থীকে আটকে চাঁদা দাবি, পুলিশে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় এবং ছাত্রদলের রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
পদ ফিরে পাওয়ার পরও অভিযোগ
বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের পর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে আহসান হাবীব ও হাসিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ওঠে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসে আবু হাসান নামের এক শিক্ষার্থীকে কয়েকজন বহিরাগতকে সঙ্গে নিয়ে ছুরিকাঘাত ও মারধরের অভিযোগ ওঠে হাসিবুলের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া চলতি বছরের ১৫ আগস্ট পুলিশ হাসিবুলকে সাতটি ট্যাপেন্টাডল (শক্তিশালী ব্যথানাশক ঔষধ, মাদক হিসেবে ব্যবহারের নজির আছে) ট্যাবলেটসহ আটক করে। এ ঘটনায় করা মামলায় তিনি কারাগারে ছিলেন এবং পরে জামিনে মুক্ত হন।
হামলার ঘটনার আগেও ছাত্রদল নেতা তাকবীর আহমেদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছিল। ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের দুই নেতাকে মামলার ভয় দেখিয়ে টাকা আদায়ের অভিযোগ করা হয় তাঁর বিরুদ্ধে।
গত রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হলের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামকে খুঁজতে সেখানে যান। তাঁদের কয়েকজনের হাতে চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাট ছিল।
সাংবাদিকদের ওপর হামলা
গত রোববার রাত সাড়ে আটটার দিকে শহীদ জিয়াউর রহমান হলের সামনে সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেন, ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা হলের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামকে খুঁজতে সেখানে যান। তাঁদের কয়েকজনের হাতে চাপাতি, হকিস্টিক, পাইপ ও বেসবল ব্যাট ছিল। সাংবাদিকেরা ঘটনাটি ভিডিও করতে গেলে তাঁদের ওপর হামলা করা হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দ্য ডেইলি স্টার হামলায় সরাসরি অংশ নেওয়া সাতজনকে শনাক্ত করেছে। তাঁদের মধ্যে আছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সহসভাপতি আহসান হাবীব, শরিফুল ইসলাম ও তাকবীর আহমেদ ইমন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল ইসলাম, সহদপ্তর সম্পাদক শাহরিয়ার আলম, সহকারী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ সাহজারুল ইসলাম ও ছাত্রদল কর্মী বিশাল চক্রবর্তী।
হামলার পর ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকেরা অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ আলামত আড়াল করতেই ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান।
অর্থনীতি বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী বিশাল চক্রবর্তী বর্তমানে ছাত্রদলের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এর আগে তিনি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদুল্লা-হিল-গালিবের অনুসারী ছিলেন।
হামলার পর ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া যায়নি। সাংবাদিকেরা অভিযোগ করেন, গুরুত্বপূর্ণ আলামত আড়াল করতেই ফুটেজ মুছে ফেলা হয়েছে। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান। তাঁর ভাষ্য, সংস্কারকাজ চলায় সিসিটিভির সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। ফলে ওই সময়ের কোনো ফুটেজ পাওয়া যায়নি। পরে হামলার ঘটনায় তাঁকে হলের প্রাধ্যক্ষের পদ থেকে অব্যাহতি দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
ছাত্রদল ও প্রশাসন যা বলছে
ঘটনার একাধিক ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করেছেন বলে জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ। তিনি বলেন, সেগুলো যাচাই করে কেন্দ্রীয় তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দেবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনা অত্যন্ত অনাকাঙ্ক্ষিত ও নিন্দনীয়। সাংবাদিকদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে তিনি চেষ্টা করেছেন।
হামলার ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি ও মামলা করা হয়েছে। সহ-উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল আলীম বলেন, তদন্তে যাঁরা দোষী হিসেবে চিহ্নিত হবেন, তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।